■ মুজতবা খন্দকার ■
মার্কিন প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, বাংলাদেশ জঙ্গিদের চারনভূমি হয়ে উঠেছে। আবার বাংলাদেশে কোনো উগ্রবাদী জঙ্গী নেই। এই দুই পক্ষের কোনো পক্ষের সাথে একমত পোষন না করেও বলা যায়, ৫ আগষ্টের পর যা ঘটেছে সেগুলো কোনোভাবেই ঘটা উচিত ছিল না। বিশেষ করে হাসিনার ফ্যাসিষ্ট রেজিম পতনের জন্য যদি আপনি জেন-জিকে ক্রেডিট দেন। তাহলে তো কোনোভাবেই উচিত ছিল না ৫ আগষ্টের পর দেশে এমন সব উশৃঙ্খলতা প্রশ্রয় দেয়া কিংবা জেন-জির এসব উশৃঙ্খলতাকে স্পন্সর করা। এমনিতেই পশ্চিমা মিডিয়ার ইসলামোফোবিয়া নিয়ে এক ধরনের কুমতলব আছে, ছিল সব সময়। সুতরাং, আগষ্ট গণঅভ্যুত্থানের পর, কিছু কিছু ইউটিউবার,কিংবা সোশাল মিডিয়া কিছু সেলিব্রিটির ইনফ্লুয়েন্সে জেন-জির তথাকথিত বালখিল্য পদক্ষেপ অন্তর্বর্তী সরকারকে দেশে বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অবশ্য এর জন্য সরকারও দায় এড়াতে পারেনা। শুরুটা হয়েছিল, আগষ্ট গণঅভ্যুত্থানের পর পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দুজনকে পিটিয়ে হত্যার মাধ্যমে। ওই দুইটা দু:খজনক ঘটনার পর, জেন-জির আগ্রাসী প্রতিশোধপরায়নতার রাশ টেনে ধরার দরকার ছিল। কিন্তু সরকার ছিলো নির্বিকার। বরং প্রচ্ছন্ন মদদ ছিল সরকারের। ফলে দিনে দিনে তারা হয়ে উঠলো বেপরোয়া। তখন হাসিনার পুলিশবাহিনী পলাতক। থানা পুলিশ বলতে কিছু ছিল না।ফলে সুযোগ সন্ধানীরা মওকা বুঝে শুরু করল অরাজকতা। অবশ্য সেনাবাহিনী তখন মাঠেই ছিলো,কিন্তু রহস্যজনকভাবে তারাও ছিলো কাঠপুত্তলির মত নিরব। ফলে বেপরোয়াভাবে তখন যে যার মত সমাজে এরোগেন্সি শো করে যাচ্ছিলো।
এরপর বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা যেভাবে সরকারের চেয়ে নিজেদের পাওয়ারফুল ভাবতে শুরু করলেন, সেটা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। যেখানেই সমস্যা, সেখানেই তারা। একে ধরে,ওকে মারে। রীতিমত অরাজকতা। সরকারের ভেতরে যেন আরেকটা সরকার। মবতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে দেশটাকেই মবের মুল্লুক বানিয়ে ছেড়েছিল। ওদের আচরনটাই ছিলো একাত্তরে দেশ স্বাধীনের পর মুজিববাহিনীর মত।
প্রথম তিন চার মাস না হয়, মাফ করা গেলো। নভেম্বর ডিসেম্বরের পর, আর কি এমন এনার্কি এক্সকিউজ করা যায়? সেগুলোও হলো। বত্রিশ নাম্বার তাড়িয়ে তাড়িয়ে ভাঙচুর হলো দুইদিন ধরে,কই সরকারের কোনো বাহিনীতো সেখানে প্রতিরোধ করতে এলো না। আমি বত্রিশ নম্বর ভাঙ্গার বিপক্ষে বলছি না,আমি বলছি, জেন-জির স্বেচ্ছাচারীতার কথা। বত্রিশ নম্বর সরকার নিজেই তো অধিগ্রহণ করতে পারতো। ঘোষনা দিত, বত্রিশই হবে জুলাই যাদুঘর। সেটা সরকার করবে। গণভবনের মত একটা বিশাল জায়গা শুধুমাত্র জুলাই আন্দোলনের জন্য সংরক্ষিত করা আমি মনে করি বাড়াবাড়ি।
এরপর বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা যেভাবে সরকারের চেয়ে নিজেদের পাওয়ারফুল ভাবতে শুরু করলেন,সেটা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। যেখানেই সমস্যা, সেখানেই তারা। একে ধরে,ওকে মারে। রীতিমত অরাজকতা। সরকারের ভেতরে যেন আরেকটা সরকার। মবতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে দেশটাকেই মবের মুল্লুক বানিয়ে ছেড়েছিল। ওদের আচরনটাই ছিলো একাত্তরে দেশ স্বাধীনের পর মুজিববাহিনীর মত।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের কোনো সারবত্তা নেই, ড. ইউনূস চায়না সফর করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বিলা হয়েছে বলে বাংলাদেশ নিয়ে এমন প্রতিবেদন ছেপেছে, যারা এই তত্ত্ব কপচাচ্ছেন তাদের বলি, সব কিছুর সরলীকরণ করা ঠিক নয়। আত্মজিজ্ঞাসারও দরকার আছে, কখনো কখনো দরকার হয়।
সবশেষ, হিযবুত তাহরির ঘোষনা মার্চ টু খেলাফত করল। খিলাফত প্রতিষ্ঠার দাবি। কি হাস্যকর! এই একবিংশ শতাব্দিতে খিলাফত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এসব হুজুগে সব আন্দোলনই সরকারের টলারেন্সের পরীক্ষা হিসেবে নিয়ে দেশ ও জাতির কাছে প্রমান করতে চেয়েছে, দেখো, হাসিনা কাউকে নুন্যতম ফ্রিডম অব স্পিচ যেখানে দেয়নি, সেখানে আমরা কত উদার, কত সহিষ্ণু যে সবাইকে মত প্রকাশের সুযোগ করে দিচ্ছি। আসলে, সরকারের এই নীতিটাই ছিল ভুল; তাদের জন্য বুমেরাং। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে আপনি যথেচ্ছাচারকে প্রশ্রয় দিতে পারেন না। আপনি নিষিদ্ধ দলকে মিছিল সমাবেশ করতে দিতে পারেননা। আমি ধরে নিলাম, হিযবুত তাহরির কোনো এক্সট্রিমিষ্ট দল না। হাসিনা তাদের জেদের বশে নিষিদ্ধ করেছিলো। তাহলে সরকারের উচিত ছিলো, দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া, কিন্তু সেটা না করে,তাদের ব্যাপক আস্ফালনের সুযোগ করে দিয়ে বর্হিবিশ্বে কি মেসেজ দিলো?
সুতরাং, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের কোনো সারবত্তা নেই, ইউনূস চায়না সফর করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বিলা হয়েছে বলে বাংলাদেশ নিয়ে এমন প্রতিবেদন ছেপেছে, যারা এই তত্ত্ব কপচাচ্ছেন তাদের বলি, সব কিছুর সরলীকরণ করা ঠিক নয়। আত্মজিজ্ঞাসারও দরকার আছে, কখনো কখনো দরকার হয়।
। দুই।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির দ্বিতীয় প্রধান। ব্যক্তিগতভাবে স্বজ্জনও সুভাষী। গত ১৫ বছরে হাসিনা শাসনামলে তিনি কতটুকু কি করেছেন বা করতে পারেননি সেটা তাঁর দল এবং ইতিহাস মূল্যায়ন করবে।একটি দলের মহাসচিব পদে একজন রাজনীতিক কতদিন বা কত বছর থাকতে পারেন বা পারবেন সেটা নিতান্তই সেই দলের অভ্যন্তরীন বিষয়। দল যদি মনে করে তাঁকে আমৃত্যু মহাসচিব রাখবে, কিংবা দলে অপেক্ষাকৃত তরুন কাউকে মহাসচিব করবে (যদিও সে রকম তরুন অনেক আছে,কিন্ত বিএনপি সে দিকে হাটবে বলে মনে হয়না,তবুও ছাত্রদের নতুন দলকে মোকাবেলার জন্য অপেক্ষাকৃত তরুনদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনা সময়ের দাবি) সেটাও তাদের নিজস্ব ব্যাপার। তবে, যতদিন মির্জা সাহেব বিএনপির মহাসচিব আছেন,ততদিন আমি তাঁকে সমীহ করি, তাঁকে শ্রদ্ধা করি,তাঁর কোন অসম্মান আমি চাইনা। আমি বলছি না যে, তিনি শতভাগ ঠিক। তাঁর বহু সিদ্ধান্ত, বহু আলাপের সাথে আমি একমত নই। কিন্তু তাই বলে আমি তাঁর মতামতকে নাকচ করতে পারিনা। কারন তিনি সিজনাল পলিটিশিয়ান। তবে,তিনি যে হান্ড্রেড পার্সেন্ট পারফেক্ট সেটা বলছি না। কোনো রাজনীতিকই শতভাগ পারফেক্ট নন। তবে, রাজনীতিবিদরা হচ্ছেন ভিশনারী। তাঁরা, যেখানে নদী নেই, কস্মিনকালেও হবার কোনো সম্ভাবনাও নেই, সেখানে কল্পিত নদী তৈরী করে জনগনকে প্রতিশ্রুতি দেন,সেই নদীতে ব্রিজ করে দিয়ে চলাচলের পথ সুগম করে দেবেন। এটা একটা রুপক গল্প। কিন্তু এর পেছনে যে কথাটা সবচেয়ে বলা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে, রাজনীতিবিদরা সব সময় জনকল্যানের কথাই ভাবেন।তাঁরা জনগনের সাথে সবসময় সেতৃবন্ধন ঘটাতে চান।
মির্জা ফখরুলের সাম্প্রতিক একটা বক্তব্য নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে, আমার দীর্ঘদিনের ফেসবুক বন্ধু, আমান আবদুল্লাহর একটা পোষ্ট চোখে পড়লো,তিনি যেভাবে মির্জা সাহেবকে অংকিত করলেন,পড়ে খুবই কষ্ট পেলাম। একজন বর্ষিয়ান পলিটিশিয়ান, না হয় বাদ দিলাম,একজন সিনিয়র সিটিজেন তিনি। তাঁকে এমন নির্মমভাবে গালিগালাজ না করলেই কি পারতেন না আমান? মির্জা ফখরুল,কি এমন খারাপ বলেছেন, তিনি বলেছেন,সোশাল মিডিয়ায় যারা বড় বড় সেলিব্রিটি, ইউটিউবে যারা ভিডিও বানান,তাদের কোনো এথিক্স নেই? কথাটি কি তিনি অসত্য বলেছেন? ৫ আগষ্টের পরে আমরা কি অনেক সেলিব্রেটি ইউটিউবারের দায়িত্বহীন আচরন দেখিনি। তাদের অনেকেই আবার নিজেকে গণতন্ত্রের ধারকবাহক দাবি করেন,কিন্ত তাঁর বিরুদ্ধে যথাসামান্য গেলেই,তাঁকে শাখামৃগ গালিগালাজ করে ধুইয়ে দেন। অনেকের ভিডিও আবার ১৮ ± অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি আর যতসব স্ল্যাং। নূন্যতম টলারেন্সে নেই অনেকেরই। এথিকস,মোরালিটি,প্রিন্সিপ্যাল এগুলো খুব জরুরী। আমান ভাই, মির্জা ফখরুলকে আপনি যেভাবে গালিগালাজ করলেন সেটা কোনোভাবেই সমুচিত নয়। আপনার মনে রাখা উচিৎ ছিলো,তিনি বাংলাদেশের এই মুহুর্তে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি। সমালোচনা আমিও করি,এখনো করবো। কিন্তু আমরা কেন হাসিনা সিপি গ্যাংয়ের মতন আচরন করবো। তাহলে ওদের সাথে আমাদের পার্থক্যটা কি?
সরি আমান ভাই,আপনার ওই পোষ্টের জন্য নিন্দা জানাই।
সোশাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সারদের সস্পর্কে ঢালাও মন্তব্য দুর্ভাগ্যজনক। আপনি জানেন কি না জানিনা ফাহাম আবদুস সালামের হাসিনা রেজিমে রাখা এক একটা ভিডিও হাসিনারিরোধী আন্দোলনে তরুনদের কি পরিমান অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলো! তাই বলি, মেইনস্ট্রিম গণমাধ্যম এখন আপনার এবং আপনার দলের সাথে নিরপেক্ষ আচরন করছে বলে ভেবে নিয়েন না,সব সময় সেটা করবে। সুতরাং মেইনস্ট্রিম মিডিয়া নিয়ে আপনার এই মোহভঙ্গ হয়তো দ্রুতই ঘটবে।পারলে মিডিয়ায় এখনো যেসব হাসিনা অনুগত আছে, তাদের বের করার উদ্যোগ নিন। প্রফেশনাল মিডিয়া কর্মীদের হাতে মিডিয়া দেখভালের দায়িত্ব দিন। নইলে আখেরে পস্তাতে হবে বিএনপিকেই। মির্জা ফখরুল, আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার জন্য শুভকামনা।
। তিন।
মির্জা ফখরুল। অতীতে সিপিবি করেছেন বলে জানা নেই। তবে ছাত্রজীবনে ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা। যাইহোক, বিএনপির মত বৃহৎ একটা দলের মহাসচিব আপনি। মিডিয়া নিয়ে কথা বলার আগে আপনাকে আরো বেশী সতর্ক হবার দরকার ছিলো। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, মেইনস্ট্রিম মিডিয়া গত পনের বছরে হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার জন্য কিই না করেছে। পক্ষান্তরে বিএনপি, জিয়াউর রহমান,খালেদা জিয়া,তারেক রহমানকে নিয়ে কি নির্মম মিথ্যাচারটাই না করেছে? এত দ্রুত সব ভুলে গেলেন আপনি? আমার মনে পড়ে ঈদের পরে আন্দোলন? আপনার এই বক্তব্য নিয়ে কত হাস্য তামাশা করেছিলো মেইনস্ট্রিম মিডিয়া। আপনি সেই মেইনস্ট্রিম মিডিয়াকে এইভাবে সার্টিফিকেট নাও দিতে পারতেন। আপনি হয়তো জানেননা, বিএনপি যখন ভীষন অসম্ভবে, যখন মেইনস্ট্রিম মিডিয়া আপনিসহ আপনার দলের টপ টু বটমকে অগ্নিসন্ত্রাসী বলে ক্যারেক্টার এসোসিনেশনে লিপ্ত ,তখন এই সোশাল মিডিয়াই ছিলো বিএনপির ভরসা। এরাই তখন আপনার দলের প্রধান সিপাহসালাহ হয়ে মেইনস্ট্রিমের সব প্রোপাগন্ডার বিরুদ্ধে লড়েছে। আমাকে পার্সোনালী বিএনপির পক্ষে লেখালেখির জন্য কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে,সেটা আপনার হয়তো জানা নেই,বাট আপনার দলের শীর্ষ অনেক নেতাই জানেন। তাই বলছি, সোশাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সারদের সস্পর্কে ঢালাও মন্তব্য দুর্ভাগ্যজনক। আপনি জানেন কি না জানিনা ফাহাম আবদুস সালামের হাসিনা রেজিমে রাখা এক একটা ভিডিও হাসিনারিরোধী আন্দোলনে তরুনদের কি পরিমান অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলো! তাই বলি, মেইনস্ট্রিম গণমাধ্যম এখন আপনার এবং আপনার দলের সাথে নিরপেক্ষ আচরন করছে বলে ভেবে নিয়েন না,সব সময় সেটা করবে। সুতরাং মেইনস্ট্রিম মিডিয়া নিয়ে আপনার এই মোহভঙ্গ হয়তো দ্রুতই ঘটবে।পারলে মিডিয়ায় এখনো যেসব হাসিনা অনুগত আছে, তাদের বের করার উদ্যোগ নিন। প্রফেশনাল মিডিয়া কর্মীদের হাতে মিডিয়া দেখভালের দায়িত্ব দিন। নইলে আখেরে পস্তাতে হবে বিএনপিকেই। মির্জা ফখরুল, আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার জন্য শুভকামনা।
লেখক: যুগ্ম প্রধান বার্তা সস্পাদক, এনটিভি