দুদক চেয়ারম্যানসহ দুই কমিশনারের পদত্যাগ

■ নাগরিক প্রতিবেদক ■

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন পদত্যাগ করেছেন। তার সঙ্গে একই সময়ে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন কমিশনের দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ।

সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে মঙ্গলবার তারা পদত্যাগপত্র জমা দেন।

এদিন দুপুর আড়াইটার দিকে দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবনে প্রবেশ করেন। এর মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় তারা পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে বেরিয়ে আসেন। কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। 

তিনি জানান, চেয়ারম্যানের সঙ্গে দুই জন কমিশনারও পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।

মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী বলেন, ‍‍‍“পদত্যাগ করার কারণে আমি আমার গাড়ির ফ্ল্যাগ নামিয়ে যাচ্ছি”।

পদত্যাগের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “এখানে না, এটি অফিসে গিয়ে বলব”।

হঠাৎ করে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদত্যাগের বিষয়টিকে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

মঙ্গলবার (৩ মার্চ) রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। 

বিবৃতিতে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদত্যাগ হতাশাজনক হলেও তা অপ্রত্যাশিত নয়। দেশের রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি সংস্থাগুলোকে পছন্দের নেতৃত্বের আওতায় রাখার সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের। দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানকে দলীয় ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত রাখার বাস্তব অনুশীলন এখনও ক্ষমতার কাঠামোর কাছে অগ্রহণযোগ্য বলেই প্রতীয়মান হয়।” 

তিনি বলেন, “স্বল্পমেয়াদী সুবিধার জন্য এমন চর্চা দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এখন দেখার বিষয়, নতুন নিয়োগ কীভাবে ও কাদের মাধ্যমে হয় এবং দুদকের স্বাধীনতা নিয়ে ঘোষিত অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলন কেমন দাঁড়ায়।”  

মোহাম্মদ আবদুল মোমেন ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর কমিশনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তার দীর্ঘ সরকারি ক্যারিয়ারে রয়েছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা। ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা আবদুল মোমেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সহকারী একান্ত সচিব, ঢাকা জেলা প্রশাসক, বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উপ-পরিচালক, কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক, বাংলাদেশ বিমান কোম্পানির এমডি ও সিইওসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

২০০৯ সালে তিনি যুগ্ম সচিব থাকাকালীন ওএসডি হন এবং ২০১৩ সালের ৬ জুন বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তার দীর্ঘ কর্মজীবন ও পদত্যাগের প্রেক্ষাপটে দুদকের ভবিষ্যৎ নীতি ও কর্মকাণ্ডে নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, পদত্যাগের পর কমিশন হঠাৎ শূন্যস্থান নিয়ে কাজ করবে, যা প্রশাসনিক দিক থেকে সাময়িকভাবে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। এই পদত্যাগের পর নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য সরকারী প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ইফতার পার্টিতে যোগদানের কারণে সরে দাঁড়ানোর গুঞ্জন

একটি ইফতার পার্টিতে দুদক চেয়ারম্যানের যোগ দেয়ার কারণেই তাকেসহ পুরো কমিশনকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে। নতুন সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পরই দুর্নীতি দমন কমিশনে পরিবর্তনের কোনো আলোচনা ছিল না। কিন্তু ওই ইফতার পার্টি ঘিরেই দ্রুত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়।

দুদকের বিদায়ী চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব ছিলেন। এ কারণে তার প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক ধরনের সহানুভূতি ছিল। কিন্তু ড. মোমেন সরকারের অনুমতি ছাড়াই সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানের আমন্ত্রণে ইফতার পার্টিতে যোগ দেন। মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে আয়োজিত ওই ইফতার পার্টিতে সদ্য বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ বিদায়ী অনেক উপদেষ্টা অংশ নেন। আলোচনা আছে নির্বাচন বিলম্বিত করতে যে কয়জন উপদেষ্টা চেষ্টা করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ফাওজুল কবির খান। এ প্রক্রিয়ায় জড়িত উপদেষ্টাদের গতিবিধি নিয়ে সরকারেও এক ধরনের অস্বস্তি ছিল। এমন অবস্থায় সাবেক উপদেষ্টার বাসায় এমন ইফতার পার্টি নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। ওই ইফতার পার্টিতে সরকারের আরও কয়েকজন কর্মকর্তাও হাজির ছিলেন। যদিও তাদের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। ঘরোয়া ওই ইফতার পার্টির তথ্য ও ছবি প্রথম ফেসবুকে শেয়ার করেন বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। এরপরই এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই ইফতার পার্টির পর পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, কমিশনকে আচমকাই সরে দাঁড়াতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী এক মাস সময় নিয়ে দায়িত্ব ছাড়ার আবেদন করেন চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা। তবে সরকারের তরফে বলা হয়, এক মাস সময় নেয়ার প্রয়োজন নেই। তাৎক্ষণিক পদত্যাগপত্র গৃহীত হবে। তবে এক মাসের বেতনসহ সুযোগ-সুবিধা দেয়া হবে।

ইফতার পার্টিতে অংশ নেয়া ছাড়াও ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে গত বছরের ৯ই ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবসের এক অনুষ্ঠানে ড. আবদুল মোমেনের একটি বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের ভোটাররা প্রত্যাখ্যান করলে দেশে দুর্নীতি অনেকটাই কমে আসবে। নির্বাচনের আগে জামায়াত-এনসিপি জোটও এ ধরনের বক্তব্য দেয় নির্বাচনী সভা সমাবেশে। নির্বাচনের আগে দুদক চেয়ারম্যানের 
এই রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে তখনই প্রশ্ন উঠে বিভিন্ন মহল থেকে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *