ইনানীতে রিসোর্টে আগুন: নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১০

✍︎ কক্সবাজার প্রতিনিধি ✍︎

কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতের মধ্যে একই পরিবারের ৬ জন রয়েছেন। এ ঘটনায় অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। এছাড়া বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।

নিহতদের মধ্যে ঢাকার বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা আশিকুল নামে ব্যক্তির পরিবারের ৬ সদস্য রয়েছেন। তারা হলেন- ফারিয়া কবির (৩৩), নাফিস ইবতে হামিদ (২৪), পাঁচ বছর বয়সী ফাইজান, মিথিলা মেহজাবিন (২৩), লাইলা জাহান নাবিলা (২৪) ও মালিহা (২৮)।

এ ঘটনায় ছয়জন আহত হয়েছেন। তারা হলেন- মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০), সামিদা (৩২), নাফিজা নওয়ার খান (২৯) ও সাহাবুদ্দিন (৩১)।

শনিবার সকাল ৭টার দিকে মেরিনড্রাইভের পাটোয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রিসোর্ট এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে।

প্রাথমিকভাবে আগুনের সূত্রপাত শটসার্কিট কিংবা চুলার আগুন থেকে ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আগুনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে এক নারীকে কান্নারত অবস্থায় বলতে শোনা যায় ‘আমার সাইফকে আইন্না দাও।’ 

ওই নারী পর্যটক পূজার বন্ধে তার পরিবার নিয়ে কক্সবাজার ঘুরতে এসেছেন বলে জানান। তিনি এক সাংবাদিকের বোন বলে জানা গেছে। 

ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি সাইফকে বারবার ডাকছেন এবং বলছেন, ‘আমার সাইফকে আইন্না দাও।’ তবে সাইফ সম্পর্কে তার কে, বেঁচে আছেন কিনা তা জানা যায়নি। 

এদিকে ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য ঘটনাস্থল থেকে সাতটি লাশ পাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানিয়েছে, ওই রিসোর্টে মোট ১৭ পর্যটক ছিলেন। নিহত ব্যক্তিরা পর্যটক বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তাদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, ‘অনেকে নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঠিক কতজন পর্যটক মারা গেছেন, তা জানতে একটু সময় লাগবে।’

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, সকাল ৭টা ২৫ মিনিটে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে উখিয়া ফায়ার স্টেশনের ২টি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। সকাল ৮টার দিকে সেখানে পৌঁছায়।

সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। বেলা ১১টার দিকে আগুন পুরোপুরি নেভানো হয়।

ফায়ার সার্ভিসকে উদ্ধারকাজে সহায়তা দিচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, আজ সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসে আগুনের খবর দেওয়া হয়। সকাল আটটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। চারজন ব্যক্তি মারা গেছেন তিনতলার দুটি শৌচাগারে।

তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সমুদ্রের তীব্র বাতাসে কাঠের রিসোর্টে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের স্থাপনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা দরকার। কিন্তু রিসোর্টটিতে এগুলোর কিছুই ছিল না। ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না। মাত্র সাত-আট মাস আগে রিসোর্টটি তৈরি হয়েছিল। জায়গাটির মালিকানা নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানান তিনি।

উখিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, ওই রিসোর্টে আশিকুলের পরিবারের ৯ সদস্য ছিলেন। এর মধ্যে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি তিনজন হাসপাতালে ভর্তি।

বেলা ১১টার দিকে উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, ওই রিসোর্টে ২৭ জনের এন্ট্রি ছিল, এর মধ্যে ৯ জন রিসোর্টের বাইরে ছিলেন। উদ্ধার তৎপরতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত জানানো সম্ভব নয়।

দুপুরে ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মোরশেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা প্রথম দিকে ছয়টি মরদেহ উদ্ধার করেছি। এছাড়া আহত ছয়জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছি। এর মধ্যে দু’জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে আরো চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে একজন পুরুষ, দুইজন নারী ও এক শিশু রয়েছে।’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, হতাহতরা সবাই পর্যটক ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে- রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত। কারণ অনুসন্ধানে এরই মধ্যে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের লোকজন ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়েছেন বলে জানা গেছে।

ঝুঁকিপূর্ণ বলে নোটিশ দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস

কক্সবাজারে আগুনে পুড়ে ছাই হওয়া টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁটি ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ।

ডিজি আরও জানিয়েছেন, রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে গত জুনে সতর্ক করার পাশাপাশি নোটিশও দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। তবে এরপরও রিসোর্টটির কার্যক্রম চালু ছিল।

শনিবার দুপুরে রাজধানীর কাজী আলাউদ্দীন রোডে অবস্থিত ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরে শারদীয় দুর্গোৎসবে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে আয়োজিত এক প্রেস কনফারেন্সে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক।

ডিজি আরও জানান, রিসোর্টটি পরিচালনার জন্য ফায়ার সার্ভিসের কাছ থেকে কোনো লাইসেন্স নেয়নি। গত ১১ জুন ফায়ার সার্ভিসের একজন পরিদর্শক সেখানে গিয়ে ই-ফায়ার লাইসেন্স নেওয়ার জন্য ২১ দিনের সময় দিয়ে নোটিশ দেন।

মহাপরিচালক আরও জানান, রিসোর্টটি ঝুঁকিপূর্ণ বলেও সতর্ক করা হয়েছিল। এরপরও তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেন, ‘কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় অনেক ইকো রিসোর্ট ও অন্যান্য স্থাপনা ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এসব স্থাপনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা হবে।’

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে রিসোর্ট পরিচালকদের সতর্ক করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিসের ডিজি বলেন, ‘তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আগুন লাগার কারণ নিয়ে অনুমাননির্ভর কোনো বক্তব্য দেওয়া ঠিক হবে না। পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।’

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *