✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
চিকিৎসাবিজ্ঞানে চলতি বছর নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করেছে নোবেল কমিটি। বিজয়ীরা হলেন-যুক্তরাষ্ট্রের কার্ল ডাইসারোথ এবং জার্মানির দুই গবেষক পিটার হেগেম্যান ও গেওর্গ নাগেল।
আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল ও অপটোজেনেটিকস নিয়ে তাঁদের আবিষ্কারের জন্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সময় সোমবার বিকেলে সুইডেনের স্টকহোমে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। মস্তিষ্ক কীভাবে মানুষের অনুভূতি, আচরণ ও শারীরিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে, তা দীর্ঘকাল ধরে একটি রহস্য হয়ে ছিল। বিংশ শতাব্দীতে গবেষকরা মস্তিষ্কের কোন অংশটি কোন কাজে প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন।
তবে সে সময় যেসব পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল, তা দিয়ে ‘ঠিক কী কারণে কী ঘটে’ সেটি প্রমাণ করা সম্ভব ছিল না। তারা মস্তিষ্কের খসড়া ‘ম্যাপিং’ বা মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। এর ফলে অসংখ্য প্রশ্ন ও অজানা বিষয় থেকে যায়। কিন্তু এখন দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল কমিটির প্রধান পের সভেনিংসন বলেন, ‘অপটোজেনেটিকসের কারণে এখন এমনভাবে মস্তিষ্কের ম্যাপিং তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা একসময় আমরা কেবল স্বপ্নই দেখতাম।’
‘অপটোজেনেটিকস’ আলো দিয়ে স্নায়বিক সংকেত নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত। পুরস্কার ঘোষণার সময় নোবেল অ্যাসেম্বলি বলে, এই পদ্ধতির মাধ্যমে জীবিত মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষ কীভাবে স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ গড়ে তোলে তা দেখা সম্ভব।
নোবেল কমিটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কার্ল ডাইসারোথ, পিটার হেগেম্যান ও গেওর্গ নাগেল ‘চ্যানেলরোডপসিন’ নামে একটি প্রোটিন আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁরা দেখতে পান, এই প্রোটিনটি যেকোনো কোষে প্রবেশ করানো হলে সেটি আলোর প্রতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, গবেষণাগারে ইঁদুরের স্নায়ুকোষে চ্যানেলরোডপসিনের জিন প্রবেশ করান ডাইসেরথ। এরপর ওই কোষগুলোতে নীল আলো ফেলে তিনি স্নায়বিক সংকেত (নার্ভ সিগন্যাল) চালু বা ট্রিগার করতে সক্ষম হন। পরে তিনি দেখান, জীবিত ইঁদুরের মস্তিষ্কেও স্নায়ুকোষের জন্য আলো-নিয়ন্ত্রিত সুইচটি কাজ করে।
নোবেল প্রাইসের ওয়েবসাইটে লেখা হয়েছে, অপটোজেনেটিকস পদ্ধতি ব্যবহার করে গবেষকরা নির্দিষ্ট স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়বিক পথগুলো (নিউরাল সার্কিট) উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছেন। এসব পথ স্নায়বিক ও মানসিক বিভিন্ন রোগের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রায়োগিক ক্ষেত্রেও (ক্লিনিক্যাল মেডিসিন) এই পদ্ধতি ব্যবহার শুরু হয়েছে। দুর্বল দৃষ্টিশক্তির ব্যক্তিদের চোখের আলো ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় গবেষকরা পদ্ধতিটি কাজে লাগাচ্ছেন।
নোবেল কর্তৃপক্ষ লিখেছে, অপটোজেনেটিকস মস্তিষ্ক সম্পর্কে এতদিনের ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিদিনই নতুন নতুন আবিষ্কার সামনে আসছে। মস্তিষ্ক আসলে কীভাবে কাজ করে- সেই রহস্য সমাধানে এসব আবিষ্কার সাহায্য করছে।
তিন বিজ্ঞানীর অবদান
পিটার হেগেম্যান ও গেওর্গ নাগেল: (Peter Hegemann and Georg Nagel) ১৯৯০-এর দশকে জার্মান বিজ্ঞানী পিটার হেগেম্যান সবুজ একজোড়া শৈবাল নিয়ে গবেষণার সময় একটি বিশেষ প্রোটিন সনাক্ত করেন। সেটা আলোর সংস্পর্শে এলে খুব দ্রুত আয়ন চ্যানেল উন্মুক্ত করে। পরে ২০০২-২০০৩ সালে গেওর্গ নাগেল ও হেগেম্যান যৌথভাবে চ্যানেলরোডোপসিন-২ নামের একটি প্রোটিন নিয়ে গবেষণা করেন। এর সাহায্যে তাঁরা প্রমাণ করেন যে এটি আলো ফেললেই তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি করতে পারে।
কার্ল ডাইসারোথ: (Karl Deisseroth) যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কার্ল ডাইসারোথ ২০০৫ সালে ইঁদুরের নিউরনে এই জিন স্থানান্তর করেন। এভাবে তিনি প্রমাণ করেন যে আলোর সংকেত দিয়ে মস্তিষ্কের একক কোষগুলোকে চালনা করা সম্ভব। ২০০৭ সালে তিনি অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করে জীবন্ত ইঁদুরের মস্তিষ্কে স্নায়ুসংকেত নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হন।
ভবিষ্যৎ প্রভাব
পারকিনসন্স, বিষণ্নতা, অ্যালঝাইমার্স, সিজোফ্রেনিয়ার মতো জটিল মানসিক ও স্নায়বিক রোগের কারণ উদঘাটন এবং নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবনে অপটোজেনেটিক্স এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। এমনকি অন্ধত্ব দূর করা ও শ্রবণযন্ত্রের উৎকর্ষ সাধনেও এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে।
২০২৫ সালে ‘পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স’ সম্পর্কিত আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী মেরি ই ব্রাঙ্কো, ফ্রেড রামসডেল ও জাপানের শিমন সাকাগুচি।
তখন নোবেল কর্তৃপক্ষ বলেছিল, মানবদেহে শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা অবশ্যই নিয়ন্ত্রিত থাকতে হয়। তা না হলে এটি অন্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আক্রমণ করতে পারে। তিন বিজ্ঞানীর আবিষ্কার ক্যানসার ও অটোইমিউন রোগের নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবনের পথ খুলে দিয়েছে।
মেরি ই ব্রাঙ্কো যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের ইনস্টিটিউট ফর সিস্টেমস বায়োলজির সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার। ফ্রেড রামসডেল সান ফ্রান্সিসকোর সোনোমা বায়োথেরাপিউটিকস এর বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা এবং শিমন সাকাগুচি জাপানের ওসাকা ইউনিভার্সিটির ইমিউনোলজি ফ্রন্টিয়ার রিসার্চ সেন্টারের অধ্যাপক।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখন পর্যন্ত ২৩২ জন ব্যক্তিকে চিকিৎসায় নোবেল দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে কম ৩১ বছর বয়সে পুরস্কারটি পান কানাডার ব্রেডরিক ব্যান্টিং। ৮৭ বছর বয়সে পেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পেটন রোস।
মঙ্গলবার পদার্থবিজ্ঞান ও বুধবার রসায়নে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। বৃহস্পতিবার সাহিত্যে ও শান্তিতে পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা হবে আগামী শুক্রবার। অর্থনীতিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হবে ১৩ অক্টোবর।
পুরস্কারের অংশ হিসেবে একটি করে ডিপ্লোমা, স্বর্ণপদক এবং প্রায় ১২ লাখ ডলারের চেক দেওয়া হয়। কোনো বিভাগে একাধিক বিজয়ী থাকলে পুরস্কারের অর্থ ভাগাভাগি করে নেন।
১৯০১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানে ১২২টি নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। ২৩৫ জন বিজয়ীর মধ্যে ১৩ জন ছিলেন নারী।
শুরুতে নোবেল বিজয়ীদের প্রায় দেড় লাখ ক্রোনা দেওয়া হতো। বাড়তে বাড়তে ১৯৮১ সালে তা ১০ লাখ ক্রোনা হয়। এরপর পুরস্কারের আর্থিক মূল্য দ্রুত বাড়ানো হয়। ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো এর পরিমাণ ১ কোটি ক্রোনা হয়।
সর্বশেষ এ বছরের জানুয়ারি মাসে বাড়ানো হয় নোবেল পুরস্কারের আর্থিক সম্মানী। এ বছরের নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা মোট ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা (৯ লাখ ৮৬ হাজার ডলার) পাবেন, যা আগের চেয়ে ১০ লাখ ক্রোনা বেশি। নোবেল ফাউন্ডেশনের তহবিলের উন্নতি হওয়ায় এ বছর পুরস্কারের আর্থিক সম্মানী বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ফাউন্ডেশনের তহবিলে টান পড়ায় ২০১২ সালে পুরস্কারের অর্থমূল্য এক কোটি ক্রোনা থেকে কমিয়ে ৯০ লাখ করা হয়। এরপর ২০১৭ সালে তা বাড়িয়ে ৯০ লাখ এবং ২০২০ সালে ফের এক কোটিতে উন্নীত করা হয়।
গত এক দশকে ইউরোর বিপরীতে প্রায় ৩০ শতাংশ দর হারিয়েছে সুইডিশ ক্রোনা। ফলে পুরস্কারের অর্থমূল্য ১০ লাখ ক্রোনা বাড়ানো হলেও সুইডেনের বাইরে তা ততটা বাড়বে না।
২০১৩ সালে আর্থিক সম্মানী কমিয়ে ৮০ লাখ ক্রোনা করা হয়। তখনো যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রায় এই পুরস্কারের পরিমাণ দাঁড়াত ১২ লাখ ডলার। সেটা বেড়ে ১ কোটি ১০ লাখ ক্রোনা হলেও বিনিময় হারের খেলায় ২০২৪ সালে তার পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ডলারের কম। মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিলে নোবেল পুরস্কারের আর্থিক মূল্যমান খুব একটা বাড়েনি।
বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ক্রোনার মূল্যমান দাঁড়ায় সাড়ে ১২ কোটি টাকার বেশি।
