■ নাগরিক প্রতিবেদক ■
বিদায়ী ২০২৫ সালে এ যাবৎ কালের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আয় ৩২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে। এর আগের বছর ছিল ২৬ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এক বছরে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে ৫ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন বা ২২ দশমিক ১০ শতাংশ।
আর ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে প্রবাসীরা বেশি রেমিট্যান্স পাঠান ৪ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার।
বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরেও রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল অনেক বেশি। এ মাসে প্রবাসীরা ৩২৩ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন। একক মাসে আসা এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স। ২০২৫ সালের মার্চে সর্বোচ্চ ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল।
২০২৫ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স আসে ২১৮ কোটি ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ২৫৩ কোটি ডলার, মার্চে ৩৩০ কোটি, এপ্রিলে ২৭৫ কোটি, মে ২৯৭ কোটি, জুন মাসে ২৮২ কোটি, জুলাইয়ে দেশে এসেছে ২৪৮ কোটি ডলার, আগস্টে ২৪২ কোটি, সেপ্টেম্বরে ২৬৮ কোটি, অক্টোবরে ২৫৬ কোটি, নভেম্বরে ২৮৯ কোটি এবং সবশেষ ডিসেম্বর মাসে এসেছে ৩২৩ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈধ পথে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৬৮৯ কোটি ডলার, ২০২৩ সালে এসেছিল ২ হাজার ১৯২ কোটি ডলার, ২০২২ সালে আসে ২ হাজার ১২৯ কোটি, ২০২১ সালে ছিল ২ হাজার ২০৭ কোটি ডলার। ২০২০ সালে রেমিট্যান্স আসে ২ হাজার ১৭৪ কোটি মার্কিন ডলার। ২০১৯ সালে আসে এক হাজার ৮৩৩ কোটি ডলার। এর আগে ২০১৮ সালে রেমিট্যান্স এসেছিল এক হাজার ৫৫৫ কোটি ডলার। ২০১৭ সালে এসেছিল এক হাজার ৩৫৩ কোটি ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।
এর আগের বছর ২০১৬ সালে ছিল এক হাজার ৩৬১ কোটি ডলার। ২০১৫ সালে এসেছে এক হাজার ৫৩১ কোটি ডলার। আর ২০১৪ সালে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৪৯২ কোটি ডলার।
এছাড়াও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) এসেছে এক হাজার ৬২৬ কোটি ডলার রেমিট্যান্স। এর আগে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের (জুলাই-জুন) রেমিট্যান্স এসেছিল তিন হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। তার আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দুই হাজার ৩৯২ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রারর রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। দেশীয় মুদ্রার যার পরিমাণ দুই লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। রেমিট্যান্স অংক এ যাবৎকালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আহরণ।
এছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ১৬১ কোটি ৭ লাখ মার্কিন ডলার। তার আগের ২০২১-২০২২ অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্স এসেছিল ২ হাজার ১০৩ কোটি ১৭ লাখ মার্কিন ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরের পুরো সময়ে রেমিট্যান্সের উল্লম্ফন ছিল। ওই অর্থবছরে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২ হাজার ৪৭৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসীরা। এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এক হাজার ৮২০ কোটি ডলার বা ১৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।
মূলত হুন্ডি বন্ধ হওয়ায় বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকও বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠাতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। উৎসবকেন্দ্রিক আয় বৃদ্ধি ও অবৈধ পথে পাঠাতে নিরুৎসাহিত করায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নানামুখী তৎপরতায় অর্থ পাচার বন্ধ হওয়ায় এখন রেমিট্যান্স অব্যাহতভাবে বাড়ছে। সেই সঙ্গে ডলারের আনুষ্ঠানিক দরও অনেকটা বাড়ানো হয়েছে। এখন খোলাবাজারের সঙ্গে ব্যাংকের ডলার দরে খুব বেশি পার্থক্য নেই। ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠালে আড়াই শতাংশ হারে প্রণোদনা পান প্রবাসীর সুবিধাভোগীরা। সব মিলিয়ে বৈধভাবে বা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে সর্বোচ্চ দর পাচ্ছেন গ্রাহক। বর্তমানে বাজারভিত্তিক করার পরও ডলারের দর স্থিতিশীল রয়েছে।
আইএমএফের পরামর্শে গতবছরের ৮ মে ডলার দরে ‘ক্রলিং পেগ’ চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সময় এক লাফে প্রতি ডলারে ৭ টাকা বাড়িয়ে মধ্যবর্তী দর ঠিক করা হয় ১১৭ টাকা। এরপর ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স দ্রুত বাড়ছিল। তবে জুলাই আন্দোলন শুরুর পর রেমিট্যান্স শাটডাউনের ডাক, ব্যাংক বন্ধসহ বিভিন্ন কারণে প্রবাসী আয়ে ছন্দপতন হয়। জুলাই মাসে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে তা ছিল ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিন্ম। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কড়াকড়িসহ বিভিন্ন কারণে রেমিট্যান্স বাড়ছে।
দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড রেমিট্যান্স এসেছিল ২০২০-২১ অর্থবছরে দুই হাজার ৪৭৭ কোটি ডলার।
গণঅভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরও রেমিটেন্স প্রবাহে ধীরগতি ছিল। ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যাত্রা শুরু হয় অন্তর্বর্তী সরকারের; রেমিট্যান্স প্রবাহেও গতি ফেরে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার পতনের পর থেকে রেমিট্যান্সসহ বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হুন্ডি চাহিদা কমেছে। বাণিজ্যের আড়ালে কিম্বা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ যারা দেশের বাইরে পাঠাতো তাদের বেশিরভাগই এখন দৌড়ের ওপরে আছে। ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন আমদানিতে কম মূল্য দেখিয়ে এলসি খোলার প্রবণতা কমেছে। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে অর্থ পাচারে কড়াকড়ি করছে সরকার। আবার ঋণ জালিয়াতি, রাজস্ব ফাঁকি, অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অনিয়মে অভিযুক্ত ১০টি গ্রুপের অনিয়ম তদন্তে যৌথ টিম কাজ করছে। নতুন করে পাচারের সুযোগ তো দূরে থাক, উল্টো আগে পাচার করা অর্থ দেশে আনার চেষ্টা চলছে। এসব কারণে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বাড়ছে।
