টাইম ম্যাগাজিনে তারেক রহমানকে নিয়ে ‘বুলিং সাংবাদিকতা’

■ নাদিম মাহমুদ ■

বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানকে নিয়ে ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে ‘Bangladesh’s Prodigal Son’ শিরোনামে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রতিবেদনটি প্রকাশের পরও আমার পরিচিত বিএনপির বন্ধুরা লেখাটি শেয়ার দিতে কিছুটা ইতঃস্ততবোধ করছে। যদিও প্রতিবেদনটি বিএনপির ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, তবে এই প্রতিবেদনটিতে এমন কিছু শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে তা কিছুটা হিতে বিপরীত হয়েছে

একটি সুন্দর গোছানো প্রতিবেদন কীভাবে সংবাদটির আবেদনময় হারিয়ে ফেলে, টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে থাকবে।

মূলত সাক্ষাতকারের উপর ভিত্তি করে করা এই প্রতিবেদনটিতে ‘তারেক রহমানের’ অতীত ও বর্তমান বিষয়গুলো আলোকপাত করতে গিয়ে প্রতিবেদক একটি বেশ কিছু শব্দ প্রয়োগ করেছে, তা মৌলিক সাংবাদিকতার নীতিকে কতটা ব্যাকরিত হয়েছে, তা নিয়ে অবশ্যই বিস্তর আলোচনা করা যেতে পারে।

তারেক রহমান ও বিএনপির অতীত দেশ শাসন নিয়ে যেসব অভিযোগ রয়েছে, তা খণ্ডন করার কোন সুযোগ নেই। এইসব নিয়ে প্রতিবেদন বন্ধ করারও সুযোগ নেই। তবে এই প্রতিবেদক যেসব বাক্য প্রয়োগ এনেছে, তা প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠতে পারে, তেমনি অপ্রয়োজনীয় এই আলাপ পুরো প্রতিবেদনটিকে ধসে দিয়েছে।

‘খাম্বা তারেক’ একটি বিদ্রুপাত্মক শব্দ। বিশেষণ দিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে, সাংবাদিকতায় বুলিং চর্চাকে উৎসাহিত করা হয়েছে, যা নিষ্প্রোজনীয় ছিল বটে। দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে বিএনপি সরকারের শাসিত বাংলাদেশ কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এইসব হওয়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি ছিল ‘বিদ্যুৎ’ খাত। এখানে ব্যক্তি তারেককে তার প্রতিপক্ষ রাজনীতির সমর্থক ও গোষ্ঠীরা ‘খাম্বা’ তারেক বললেও এটি সংবাদ পরিবেশনে প্রশ্নবিদ্ধ। ধরুন, একজনের নাম মকলেস, সে অনেক লম্বা, কিংবা মোটা, আপনি তখন তার নামের আগে লম্বু মকলেস নামে ডাকলেন কিংবা মটু মকলেস নামে ডাকলেন, সেটি হয়ে যায় বুলিং, সেটি হয়ে যায় বডি শেমিং। এখন কেউ যদি পত্রিকায় তার নাম মকলেস না লিখে বলে লম্বু মকলেস, তাহলে সেটি অপ্রচলিত এবং সংবাদ পাঠে অযোগ্য শব্দ। তবে হ্যাঁ, আমরা অভিযোগ প্রমাণিত হলে লিখতে ও বলতে পারি, ধর্ষক, বলতে পারি, খুনি, বলতে পারি দুর্নীতিবাজ। আর এটাই হলো সাংবাদিকতা।

শিরোনামের শব্দটি থেকে শুরু করে প্রতিবেদনের বিভিন্ন জায়গা নিয়ে কথা বলা যেতেই পারে। যেমন প্রতিবেদনটির একটি জায়গায় বলা হচ্ছে, He was born in Dhaka, where he attended an air force school before enrolling in the University of Dhaka in the mid-1980s. However, he failed to complete his international-relations degree, quitting during his second year.

প্রশ্ন হচ্ছে, একজন ব্যক্তি কতটুকু পড়াশুনা করবে, কতটুকু করবে না, ফলাফল ভালো নাকি মন্দ এইসব দেখে কখনোই সেই মানুষটিকে মূল্যায়ন করার সুযোগ নেই। পৃথিবীর বহু মানুষ আছে, যারা একদিন স্কুলেও যায়নি। বিদ্যালয়ের গণ্ডি না পেরিয়ে নিজেদের কর্মক্ষেত্রে আলোকিত করেছে। তারেক রহমান পড়াশুনায় ড্রপ আউট হয়েছে সেটা কখনোই তার রাজনীতিতে প্রভাব ফেলেনি, সে যদি অক্সফোর্ড থেকে পাস করে আসত, সেটিও তেমন প্রভাব ফেলত?

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ‘পড়াশুনা’ একজন ব্যক্তির বড় পরিচয় নয়। আমি জীবনে অনেক মানুষ দেখিছি, যারা পিএইচডি করে এসেও মনে করে চাঁদে মানুষের ছবি দেখা যায়, এডিটেড কিংবা এআই ছবি দেখে অনেকেই মনে করে গরুর পেটে ছাগলের বাচ্চা জন্ম নেয়। আবার এমনও মানুষ দেখেছি, যে একটি অক্ষরও জানে না, সে নিজের জীবনের মূল্যবোধ ও বোধশক্তি দিয়ে আমাদের কথিত শিক্ষিত মানুষটির বিবেকে পরাজিত করে দেয়।

এই দেশের রাজনীতিতে শিক্ষা তো আরো প্রভাব ফেলে না। যদি প্রভাব ফেলত তাহলে এই দেশের মন্ত্রী, এমপিদের মধ্যে থেকে আমরা ৫ জন ডক্টরেট পেতাম, কয়েকজন অক্সফোর্ড, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ফেরত ছেলে-মেয়েকে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে দেখতাম। এই দেশে পড়াশুনার যোগ্যতার চেয়ে দেখা হয়, তার কত টাকা আছে, কতটা রাজনৈতিক প্রভাব, বলয় আছে। সেটা না হলে, প্রতি সংসদে ৩০০ আসনের মধ্যে আড়াই শতাধিক ব্যবসায়ীরা সাংসদ হতে পারতেন না। তাছাড়া এইবারের অন্তবর্তীকালিন সরকারের চেহারাটা দেখেন, দেখবেন সবাই উচ্চশিক্ষিত, সবারই একাডেমিক ফলাফল ভাল, কিন্তু তারা কেমন সরকার পরিচালনা করছে, তা তো জাতি জানল।

এটা এই জাতির নিয়তি। তবে হ্যাঁ তারেক রহমান পড়াশুনার সুযোগ থাকার পরও কেন করতে পারেনি, তা কেবল তিনি ভাল বলতে পারবেন। নিঃসন্দহে পড়াশুনা জানা মানুষ আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

এই প্রতিবেদনটির আর একটি বড় সমস্যা ছিল, তারা তারেক রহমানের দুর্নীতির ব্যাকগ্রাউন্ড জানাতে গিয়ে বলছে, To many Bangladeshis, Rahman is still snidely known as Khamba Tarique, referring to an alleged corruption scandal whereby thousands of electricity poles, or khamba, were reportedly bought from an associate at inflated prices but never connected to the grid.

‘খাম্বা তারেক’ একটি বিদ্রুপাত্মক শব্দ। বিশেষণ দিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে, সাংবাদিকতায় বুলিং চর্চাকে উৎসাহিত করা হয়েছে, যা নিষ্প্রোজনীয় ছিল বটে। দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে বিএনপি সরকারের শাসিত বাংলাদেশ কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এইসব হওয়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি ছিল ‘বিদ্যুৎ’ খাত। এখানে ব্যক্তি তারেককে তার প্রতিপক্ষ রাজনীতির সমর্থক ও গোষ্ঠীরা ‘খাম্বা’ তারেক বললেও এটি সংবাদ পরিবেশনে প্রশ্নবিদ্ধ। ধরুন, একজনের নাম মকলেস, সে অনেক লম্বা, কিংবা মোটা, আপনি তখন তার নামের আগে লম্বু মকলেস নামে ডাকলেন কিংবা মটু মকলেস নামে ডাকলেন, সেটি হয়ে যায় বুলিং, সেটি হয়ে যায় বডি শেমিং। এখন কেউ যদি পত্রিকায় তার নাম মকলেস না লিখে বলে লম্বু মকলেস, তাহলে সেটি অপ্রচলিত এবং সংবাদ পাঠে অযোগ্য শব্দ। তবে হ্যাঁ, আমরা অভিযোগ প্রমাণিত হলে লিখতে ও বলতে পারি, ধর্ষক, বলতে পারি, খুনি, বলতে পারি দুর্নীতিবাজ। আর এটাই হলো সাংবাদিকতা।

হ্যাঁ আমি ‘তারেক রহমানকে’ এখানে নিষ্প্রাপ বা সাধু বানাচ্ছি না। তার দল ও দলের দুর্নীতির খবর সেই সময়ের পত্র-পত্রিকা এসেছে ও ভোটারদের মনে দগদগে হয়ে আছে। আমি এই আলোচনায় শুধু এইটুকু বলতে চাচ্ছি, আমাদের সাংবাদিকতা অবশ্যই হতে হবে ‘বুলিং, বডি শেমিং, মুক্ত। আপনি সেইটাকে অ্যাপ্লিফাইড করতে গেলে, সেটি কখনোই সাংবাদিকতার মধ্যে সামীবদ্ধ থাকে না। টাইম ম্যাগাজিনের এই প্রতিবেদন অবশ্যই একাডেমিক টপিকে রাখার মত।

লেখক: গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *