■ নাগরিক প্রতিবেদক ■
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা গত মার্চে দেশে পাঠিয়েছেন ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা পৌনে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স। এটি স্বাধীনতার পর দেশের ইতিহাসে একক কোনো মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ।
বুধবার (১ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, মার্চের পুরো সময়ে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ ছিল ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৫ হাজার ডলার, যা আগের মাস ফেব্রুয়ারির চেয়ে প্রায় ৭৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার বেশি। আর গত বছরের একই সময়ের চেয়ে (মার্চ ২০২৫) ৪৬ কোটি ডলার বেশি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রেমিট্যান্স আসে ৩০২ কোটি ডলার, আর গত বছরের মার্চে এসেছিল ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে একক কোনো মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের (২০২৫ সালের) মার্চে। ওই মাসটিতে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার (৩.২৯ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে। ওই মাসে রেমিট্যান্স আসে ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ডলার (প্রায় ৩.২৩ বিলিয়ন)। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে গত জানুয়ারিতে, যার পরিমাণ ছিল ৩১৭ কোটি বা ৩.১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
২০২২ সালের পর থেকে ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় ও অর্থনৈতিক চাপে রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেতে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ন্যূনতম তিন মাসের আমদানি ব্যয় সমপরিমাণ রিজার্ভ থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশ বর্তমানে সেই সীমার কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির জন্য সতর্ক সংকেত হলেও সাম্প্রতিক উত্থান স্বস্তিদায়ক।
বৈশ্বিক মন্দা মোকাবিলার জন্য সহায়ক হিসেবে ২০২২ সালে আইএমএফের কাছে ঋণ সহায়তা চায় বাংলাদেশ। ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি আইএমএফ কঠিন শর্ত আরোপ করে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনেই ঋণের প্রথম কিস্তি ছাড় করে দাতা সংস্থা আইএমএফ।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ১৪ বিলিয়নের ডলারের নিচে নামে। সে সময় বৈদেশিক ঋণ ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কেনার মাধ্যমে রিজার্ভ বাড়ানো হয়। আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন গভর্নর এসে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি বন্ধ রেখেছে। আবার বিভিন্ন উৎস থেকে ডলার যোগানের চেষ্টা করছে। তবে আগের দায় পরিশোধ করতে গিয়ে রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারে কাছে ওঠানামা করছে।
উল্লেখ্য, ১৯৮১-৮২ অর্থবছর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ১২ কোটি ১০ লাখ ডলার।
পাঁচ বছর পর ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছর শেষে সেই রিজার্ভ বেড়ে হয় ৭১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ১৯৯১-৯২ অর্থবছর শেষে রিজার্ভ ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) ডলার অতিক্রম করে ১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। পরের ১৯৯২-৯৩ অর্থবছর শেষে রিজার্ভ ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে ২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
৩ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছর শেষে। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছর শেষে তা কমে ২ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে তা আরও কমে ১ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
এরপর ১৯৯৭-৯৮ থেকে ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছর পর্যন্ত রিজার্ভ দেড় থেকে দুই বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে।
২০০০-০১ অর্থবছরে রিজার্ভ কমে ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে। ওই অর্থবছর শেষে রিজার্ভ ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার থাকলেও অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে তা ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল। তখনই আকুর বিল পুরোটা পরিশোধ না করে অর্ধেক করা হয়েছিল।
২০০১-০২ অর্থবছর শেষে রিজার্ভ বেড়ে হয় ১ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার।
২০০৫-০৬ অর্থবছর শেষে রিজার্ভ ৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা ১৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে।
২০১৪ সালের ১০ এপ্রিল রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। পরের বছর ২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি রিজার্ভ ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। ২০১৬ সালের জুনে রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে।
দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর ২০২০ সালের মার্চ শেষে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। মহামারির এই সময়েই রিজার্ভ বেড়েছে সাড়ে ১২ বিলিয়ন ডলার।
২০২০ সালের ৩ জুন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। তিন সপ্তাহের ব্যবধানে ২৪ জুন সেই রিজার্ভ আরও বেড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলার হয়।
২০২০ সালের ৩০ জুন রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। এক মাস পর ২৮ জুলাই রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরও অতিক্রম করে। তিন সপ্তাহ পর গত ১৭ আগস্ট রিজার্ভ ৩৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়।
২০২০ সালের মাত্র দেড় মাসে ৩৪ বিলিয়ন ডলার থেকে রিজার্ভ ৪ বিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩৮ বিলিয়ন ডলারে ওঠে।
২০২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর রিজার্ভ ছাড়ায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার। ৮ অক্টোবর ছাড়ায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। ২৯ অক্টোবর অতিক্রম করে ৪১ বিলিয়ন ডলার। ৪২ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায় ১৫ ডিসেম্বর।
২০২০ সালের ৩০ ডিসেম্বর ৪৩ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে রিজার্ভ।
২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়।
২০২১ সালের ২৮ এপ্রিল অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। একই বছরের ৪ মে আকুর ১ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, রপ্তানি আয় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক থাকায় রিজার্ভে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।
