যুক্তরাষ্ট্র কী ইরানের সাথে যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে

■ এ কে এম শোয়াইবুল ইসলাম ■ 

ভারতের জনপ্রিয় সামরিক ম্যাগাজিন ফোর্সের সাংবাদিক তার রিসেন্ট ভিডিওতে চলমান ইসরায়েল- ইরান যুদ্ধ নিয়ে আলোচনায় দাবি করেন যে আমেরিকা এই যুদ্ধে ইতিমধ্যে হেরে গেছে।

তিনি তার সাম্প্রতিক ভিডিওতে কি বলেছেন তার বিস্তারিত নিচে দেওয়া হল-

আজ যুদ্ধের ১৭তম দিনে বলা যায় যে পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র কার্যত এই যুদ্ধে হেরে গেছে। মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট বলেছেন, যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হতে পারে। কেন কয়েক সপ্তাহ, বা হয়তো তারও কম সময়? কারণ আমেরিকা এখন এমন একটি উপায়ে যুদ্ধ থেকে বের হতে চাইছে যাতে তাদের সম্মান কিছুটা রক্ষা পায়। কিন্তু তা সহজ হবে না।

কারণ ইরান যুদ্ধবিরতি চায় না। তারা একটি স্থায়ী সমাধান চায় এবং যুদ্ধ শেষ করার জন্য তারা খুব কঠোর কিছু শর্ত দিয়েছে। তাদের সবচেয়ে কঠোর শর্ত হলো—মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকান বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে চলে যেতে হবে। এটি এমন একটি বিষয় যা আমেরিকার জন্য মেনে নেওয়া খুব কঠিন।

এ কারণে মধ্যস্থতার প্রয়োজন হবে। এমন একটি দেশের প্রয়োজন হবে যা দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসাতে পারে এবং উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য একটি সমাধান বের করতে পারে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় থেকেই স্পষ্ট ছিল যে আমেরিকার জন্য এটি ছিল একটি “পছন্দের যুদ্ধ” (war of choice)। কিন্তু তারা যুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য ঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারেনি। তারা যুদ্ধের মূল কেন্দ্র বা “center of gravity” ভুলভাবে চিহ্নিত করেছিল। ফলে তাদের যুদ্ধ মূল্যায়ন ও পরিকল্পনা সঠিক ছিল না। সেই ভুল পরিকল্পনা নিয়েই তারা যুদ্ধে নেমেছিল।

আজকের বাস্তবতা হলো এই যুদ্ধ মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রেকে সমর্থন করছে ইসরায়েল এবং ইরানকে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে সমর্থন দিচ্ছে রাশিয়া ও চীন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও এটি স্বীকার করেছেন।

এখন পরিস্থিতি এমন যে আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কোন জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাঙ্কার এই প্রণালী দিয়ে যাবে আর কোনটি যাবে না—তা এখন ইরান সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুবই হতাশাজনক পরিস্থিতি।

এখন খবর পাওয়া যাচ্ছে যে, হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনে বিভিন্ন সামরিক পরিকল্পনা আলোচনা করা হচ্ছে—কিভাবে এই অবরোধ ভাঙা যায়। কিন্তু বাস্তবে এসব পরিকল্পনা কার্যকর হওয়ার মতো নয়। সাধারণত এসব পরিকল্পনা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই করা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা করেনি।

ইরান বহু বছর ধরে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগর জুড়ে শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা তৈরি করেছে। এই অঞ্চলের পানির গভীরতা কম হওয়ায় তারা ভূগর্ভস্থ টানেল তৈরি করেছে এবং সেখানে দীর্ঘপাল্লার অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, মাইন, সাবমেরিন এবং দ্রুতগামী মিসাইলবাহী নৌকা মোতায়েন করেছে।

এই সব মিলিয়ে তারা একটি শক্তিশালী A2/AD (Anti-Access Area Denial) সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা শত্রু বাহিনীকে ওই এলাকায় প্রবেশ করতে বাধা দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরিকল্পনা ছিল ইরানের খার্গ দ্বীপ (Kharg Island) দখল করা। এটি ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি টার্মিনাল, যেখান থেকে প্রায় ৯০% ইরানি তেল রপ্তানি হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে হলে হরমুজ প্রণালী ও পুরো পারস্য উপসাগর পার হতে হবে, যেখানে ইরানের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে।

আরেকটি পরিকল্পনা ছিল বিশেষ বাহিনীকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সেখানে পাঠানো। কিন্তু তাদের নিরাপত্তা, সরবরাহ ও টিকে থাকা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন।

এছাড়া ইরানে সরাসরি স্থল আক্রমণের কথাও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ইরান ইরাকের মতো নয়। দেশটি অনেক বড়, পাহাড়ি অঞ্চল রয়েছে এবং তাদের প্রায় ১০ লাখের বেশি সেনা রয়েছে। এছাড়া বিপুল সংখ্যক মিলিশিয়া বাহিনীও রয়েছে।

এই কারণেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন দ্রুত এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার উপায় খুঁজছেন। তিনি ন্যাটো মিত্রদের সাহায্য চাইছেন এবং বলেছেন তারা যদি সাহায্য না করে তবে তাদের ভবিষ্যতের জন্য তা ভালো হবে না।

তিনি চীনকেও আহ্বান জানিয়েছেন উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করার জন্য। তবে বাস্তবে রাশিয়া ও চীন ইরানকে সমর্থন করছে এবং তারা চায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ুক।

এই পুরো পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হলো সৌদি আরব। সৌদি আরব বর্তমানে এমন একটি নীতি অনুসরণ করছে যেখানে তারা একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন (Vision 2030)।

সৌদি আরব একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অন্যদিকে তারা চীনের Belt and Road Initiative-এও অংশ নিয়েছে এবং ব্রিকসের সাথেও সম্পর্ক বাড়াচ্ছে।

২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের শত্রুতার অবসান হয়েছিল।

এই প্রেক্ষাপটে চীন ও রাশিয়া চাইছে একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে উঠুক যেখানে ইরান, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং অন্য শক্তিগুলো একসাথে থাকবে।

মার্চ ৩১ তারিখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন সফর হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বিরল খনিজ (rare earth) এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায় যে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনেক দুর্বল হয়ে গেছে।

সম্পর্কিত লেখা:

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *