𓂃✍︎ ক্রীড়া প্রতিবেদক 𓂃✍︎
গত অক্টোবরের নির্বাচনে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)।
একই সঙ্গে সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে হবে নির্বাচন। মঙ্গলবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে এনএসসির ক্রীড়া পরিচালক মোহাম্মদ আমিনুল এহসান আনুষ্ঠানিকভাবে পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার এই ঘোষণা দেন।
সংবাদ সম্মেলনে আমিনুল এহসান গত নির্বাচন নিয়ে গঠিত এনএসসির তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিসিবির বর্তমান পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়টি ইতোমধ্যে ইমেইলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আইসিসির কাছে সদ্য গঠিত অ্যাডহক কমিটির নাম এবং অনিয়ম তদন্তের বিস্তারিত প্রতিবেদনও পাঠানো হয়েছে।
দুই দিন আগে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে গিয়ে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছিল কমিটি। তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে প্রমাণ পেয়েছে যে, বিসিবির নির্বাচন পুরোপুরি স্বচ্ছ ছিল না। এমনকি বর্তমান পরিচালকদের মধ্যেও একাধিকজন তদন্ত কমিটির কাছে এই অনিয়মের কথা স্বীকার করেছিলেন।
এনএসসির জরুরি বৈঠকের আগে গুঞ্জন ছিল ১৫ সদস্যের কমিটি হওয়ার। তবে শেষ পর্যন্ত তিন মাসের মেয়াদে ১১ সদস্য বিশিষ্ট অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার নেতৃত্বে থাকছেন তামিম ইকবাল। অ্যাডহক কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন: রাশনা ইমাম, মির্জা ইয়াসির আব্বাস, সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদ, ইসরাফিল খসরু, মিনহাজুল আবেদীন, আতহার আলী খান, তানজীম চৌধুরী, সালমান ইস্পাহানি, রফিকুল ইসলাম, ফাহিম সিনহা।
অক্টোবরের ওই বিতর্কিত নির্বাচনের পর ২৫ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, বিসিবি এমনিতেই নড়বড়ে অবস্থায় ছিল। বর্তমান বোর্ডে টিকে ছিলেন মাত্র ১৭ জন পরিচালক। দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পার না হতেই বোর্ডের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ও বোর্ড ভেঙে যাওয়ার শঙ্কায় ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন সাতজন পরিচালক। এবার এনএসসির হস্তক্ষেপে পুরো পর্ষদই বিলুপ্ত হয়ে গেল।
সন্ধ্যায় অ্যাডহক কমিটির সদস্যদের নিয়ে সংক্ষিপ্ত সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে আসেন তামিম। বিসিবির ইতিহাসে তিনি যেমন সর্বকনিষ্ঠ বোর্ড সভাপতি, তাঁর সংবাদ সম্মেলনও হলো সংক্ষিপ্ত সময়ের। তামিমদের এই কমিটির মূল দায়িত্ব তিন মাসের মধ্যে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। কিন্তু তাঁরাও কি সেই নির্বাচনে অংশ নেবেন? সরাসরি না বললেও তামিমের উত্তরে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইঙ্গিতই রইল, ‘অবশ্যই, অবশ্যই আমরা নির্বাচন করব। এখানে ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করতে হবে। আমার ইচ্ছা থাকতে পারে। আমি করতে পারি। তিনি করতে পারেন। তাঁর ইচ্ছা নাও থাকতে পারে। স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে শুধু আমরা না, যাঁরা যাঁরা আগ্রহী, সবাইকে অনুরোধ করব যেন সবাই অংশ নেন। আমরা যেন একটা সুন্দর নির্বাচন করে দিয়ে যেতে পারি, সেই পরিবেশ তৈরি করে দেব। যেখানে সবাই এসে নির্বাচন করতে পারবে।’
বিসিবির নির্বাচন নিয়ে অনিয়ম তদন্তে স্বাধীন তদন্ত কমিটির রিপোর্টের সুপারিশমালায় গঠনতন্ত্র ব্যাপকভাবে সংশোধনের কথা বলা আছে। ফলে এই সুপারিশকে গুরুত্ব দিলে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করা কতটা সম্ভব, তা সময়ই বলে দেবে। কারণ, এর আগে কখনোই অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ ৯০ দিনের মধ্যে শেষ হয়নি। অ্যাডহক কমিটির সদস্যরা নির্বাচন করতে পারবেন কি না, আজ দুপুরে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এ ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট কিছু বলেননি এনএসসির ক্রীড়া পরিচালক আমিনুল এহসান।
২০০৫, ২০০৮ এবং ২০১৩ সালে বিসিবির নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন অ্যাডহক কমিটির অধিকাংশ সদস্য। তাঁদের অনেকেই নির্বাচিত হয়েছেন। গঠনতন্ত্রেও এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো বিধি নেই। অর্থাৎ চাইলেই তামিম কেন, অ্যাডহক কমিটির সকল সদস্য বিসিবির পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর বিসিবির নির্বাচনের আগে একটা পক্ষ নির্বাচন বর্জন করেছিল। বুলবুলের সঙ্গে তামিমের বিসিবি সভাপতি হওয়ার পদে লড়াই হওয়ার থাকলেও তা আর হয়নি। পরে সমঝোতার কথাও জানা গিয়েছিল। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিসিবি সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার ৬ মাসের মধ্যে সরকার ভেঙে দিয়েছে তাঁর পরিচালনা পর্ষদ। তার আগে গত বছরের ৩০ মে এনএসসি মনোনীত হয়ে আইসিসির চাকরি ছেড়ে বিসিবির সভাপতি হয়েছিলেন। তৎকালীন সভাপতি ফারুক আহমেদকে এনএসসি সরিয়ে দেওয়ার পর বুলবুলকে বিসিবি সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছিল।
একটি মনে রাখার মতো টি-টোয়েন্টি ইনিংস খেলার লক্ষ্যে দেশের ক্রিকেট প্রশাসনে এসে পরে নানা রাজনৈতিক হিসাবের মারপ্যাঁচে বুলবুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন টেস্ট ইনিংস খেলবেন। কিন্তু প্রতিপক্ষের আগুনে বাউন্সার আর অন্তর্দ্বন্দ্বের শিকার বুলবুল ‘টেস্ট ইনিংস’টা বেশি লম্বা করতে পারেননি।
সরকার ক্রিকেটীয় স্বায়ত্তশাসনের গলায় ছুরি ধরেছে, আইসিসির হস্তক্ষেপ চেয়েছেন বুলবুল
আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন কমিটি ভেঙে বিসিবিতে অ্যাডহক কমিটি দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। এই কমিটির প্রধান হিসেবে বিসিবি সভাপতি হয়েছেন তামিম ইকবাল। ১১ সদস্যের কমিটির তিনজন বিএনপির মন্ত্রীর ছেলে, আছেন এক প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রীও। তামিমরা দৃশ্যপটে আসতেই বিকেলের মধ্যে বিসিবি ছাড়তে হয় বুলবুলকে। তবে নিজেকে এখনো বৈধ সভাপতি হিসেবে দাবি করছেন তিনি।
এনএসসি কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনকে ‘ত্রুটিপূর্ণ ও আইনত অচল’ আখ্যা দিয়ে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন বুলবুল। একই সঙ্গে তামিম ইকবালের নেতৃত্বে গঠিত অ্যাডহক কমিটিকে ‘সাংবিধানিক অভ্যুত্থান’ হিসেবে অভিহিত করে আইসিসির হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।
আজ এক বিজ্ঞপ্তিতে আমিনুল ইসলাম বুলবুল বিসিবির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন।
২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কোনো ধরনের কারচুপি বা ক্ষমতার অপব্যবহার হয়নি বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। বুলবুল জানান, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসেন, সিআইডির প্রধান সিবগাত উল্লাহ এবং এনএসসির নির্বাহী পরিচালকের সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ কমিশনের অধীনেই নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছিল। তামিম ইকবালের কাউন্সিলরশিপ ও ১৫টি ক্লাবের ভোটাধিকার নিয়ে ওঠা আপত্তিগুলোও তখন আইনি শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিসিবির মতো একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী প্রক্রিয়া তদন্ত করার কোনো আইনি এখতিয়ার এনএসসির নেই। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের নির্দেশে হওয়া এই তদন্তকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ হিসেবে বর্ণনা করেন বুলবুল। তাঁর মতে, আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী সদস্য বোর্ডগুলো সরকারি হস্তক্ষেপমুক্ত থাকার কথা থাকলেও এখানে তার লঙ্ঘন হচ্ছে। বুলবুল বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সম্প্রদায়কে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, সরকার আমাদের ক্রিকেটীয় স্বায়ত্তশাসনের গলায় ছুরি ধরেছে।
নির্বাচিত বোর্ড ভেঙে দিয়ে তামিম ইকবালের নেতৃত্বে গঠিত অ্যাডহক কমিটিকে ‘অবৈধ’ ও ‘শাম এন্টনি’ বা ভুয়া সত্তা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। তিনি বলেন, এনএসসি অধ্যাদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বায়ত্তশাসনের টুঁটি চেপে ধরার শামিল।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভাবমূর্তি রক্ষায় ও বর্তমান অস্থিতিশীলতা কাটাতে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
বুলবুল জানিয়ে দিয়েছেন, উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত কোনো রায় না আসা পর্যন্ত তিনিই বিসিবির বৈধ সভাপতি হিসেবে বহাল আছেন।
