ভারতে টি-২০ বিশ্বকাপ বয়কট করল বাংলাদেশ

■ ক্রীড়া প্রতিবেদক ■

ভারতে টি-২০ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে না বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে জাতীয় দলের ক্রিকেটার, বোর্ড সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকের পর যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এ সিদ্ধান্তের কথা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

আসিফ নজরুল বৈঠক শেষে বলেন, ‘ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়া সরকারের সিদ্ধান্ত। সেখানে ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা শঙ্কা রয়েছে, যেটা ক্রিকেটারদের জানার কথা নয়। বৈঠকে ক্রিকেটারদের জানানো হয়েছে, ঠিক কী কী কারণে বাংলাদেশ ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে না।’

ক্রীড়া উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেই, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে ভারতে বিশ্বকাপে না খেলা- এটা সরকারের সিদ্ধান্ত। কোন একটা দেশের মানুষ অন্য দেশে গেলে নিরাপত্তা ঝুঁকি আছে কিনা- এটা সরকার বিবেচনা করে দেখে। অন্য কারোর এটা বিবেচনার সুযোগ নেই।’

বিশ্বকাপে না গেলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ক্ষতি প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপে খেললে বাংলাদেশের কী ক্ষতি হবে সেটাও বিবেচনা করা উচিত। মাথানত করে, নিজের দেশের মানুষকে নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে ফেলে, এই আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা না করে, নির্ঘাত ঝুঁকির মধ্যে শুধু খেলোয়াড় নয়, দর্শক-সাংবাদিকদের ঠেলে দিলে কী ক্ষতি হতে পারে সেটাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।’

ক্রীড়া উপদেষ্টা আশা করছেন, বাংলাদেশ দল ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) থেকে সুবিচার পাবে এবং ভারতে ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা শঙ্কার বিষয়টি বিবেচনা করে শ্রীলঙ্কায় বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ দেবে। ‘বিশ্বকাপে খেলা বাংলাদেশের অধিকার’- বলে উল্লেখ করেন তিনি।  

ক্রিকেটারদের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ক্রিকেটারদের সঙ্গে যে কথা হয়েছে, সেটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাদের কোনো কথা আমি সাংবাদিকদের বলবো না। তবে তারা বললে বলতে পারেন। আমাদের বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল, কেন সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা তাদের বুঝিয়ে বলা। আমার মনে হয়েছে, তারা বুঝতে পেরেছে। তারা বৈঠকে কী কী বলেছে সেটা বলার অধিকার আমার নেই।’

পরে বিসিবি সভাপতি বলেন, ‘আমরা বিশ্বকাপে খেলতে চাই। দল রেডি আছে। তবে ভারতে নয়, খেলতে চাই শ্রীলঙ্কায়। ছেলেরা যাতে খেলতে পারে সেজন্য লড়াই চালিয়ে যাবো। এখনই হাল ছাড়ছি না, আইসিসিকে আমরা আবারো বুঝিয়ে বলবো।’ ভারতে বিশ্বকাপ খেলা না খেলার আল্টিমেটাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এভাবে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিতে পারে না আইসিসি।’   

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের আবেদনের ওপর বুধবার বোর্ড সদস্যদের ভোট শেষে আইসিসি জানায়, বিশ্বকাপে অংশ নিতে হলে বাংলাদেশকে ভারতেই যেতে হবে। বাংলাদেশ না যেতে চাইলে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়তে পারে এবং সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিবর্তে অন্য একটি দল নেওয়া হতে পারে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) এ বিষয়ে নিজেদের চূড়ান্ত অবস্থান জানাতে এক দিন সময় চেয়ে নেয়।

ওয়ানডে বিশ্বকাপ, টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ, অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ও চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে মিলিয়ে ক্রিকেট ইতিহাসের পাঁচটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা

১৯৯৬ ওয়ানডে বিশ্বকাপ: শ্রীলঙ্কায় যায়নি অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ

সহস্বাগতিক শ্রীলঙ্কায় তখন গৃহযুদ্ধ চলছিল। টুর্নামেন্ট শুরুর দুই সপ্তাহ আগে কলম্বোয় বোমা হামলার ঘটনা নিরাপত্তাশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দেয়। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সংহতি জানাতে ভারত ও পাকিস্তানের যৌথ একাদশ কলম্বোয় একটি প্রীতি ম্যাচ খেললেও অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় যেতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে ওই ম্যাচগুলোতে তারা পয়েন্ট হারায় (ওয়াকওভার)। তবু তিন দলই কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। শেষ পর্যন্ত লাহোরে ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে শিরোপা জেতে শ্রীলঙ্কা।

২০০৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপ: জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়ায় যায়নি ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড

আফ্রিকায় প্রথম বিশ্বকাপে (দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়া) ঘটে দুটি আলাদা ঘটনা—
• ইংল্যান্ড হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। সে সময়ের ব্রিটিশ সরকার রবার্ট মুগাবে সরকারের বিরোধিতা করছিল। মুগাবের আমলে সেখানে দল পাঠাতে চায়নি ব্রিটিশ সরকার।
• নিউজিল্যান্ড নিরাপত্তাশঙ্কায় নাইরোবিতে কেনিয়ার বিপক্ষে খেলতে যায়নি। এর কয়েক মাস আগে মোম্বাসায় বোমা হামলা হয়েছিল।
দুই দলই ম্যাচ অন্য ভেন্যুতে সরানোর অনুরোধ জানালেও আইসিসি তা মানেনি। ফলে জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়া ওয়াকওভার পায়। ইংল্যান্ড গ্রুপ পর্বেই বিদায় নেয়, আর কেনিয়া মুফতে দুই পয়েন্ট পেয়ে সুপার সিক্সে ওঠে ও পরে উঠে যায় সেমিফাইনালেই।

২০০৯ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ: সরে দাঁড়ায় জিম্বাবুয়ে

মুগাবে সরকারের সঙ্গে ইংল্যান্ডের সম্পর্ক তখন আরও তিক্ত। ইংল্যান্ডে আয়োজিত ২০০৯ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের খেলোয়াড়দের ভিসা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। জিম্বাবুয়ের খেলোয়াড়দের ভিসা না দিলে বিশ্বকাপ ইংল্যান্ড থেকে অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়ার চিন্তাভাবনাও শুরু হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালের জুলাইয়ে জিম্বাবুয়ে ‘খেলার বৃহত্তর স্বার্থে’ টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তারা পূর্ণ অংশগ্রহণ ফি পায়, আর বাছাইপর্ব থেকে উঠে এসে স্কটল্যান্ড জায়গা করে নেয়।

২০১৬ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ: বাংলাদেশে আসেনি অস্ট্রেলিয়া

২০১৫ সালে নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ সফর বাতিল করেছিল অস্ট্রেলিয়া। একই অবস্থান তারা ধরে রাখে ২০১৬ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপেও। আইসিসি অস্ট্রেলিয়ার সিদ্ধান্তকে ‘সম্মান’ জানালেও হতাশা প্রকাশ করে। অস্ট্রেলিয়ার জায়গায় খেলেছিল আয়ারল্যান্ড।

২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি: পাকিস্তানে খেলেনি ভারত

২৯ বছর পর পাকিস্তানে কোনো আইসিসি টুর্নামেন্ট—২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। তবে প্রশ্ন ছিল—ভারত যাবে কি না। ২০২৩ বিশ্বকাপে পাকিস্তান ভারতে খেললেও দুই বছর পর সরকারের কাছ থেকে অনুমতি না পাওয়ার কথা জানিয়ে পাকিস্তানে যেতে অস্বীকৃতি জানায় বিসিসিআই।
শেষ পর্যন্ত আইসিসির সঙ্গে সমঝোতায় ২০২৪-২৭ চক্রে সিদ্ধান্ত হয়, ভারত ও পাকিস্তান একে অন্যের দেশে আয়োজিত আইসিসি টুর্নামেন্টে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলবে। সে অনুযায়ী ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারতের ম্যাচগুলো হয় দুবাইয়ে, আর ভারতই শেষ পর্যন্ত শিরোপা জেতে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *