বাংলাদেশকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান সরবরাহে আগ্রহী পাকিস্তান

■ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ■

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিমান বাহিনী দুই প্রধান সম্ভাব্য জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান ক্রয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। চীন ও পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই যুদ্ধবিমান পাকিস্তানের জন্য একটি বড় অস্ত্র রপ্তানি প্রকল্পের অংশ।

ইসলামাবাদ জানিয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো এবং অস্ত্র রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারণই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

পাশাপাশি, পাকিস্তান গত বছরের ভারতের সঙ্গে সংঘাতের সময়ে বিমান বাহিনীর সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করতে চায়।ওই সংঘাত পারমাণবিক সক্ষম দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র আঘাতের ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।

পাকিস্তানের এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধু ও বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল হাসান মাহমুদ খান এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান সংগ্রহের বিস্তারিত বিষয় আলোচনা করেছেন। পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, বাংলাদেশকে দ্রুত ‘সুপার মুশশাক’ প্রশিক্ষণ বিমান সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক এই আলোচনা দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের নতুন একটি ইতিবাচক সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত বছরের আগস্টে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে থাকা অবস্থায় ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের অবনতি হওয়ার পর পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই বৈঠক ঐতিহ্যবাহী বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী করেছে এবং প্রতিরক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার সংকল্পকে প্রতিফলিত করেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, শেখ হাসিনার ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরায় শুরু করছে।

একই সঙ্গে দুই দেশের সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক বৈঠকও হয়েছে।

বৈঠকে কার্যকর সহযোগিতা জোরদার ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মহাকাশ খাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান পাকিস্তান বিমানবাহিনীর কার্যকর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং যুদ্ধে তাদের সাফল্য রেকর্ডের প্রশংসা করেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকে পাকিস্তানের বিমান বাহিনী প্রধান বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে বেসিক অ্যাডভান্সড ফ্লাইং থেকে শুরু করে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশেষায়িত কোর্সসহ সমন্বিত প্রশিক্ষণ সহায়তা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।এই বৈঠকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান বিমান বাহিনীর পুরনো বিমানগুলো মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং আকাশ নজরদারির মান উন্নয়নের জন্য সমন্বিত এয়ার ডিফেন্স রাডার সিস্টেমের বিষয়ে সহযোগিতা পেতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

বিবৃতিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল পাকিস্তান বিমান বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো পরিদর্শন করে। এর মধ্যে আছে ন্যাশনাল আইএসআর ও ইন্টিগ্রেটেড এয়ার অপারেশন্স সেন্টার, পাকিস্তান এয়ার ফোর্স সাইবার কমান্ড এবং ন্যাশনাল অ্যারোস্পেস সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি পার্ক। এ সময় তাদের পাকিস্তান বিমান বাহিনীর মনুষ্যবিহীন কার্যক্রম, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, সাইবার, স্পেস ও আইএসআর বিষয়ে সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানিয়েছেন, দেশটির অর্থনীতিতে সামরিক উৎপাদনের সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের বিমান পরীক্ষিত এবং চাহিদা এত বেশি, সম্ভবত ছয় মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রার তহবিলের ওপর আমাদের নির্ভরতা কমে যাবে।

জেএফ-১৭ থান্ডার বর্তমানে আর্জেন্টিনা, আজারবাইজানসহ অন্যান্য দেশেও রপ্তানির অংশ, এবং লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গে ৪০০ কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তিতেও অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশ এই যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করলে, এটি দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক সক্ষমতার নতুন দিক খুলে দিতে পারে।

জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানের বৈশিষ্ট্য কি
জেএফ-১৭ বিমানটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি পাকিস্তানের ভেতরেই তৈরি। যুদ্ধবিমানটি শুধু আকাশে যুদ্ধ করার জন্য নয়, এটি ভূমিতে শত্রুর কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ এবং হামলাও চালাতে সক্ষম। বিমানটি আকাশ থেকে ভূমি এবং আকাশ থেকে আকাশে হামলাযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র বহন করতে পারে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, জেএফ-১৭ ওজনে হালকা এবং যেকোনো আবহাওয়ায় ভূমি ও আকাশে আক্রমণ চালাতে সক্ষম। ক্ষেপণাস্ত্রসমৃদ্ধ এই বিমান দূর থেকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতেও সক্ষম। এই যুদ্ধবিমানের অনেক বৈশিষ্ট্য রাফায়েল যুদ্ধবিমানের সঙ্গে তুলনীয়। এর রেঞ্জ প্রায় ১৫০ কিলোমিটার, এবং এতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে সঠিকভাবে আঘাত করতে পারে।

পশ্চিমা বিশ্বের তৈরি প্রচলিত যুদ্ধবিমানের পরিবর্তে পাকিস্তানের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ থেকে এই বিমান কেনার ক্ষেত্রে কিছু দেশের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। যদিও সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, পাকিস্তান কেন পশ্চিমা বিমানগুলোর চেয়ে বেশি সুবিধা দিতে পারছে, এবং এটি কি বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা বাজারে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কিনা।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, জেএফ-১৭ থান্ডার চীন ও পাকিস্তানের যৌথ প্রয়াস। দাম, রাজনৈতিক নমনীয়তা এবং সহজলভ্যতার কারণে এটি পশ্চিমা যুদ্ধবিমানের তুলনায় ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। সীমিত বাজেটের বিমান বাহিনী জন্য আধুনিকায়ন ও স্থানীয় রক্ষণাবেক্ষণেও এটি বাস্তবসম্মত এবং কার্যকর সমাধান হতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) সামরিক মহাকাশ বিশেষজ্ঞ ডগলাস ব্যারি বলেন, পশ্চিমা বিশ্বে তৈরি যুদ্ধবিমানের তুলনায় জেএফ-১৭ দামে অনেকটা আকর্ষণীয়। এতে কার্যকর রাডার এবং আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র সংযোজন করা হয়েছে। জেএফ-১৭ ও চেংদু জে-১০’র আগে চীনের যুদ্ধবিমানের নকশাকে পশ্চিমা বা রাশিয়ান যুদ্ধবিমানের তুলনায় দুর্বল মনে করা হতো, এখন সেই পার্থক্য অনেক কমে গেছে।

অন্যদিকে, পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা এবং আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো আলেক্স প্লাটসাস মনে করেন, পাকিস্তানের এই বিমান নির্বাচনের মূল কারণ রাজনৈতিক। যারা পশ্চিমাদের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে চায় না এবং দামের বিষয়েও সংযত।

পাকিস্তান কার কাছে জেএফ-১৭ বিক্রি করেছে?
জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান সম্পর্কিত পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। এর প্রথম পরীক্ষামূলক মডেল তৈরি করা হয় ২০০৩ সালে, আর ২০১০ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনী প্রথমবার জেএফ-১৭ তাদের বিমান বহরে অন্তর্ভুক্ত করে। এরপর রাশিয়ার মিকোয়ান কোম্পানিও এই প্রকল্পে যুক্ত হয়, যারা এমআইজি যুদ্ধবিমান তৈরি করে।

পুরনো মিরাজ, এফ-৭ ও এ-৫ যুদ্ধবিমানের জায়গায় নতুন বিমান আনার উদ্যোগের অংশ হিসেবে পাকিস্তান বিমান বাহিনী জেএফ-১৭ থান্ডার নকশা করে।

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর মুখপাত্র এয়ার কমোডর আহমার রাজা বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, জেএফ-১৭ ব্লক থ্রি হলো চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান। ব্লক থ্রি হলো জেএফ-১৭-এর পরবর্তী সংস্করণ, যেখানে নতুন রাডার সংযোজন করা হয়েছে। এই ভার্সনে আধুনিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হবে, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, এবং প্রতিটি দিক থেকে এটি আরও উন্নত।

পাকিস্তান এখন পর্যন্ত এই বিমান আজারবাইজান, মিয়ানমার ও নাইজেরিয়ার কাছে বিক্রি করেছে। গত বছর প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তান আজারবাইজানের কাছে ৪০টি জেএফ-১৭ বিক্রির চুক্তি স্বাক্ষর করে।

বিমান বাহিনীর মুখপাত্র নির্দিষ্ট সংখ্যা জানাননি, তবে ধারণা করা হচ্ছে ইরাক ও লিবিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে বিক্রয় নিয়ে সমঝোতা হয়েছে।

তবে ইরানসহ কিছু দেশও এই যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে।

অস্ত্র বিক্রি বাড়াচ্ছে পাকিস্তান

জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমানগুলো পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচির মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে। আজারবাইজানের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি চুক্তিতে এবং লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গে ৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তিতেও এসব যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

মঙ্গলবার পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, অস্ত্র খাতের সাফল্য দেশের অর্থনীতির চেহারা বদলে দিতে পারে।

পাকিস্তানি সম্প্রচারমাধ্যম জিও নিউজকে খাজা আসিফ বলেন, ‘আমাদের বিমান (যুদ্ধবিমান) পরীক্ষিত এবং আমরা এত অর্ডার (ফরমাশ) পাচ্ছি যে ছয় মাসের মধ্যে পাকিস্তানের আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে দরকার না–ও হতে পারে।’

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *