■ নাগরিক প্রতিবেদক ■
উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। ২৮ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা হতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের নতুন দলের আহ্বায়কের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় তিনি তার পদত্যাগপত্র স্বাক্ষর করেন এবং তা জমা দেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম পদত্যাগ করেছেন। মঙ্গলবার দুপুরে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
পরে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার যে শক্তিতে স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়েছে, সেই শক্তিকে সংহত করতে আমি মনে করেছি যে, সরকারের থেকে সরকারের বাইরে রাজপথে আমার ভূমিকা বেশি হবে এবং আমার বাইরে যারা আমাদের সহযোদ্ধা রয়েছেন, তারাও এটিই চান। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমি আজ পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।
নাহিদ বলেন, গত ছয় মাসে আমি এবং আমরা আমাদের জায়গা থেকে চেষ্টা করেছি কাজ করে যাওয়ার। দুটি মন্ত্রণালয়ের বাইরেও অনেক অতিরিক্ত দায়িত্ব আমাদের পালন করতে হয়েছে। আমরা চেষ্টা করেছি এবং মন্ত্রণালয়গুলোতেও আমরা কিছু কাজ করেছি, সেই কাজের ফলাফল হয়ত সামনে জনগণ পাবে। ছয় মাস খুবই কম সময়। তারপরও আমি চেষ্টা করেছি। আমার কাজ ও ফলাফল জনগণ মূল্যায়ন করবে। আজ থেকে আমি সরকারের কোনো দায়িত্বে নেই।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সদ্য সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, আমার পরে কে দায়িত্ব নেবে সেটা উপদেষ্টা পরিষদই ঠিক করবে। আমি আমার জায়গা থেকে মনে করেছি, আমাকে বাইরে প্রয়োজন। এখনো আমাদের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হয়নি। বিচার এবং সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে এই সরকার গঠিত হয়েছিল, ছাত্ররা এসেছিল, সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে অন্য যে দুজন রয়েছেন, তারা মনে করছেন সরকারে তাদের এখনো দায়িত্ব রয়েছে। তারা এখনো সরকারে থেকেই জনগণকে সার্ভ করবেন। তারা যদি রাজনীতি করার প্রয়োজন বোধ করেন, তখন হয়ত সরকার ছেড়ে দেবেন।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নতুন যে রাজনৈতিক শক্তি এবং দল গঠন হচ্ছে, সেখানে অংশগ্রহণ করতে আমার অভিপ্রায় আছে। জনগণের সঙ্গে মিশে আবারও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং আমাদের যে গণঅভ্যুত্থান, এর যে প্রতিশ্রুতি সেটা বাস্তবায়নে মাঠে থেকে কাজ করার লক্ষেই আমি সরকার থেকে পদত্যাগ করেছি।
নাহিদ বলেন, আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা তো ছিলই। আমরা সেই সীমাবদ্ধতাগুলো কাটানোর চেষ্টা করেছি সবসময় এবং এখানে সীমাবদ্ধতা ছিল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছিল, আমরা এসে এই ব্যুরোক্রেসিকে যেভাবে পেয়েছি, এখানে পুলিশের আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি হয়েছে আন্দোলনের পরে এবং একইসঙ্গে জুলাইয়ের যারা গণহত্যাকারী তাদের গ্রেফতার, বিচারের বিষয়টা, সে বিষয়ে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা কাজ করেছি।
তিনি আরও বলেন, আমি জনপ্রশাসন কমিটির একটি দায়িত্ব দুই সপ্তাহের মতো ছিলাম এবং দুই সপ্তাহের মিটিংয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, যারা ২০১৮ সালের ডিসি ছিল এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের সরানোর ব্যবস্থা, এরকম কিছু উদ্যোগ আমরা নিয়েছি।
নাহিদ বলেন, আমি আশা করব যে, অন্তর্বর্তী সরকার সামনের দিনগুলোতে জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা, গণঅভ্যুত্থানের যে আকাঙ্ক্ষা, সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হবে এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং দ্রব্যমূল্য নিরসনে সফলতা দেখাতে পারবে।

আবেগাপ্লুত হয়ে নাহিদকে জড়িয়ে ধরেন প্রধান উপদেষ্টা
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্ট্যাটাস দিয়ে বর্ণনা করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, ‘এদিন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় নাহিদ ইসলামের সঙ্গে স্ত্রী, বাবা-মা ও ছোট ভাই এসেছিলেন। জুলাই বিপ্লবের শীর্ষ নেতা নাহিদ উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেন এবং প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করেন। এসময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস আবেগাপ্লুত হয়ে নাহিদকে জড়িয়ে ধরেন। এরপর তিনি নাহিদ ও তার পরিবারের সঙ্গে ছবি তোলেন। ছেলের জন্য ড. ইউনূসের কাছে দোয়া চেয়েছেন নাহিদের মা। এর আগে মন্ত্রিসভার সব সদস্যের সঙ্গে ছবি তোলেন নাহিদ। তারা একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ করেন এবং একটি সংক্ষিপ্ত মন্ত্রিসভা করেন।
প্রেস সচিব আরও বলেন, নাহিদের বাবা-মা যখন যমুনা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, তখন তার মা আমার সঙ্গে ছবি তুললেন। এতে মনে হলো তিনি আমার পূর্ব পরিচিত।’
তার আগে এক স্ট্যাটাসে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হয়তো একদিন নাহিদ দেশের প্রধানমন্ত্রীও হতে পারেন। দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রেস সচিব বলেন, দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক চিন্তাধারার অধিকারী নাহিদ ইসলাম। তার বয়স মাত্র ২৬ বছর কিন্তু এরইমধ্যে নৃশংস স্বৈরাশাসকের বিরুদ্ধে গণজাগরণে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি আগামী কয়েক দশকে দেশের রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবেন। আল্লাহ জানে, একদিন হয়তো তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রীও হতে পারেন।
এছাড়াও তথ্য উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করা নাহিদ ইসলামের আগামীর যাত্রায় শুভ কামনা জানিয়েছেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ। ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, সহকর্মী, সহযোদ্ধার সঙ্গে সরকারে শেষ দিন। আগামীর যাত্রা শুভ হোক।
‘লড়াই শেষ হয়নি, নতুন রূপে শুরু’
মঙ্গলবার পদত্যাগের পর বিকাল ৩টা ৩৪ মিনিটের দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি একথা বলেন। ফেসবুক পোস্টে প্রধান উপদেষ্টার কাছে আবেদন করা নিজের পদত্যাগপত্রটিও প্রকাশ করেছেন।
গত কয়েকদিন ধরেই গুঞ্জন চলছিল নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক দল আসছে। উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামও বেশ কয়েকবার জানিয়েছিলেন পদত্যাগ করেই তিনি নতুন দলে যোগ দেবেন।
আজকে তার পদত্যাগের মধ্যদিয়ে সে পথ অনেকটা সুগম হলো।নতুন দলে যোগ দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি। তথ্য ও সম্প্রচার এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছিলেন নাহিদ।মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
পরে ফেসবুক পোস্টে নাহিদ লিখেছেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের শহিদ, যোদ্ধা ও আপামর জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়ে আগস্টে সরকারে যোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই স্বপ্ন কেবল সরকারের ভেতরে থেকে পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই আজ আমি সরকার থেকে বিদায় নিচ্ছি- একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। লড়াই শেষ হয়নি, এটি শুধু নতুন রূপে শুরু হচ্ছে।’
নাহিদ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। তাকে নতুন দলের আহ্বায়ক করা হতে পারে। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি নতুন এই রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে।