✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
জামায়াত নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। শুক্রবার বিকেলে ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার আকতার হোসেন।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাত ৭টা ১৫ মিনিটের দিকে তাকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর করা হয় বলে জানিয়েছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার। কামরুল হাসান বলেন, ডিবি তাকে থানায় দিয়ে গেছে। এ বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় করা কাজে বাধা দেওয়ার মামলায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। মামলার তদন্তসহ পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া বিমানবন্দর থানা পুলিশ পরিচালনা করবে।
এর আগে শুক্রবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে (ইডি) হুমকি ও নিরাপত্তা সুপারভাইজারকে মারধরের অভিযোগে নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজিব বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় মামলা দায়ের করেন।
সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় আখতারুজ্জামান বলেন, “আমাকে এই মুহূর্তে ডিবি পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে। আমি শুধু জানিয়ে গেলাম আপনাদের। দোয়া করবেন, আমি যেন জনগণের জন্য, দেশের মানুষের জন্য বিশেষ করে প্রবাসীদের জন্য যদি শহীদ হতে পারি…
“আল্লাহ যেন আমার সেই দাবি কবুল করেন। জনগণের অধিকারের সংগ্রামে আমি আছি, থাকব। যতোদিন বেঁচে আছি, ততদিন জনগণের পাশেই থাকব… জনগণের জন্য এ জীবন ত্যাগ করব।”
বৃহস্পতিবার সকালে মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে আসা ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্ব নিয়ে আখতারুজ্জামানের উচ্চ-বাচ্যের একটি ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
তাতে দেখা দেখা যায়, জামায়াত নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে উদ্দেশ করে বলছেন, “ঘাড় ধরে বের করে দেব, ঘাড় ধরে বের করে দেব। আপনারা কাজ করেন না, কিছু করেন না, তদবির করে পোস্ট নেন। মাইর খাইতে চান?”
একই দিন বিকেলে মামলার এজাহার আদালতে এলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর তা গ্রহণ করেন। বিমানবন্দর থানার এসআই মাজেদুল ইসলামকে আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই আবু বক্কর ছিদ্দিক।
মামলার এজাহারে বলা হয়, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল আনুমানিক ১০টা ৪০ মিনিটে মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট (বিজি-৩৩৮) বিমানবন্দরে অবতরণের পর বিপুল যাত্রীর চাপ সৃষ্টি হয়। এ সময় ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় ট্রলি সংকট দেখা দেয় এবং যাত্রীরা লাগেজ পেতে বিলম্বের মুখে পড়েন। এতে সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যাত্রীদের ক্ষোভ ও উত্তেজনার মধ্যে ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেনের আহ্বানে ঘটনাস্থলে যান বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ। তিনি পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। এ সময় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান তার দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে যান এবং অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। আখতারুজ্জামান নির্বাহী পরিচালককে ‘আমি কিন্তু পিটাব ধইরা’ এবং ‘ঘাড় ধরে বের করে দেব’ বলে হুমকি দেন। একই সময় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী সম্পর্কেও অশালীন মন্তব্য করেন তিনি।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা প্রটোকল সহকারীরা বিমানবন্দরের সংরক্ষিত (কেপিআই) এলাকায় মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন। সেখানে দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন তাদের ভিডিও ধারণে নিষেধ করেন। এতে আখতারুজ্জামান ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন এবং একপর্যায়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন।
এ ছাড়া সাধারণ যাত্রীদের সংগ্রহ করা জমজমের পানির বোতল ট্রলি থেকে ফেলে দিয়ে ক্ষতিসাধন এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক প্রতিনিধির সঙ্গে মারমুখী আচরণের অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মামলার বাদী এজাহারে উল্লেখ করেন, অভিযুক্তের এসব কর্মকাণ্ডের কারণে স্পর্শকাতর ও সংরক্ষিত বিমানবন্দর এলাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
উল্লেখ্য, বিএনপি থেকে পাঁচবার বহিষ্কৃত হওয়া সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন। এ দিন দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের উপস্থিতিতে সংগঠনের প্রাথমিক সহযোগী সদস্য ফরম পূরণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগ দেন তিনি।
আখতারুজ্জামানের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায়। কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে টানা দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। তখন আসনটি কেবল কটিয়াদী উপজেলা নিয়েই ছিল। এখন এই আসনে পাকুন্দিয়া উপজেলাও যুক্ত হয়েছে।
শেখ হাসিনার আমলে বিতর্কিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পুলিশের সাবেক আইজি নৌকার নূর মোহাম্মদের কাছে হেরে যান আখতারুজ্জামান। তিনি জেলা বিএনপিরও সভাপতি ছিলেন।
