আবরার হত্যার ৭ বছর পূর্তি, বিচার এখনো শেষ হয়নি

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎  

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার সাত বছর পূর্ণ হ্ল আজ। এ ঘটনায় করা মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া রায়ে ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ৫ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হাইকোর্টেও বহাল রয়েছে।

তবে আপিল বিভাগে এখনো শুনানি শুরু হয়নি। মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও সাজার রায় কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছে আবরারের পরিবার।

আবরারের বাবা মো. বরকতউল্লাহ বলেন, ‘আমরা চাই মামলাটি যেন আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় আসে এবং যেন দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করা হয়। দ্রুত নিষ্পত্তি করে আসামিদের সাজার রায় কার্যকর চাই।’

ভারতবিরোধী স্ট্যাটাস দেওয়ায় ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর মধ্যরাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষ থেকে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে তাকে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। রাত ৩টার দিকে হলের দ্বিতীয় তলা থেকে আবরারের লাশ উদ্ধার করে কর্তৃপক্ষ। 

সেই ২০১১ নম্বর কক্ষটিকে ‘টর্চার সেল’ হিসেবে ব্যবহার করতো ছাত্রলীগ। সেখানে শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সেই রুম থেকে নির্যাতনে ব্যবহৃত লাঠি, স্ট্যাম্প, রড, চাকু ও দড়ি উদ্ধার করেছিল ডিবি পুলিশ।

২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পানি ও গ্যাস চুক্তির বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন আবরার।ওই দিনই শেরেবাংলা হলের গেস্টরুমে আসামিরা সভা করে আবরারকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। 

স্ট্যাটাসটি দেওয়ার সময় তিনি কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। পর দিন (৬ অক্টোবর) বিকালে তিনি বাড়ি থেকে বুয়েটের হলে ফেরেন।

হলে ফেরার কয়েক ঘণ্টার মাথায় রাত ৮টার দিকে আবরারসহ দ্বিতীয় বর্ষের সাত-আটজন ছাত্রকে শেরেবাংলা হলের দোতলার ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে পাঠান তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাত-আটজন নেতা। 

তারা আবরার ফাহাদের মোবাইল নিয়ে ফেসবুক ও মেসেঞ্জার ঘেঁটে দেখেন। এ সময় আবরার শিবিরের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ আনা হয়। আবরার এসব অস্বীকার করলে শুরু হয় স্টাম্প দিয়ে আবরারকে পেটাতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আরও কয়েকজন নেতাকর্মী আসেন। তারা আরেক দফা পেটান আবরারকে।

মার খেয়ে একপর্যায়ে আবরার অচেতন হয়ে পড়লে কোলে করে মুন্নার কক্ষে (২০০৫ নং) নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার আরও অবনতি হলে দোতলা ও নিচতলার সিঁড়ির মধ্যবর্তী জায়গায় অচেতন আবরারকে নিয়ে যান তারা। অচেতন আবরারের চিকিৎসার জন্য হল প্রভোস্ট ও চিকিৎসককে খবর দেয় ছাত্রলীগের সেসব কর্মী। কিন্তু এরই মধ্যে প্রাণ হারান আবরার।

চিকিৎসক এসে আবরারকে মৃত ঘোষণা করেন। তখন কর্তৃপক্ষ পুলিশে খবর দেয়।

আবরার হত্যার ঘটনায় তার বাবা মো. বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর রাজধানীর চকবাজার থানায় মামলা করেন।

২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে ২০ জনের ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। এছাড়া এ মামলার অপর পাঁচ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। 

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলো- বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল (সিই বিভাগ, ১৩তম ব্যাচ), সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন (কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ১৫তম ব্যাচ), তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার (মেকানিক্যাল ইঞ্জনিয়ারিং, ১৫তম ব্যাচ), সাহিত্য সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির (ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং, ১৬তম ব্যাচ), ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন (মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং, ১৫তম ব্যাচ), উপসমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশারফ সকাল (বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ১৬তম ব্যাচ), সদস্য মুনতাসির আল জেমি (এমআই বিভাগ), সদস্য মুজাহিদুর রহমান (ইইই বিভাগ, ১৬তম ব্যাচ), সদস্য হোসেন মোহাম্মদ তোহা (এমই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), সদস্য এহতেশামুল রাব্বি তানিম (সিই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), শামীম বিল্লাহ (মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), মাজেদুল ইসলাম (এমএমই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর (মেকানিক্যাল, ১৭তম ব্যাচ), মাহমুদুল জিসান (ইইই বিভাগ, ১৬তম ব্যাচ), এ এস এম নাজমুস সাদাত (এমই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম (এমই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), মিজানুর রহমান (ওয়াটার রিসোসের্স, ১৬ ব্যাচ), শামসুল আরেফিন রাফাত (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং), উপ-দপ্তর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ (কেমিকৌশল), মাহামুদ সেতু (কেমিকৌশল), এহতেশামুল রাব্বি তানিম (সিই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), মাহমুদুল জিসান (ইইই বিভাগ, ১৬তম ব্যাচ) এবং মুজতবা রাফিদ (কেমিকৌশল)। এর মধ্যে শেষের তিনজন পলাতক রয়েছে।

যাবজ্জীবনের ৫ আসামি হলো- বুয়েট ছাত্রলীগের সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ (১৪তম ব্যাচ, সিই বিভাগ), গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ইসতিয়াক আহমেদ মুন্না (মেকানিক্যাল, তৃতীয় বর্ষ), আইনবিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং), সদস্য আকাশ হোসেন (সিই বিভাগ, ১৬তম ব্যাচ) ও মোয়াজ আবু হোরায়রা (সিএসই, ১৭ ব্যাচ)।

২০ আসামির মধ্যে বিচারিক আদালতের রায়ের সময় থেকেই তিনজন পলাতক। তারা হলেন মোর্শেদ-উজ-জামান, এহতেশামুল রাব্বি ও মুজতবা রাফিদ। এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুনতাসির আল জেমি ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট গাজীপুরের হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পালিয়ে যান। সব মিলিয়ে এ মামলায় দণ্ডিত ২৫ আসামির মধ্যে চারজন এখনো পলাতক।

একটি বিচারের অপেক্ষার অবসান চায় পরিবার

শহীদ আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ বলেছেন, ‘আমাদের এখন শুধু চাওয়া একটাই। আগামী ৭ অক্টোবর যেন দেশের মানুষকে আর এই লজ্জা নিয়ে লিখতে না হয় যে, আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার এখনো শেষ হয়নি, রায় কার্যকর হয়নি। পরের বছর যেন আমরা বলতে পারি, অন্তত এই একটি বিচারের অপেক্ষার অবসান হয়েছে।’ বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।

পোস্টে আবরার ফাইয়াজ লেখেন, ‘আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ৭ বছর হয়ে গেল। সম্ভবত আমি বুয়েটে থাকা অবস্থায় এটাই শেষ অক্টোবর। আজ প্রায় পুরোদিনই রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠনকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একের পর এক সভা ও দোয়ার আয়োজন করতে দেখলাম আবরার ফাহাদকে স্মরণ করে।’

তিনি আরও লেখেন, ‘হঠাৎ মনে পড়ল ২০১৯ সালের কিছু কথা। একের পর এক আসামি গ্রেপ্তার হচ্ছিল, আর ধীরে ধীরে মনে আশা জাগছিল, হয়ত বিচারটা পাবো। আব্বুকে তখন বলেছিলাম, মানুষের ক্ষোভের কারণে মনে হয় বিচারটা খুব দ্রুতই শেষ হবে। আব্বু বলেছিলেন, ‘না, ৫-৭ বছরের আগে বিচার শেষ হবে না।’ আমি তখন হিসাব করে দেখেছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হতে আমার প্রায় ৭ বছর লাগবে। তাই অন্তত বের হওয়ার আগে বিচার শেষ হয়ে রায় কার্যকর হতে দেখব।’

আবরার ফাইয়াজ লিখেছেন, ‘অথচ আজ সেই ৭ বছরও পার হয়ে গেল। বিচার এখনো শেষ হয়নি। ২০১৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিচার বিলম্বিত হতে পারে, এমনটা স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনেরও প্রায় ২৬ মাস হয়ে গেছে। একটি গণঅভ্যুত্থান হয়ে গেছে। যারা আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে মিছিল-মিটিং করেছে, হামলা ও গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছে, তাদের অনেকেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে গিয়েছেন। ১৭ বছর ধরে যারা ভুক্তভোগী ছিল, তারাই এখন ক্ষমতার অংশ। ২১ জন আসামি এখনো কারাগারে।’

তিনি আরও লেখেন, ‘তারপরও মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় পড়ে আছে। সবকিছুর পরও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, আর কতদিন? এই মামলারই বিচারের যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে মানুষ কিভাবে বিচার ব্যবস্থার উপরে আস্থা ফিরে পাবে?’

পোস্টের শেষাংশে আবরার ফাইয়াজ বলেন, ‘আমাদের এখন শুধু চাওয়া একটাই। আগামী ৭ অক্টোবর যেন দেশের মানুষকে আর এই লজ্জা নিয়ে লিখতে না হয় যে, আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার এখনো শেষ হয়নি, রায় কার্যকর হয়নি। পরের বছর যেন আমরা বলতে পারি, অন্তত এই একটি বিচারের অপেক্ষার অবসান হয়েছে।’

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *