✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
মজুরি বাড়ানোর দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে অর্থায়ন ও জনবল দিয়ে সহায়তা করার অভিযোগে অন্তত ২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ২০৪ ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে সব ব্যাংকে এ ব্যাপারে নির্দেশনা পাঠিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ তালিকায় দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকটি শিল্প গ্রুপের মালিক, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং রাজনৈতিক কর্মী আছেন। তাদের বেশির ভাগ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বা আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী।
তবে কারও কারও ব্যাংক হিসাব ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) একাধিক সংস্থার মামলায় জব্দ করা হয়। কেউ কেউ কারাগারে আছেন এবং অনেকে দেশের বাইরে। ফলে অভিযোগ বিষয়ে তাৎক্ষণিক তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
গত মঙ্গলবার এনবিআরের এক অনুষ্ঠানে সংস্থাটির চেয়ারম্যান আহসান হাবিব কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, বিশেষ একটি কারণে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) ও আয়কর গোয়েন্দা বিভাগ ৩৪ ব্যক্তি ও ৩৪ পরিবারের ব্যাংক হিসাব জব্দ করছে।
রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ১২টি গ্রুপের মালিক এ আন্দোলনে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড করার জন্য অর্থায়ন করছেন। এ তালিকায় রয়েছেন সিপাল গ্রুপ-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিপু মুনশি। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন।
একই অভিযোগে ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হচ্ছে বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক সালমান এফ রহমানের। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগ-বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কিছু ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হচ্ছে। তারা হলেন– সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর ভাগনে আলিফ মোল্লা, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলমের সহযোগী মাহবুবুর রহমান জুয়েল, স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মী কামাল গাজী ও শুভ নামে এক ব্যক্তি।
এনবিআরের তালিকায় সবচেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে মন্ডল গ্রুপ -এর, ২৮টি। এর মধ্যে মন্ডল ইন্টিমেটস, কটন ফিল্ড, কটন ক্লাব, কটন ক্লোদিং, মন্ডল ফেব্রিকস, ট্রপিক্যাল নিটেক্স, মার্ক সোয়েটার, মন্ডল স্পিনিং মিলস, আলিম নিট, মন্ডল সিকিউরিটিজ, অ্যাপোলো ফ্যাশন, ট্রিমস ইন্টারন্যাশনাল, ইকো ইন্টিমেটস, অ্যাপোলো নিটওয়্যার, মন্ডল নিট কম্পোজিট ও মন্ডল ইয়ার্ন ডাইং উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া পানামা অ্যাগ্রো কমপ্লেক্স, জিগজ্যাগ স্টুডিও, মন্ডল অ্যান্ড কোম্পানি ও মনটেক্স ফেব্রিকসের নাম রয়েছে। ব্যক্তি হিসেবে আছেন আবদুল আলিম মন্ডল, তারিন তাসলিমা, মো. জুবায়ের মন্ডল, সুলতানা খাতুন, মাসুদা খাতুন, আবদুল মান্নান মন্ডল, মোমেনা খাতুন ও আবদুল মোমিন মন্ডল।
এ ছাড়া গিভেন্সি গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান গিভেন্সি গার্মেন্টস, গিভেন্সি স্পিনিং মিলস, গিভেন্সি গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, গিভেন্সি ইয়ার্ন ডাইং ও গিভেন্স ফুডস অ্যান্ড এসেনশিয়ালস আছে তালিকায়। পাশাপাশি রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে আবদুল জাহিদ মুকুল, মাসুমা খাতুন, মাহমুদা খাতুন ও আবদুল হাদি প্রমুখের নাম।
স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ এবং দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স ও সাগর ইনফো বিল্ডার্সের যৌথ উদ্যোগের নামও রয়েছে তালিকায়। এ গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন এ কে এম মোশাররফ হোসেন, হোসনা আরা বেগম, মো. আতিউর রহমান, মাহমুদা বেগম, তাসমিয়া রহমান, হাসনাত মোশাররফ ও ফারিয়া রহমান।
নিপা গ্রুপের নিপা নিটওয়্যার কোম্পানি, সেলিনা অ্যাপারেলস ও নিপা ফ্যাশন ওয়্যার ইন্ডাস্ট্রির নাম রয়েছে। ব্যক্তি হিসেবে আছেন সাবেক সংসদ সদস্য মো. খসরু চৌধুরীসহ পরিবারের একাধিক সদস্য।
চট্টগ্রামভিত্তিক ওয়েল গ্রুপের ওয়েল অ্যাকসেসরিজ, ওয়েল ফ্যাশন ও ওয়েল ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানির নাম রয়েছে তালিকায়। ওয়েল গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামও রয়েছে তালিকায়। ওয়েল গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুচ সালাম আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন।
এ ছাড়া তুসুকা গ্রুপের নয়টি প্রতিষ্ঠান—তুসুকা প্যাকেজিং, তুসুকা স্টিচেস, তুসুকা অ্যাপারেলস, তুসুকা ফ্যাশনস, তুসুকা ওয়াশিং, তুসুকা প্রসেসিং, তুসুকা ডেনিম, তুসুকা জিনস ও তুসুকা ট্রাউজার্সের নাম রয়েছে তালিকায়। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন ব্যক্তির নামও রয়েছে তালিকায়।
তালিকায় বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম আবদুল মান্নান, তাঁর পরিবারের সদস্য ফরিদা মান্নানসহ আরও কয়েকজনের। আরও রয়েছে মিরপুরের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা ও তার পরিবারের সদস্যরা। মিরপুর এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভে ইলিয়াস মোল্লার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) দেশের সব ব্যাংকে ই-মেইলে এ-সংক্রান্ত জরুরি নির্দেশনা পাঠিয়েছে।
এনবিআর সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তালিকায় থাকা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পোশাক খাতের চলমান আন্দোলনকে উসকে দিতে নানাভাবে অর্থায়ন করা হয়েছে। সরকারের গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এরপরই এনবিআর দুই শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য যাচাই করছে। এক সপ্তাহের মধ্যে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য এনবিআর পাঠাতে বলা হয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অনলাইনে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তাঁর নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫টি হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, ফেসবুক পেজে আন্দোলনের বিভিন্ন স্থানের ভিডিও, ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন প্রায় ১৫০ ব্যক্তি। এদের মধ্যে বাহাউদ্দিন নাছিমের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পোশাক খাতের চলমান অস্থিরতার পেছনে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ইন্ধন রয়েছে। এ কাজে কিছু শিল্পমালিকও জড়িত বলে সরকারের কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলে জানান তিনি।
