■ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ■
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিরোধিতার অভিযোগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) এক শিক্ষককে ধাওয়া করে প্রক্টর অফিসে সোপর্দ করেছেন চাকসু প্রতিনিধিরা। তারা সবাই শিবির সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল থেকে নির্বাচিত। হেনস্তার শিকার ওই শিক্ষকের নাম হাসান মোহাম্মদ রোমান। তিনি সাবেক সহকারী প্রক্টর ও আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ১ মিনিট ৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, শিক্ষক হাসান মোহাম্মদকে কয়েকজন ছাত্র টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এ রমধ্যে একজনকে পেছন থেকে তাঁকে চেপে ধরতে দেখা যায়। সেখানে চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান, পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি ও নির্বাহী সদস্য সোহানুর রহমানকে দেখা গেছে। এ সময় শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ চিৎকার করছিলেন। ওই অবস্থায় তাঁকে একটি অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রক্টর অফিসে অবরুদ্ধ অবস্থায় ঘটনার বিবরণ দিয়ে হাসান মোহাম্মদ বলেন, পরীক্ষার কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করার সময় শিক্ষক ও কর্মচারীরা তাঁকে জানান যে ‘পরিস্থিতি ভালো নয়’। এরপর তিনি কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসেন। তখন চাকসু নেতারা চিৎকার-চেঁচামেচি করলে তিনি ভয়ে দৌড় দেন। এর পরও তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি এবং তাঁর বিরুদ্ধে মব তৈরি করা হয়েছে।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানায়, শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা চলাকালে এই ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমান আইন অনুষদের গ্যালারিতে পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। চাকসু প্রতিনিধিরা বিষয়টি জানতে পেরে আইন অনুষদের ডিন অফিসে গিয়ে তার দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এসময় পরিস্থিতি বেগতিক দেখে হাসান মোহাম্মদ রোমান পালানোর চেষ্টা করলে চাকসু নেতারা ধাওয়া দিয়ে তাকে আটক করেন। পরে তাকে রিকশায় করে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়।
চাকসুর আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি বলেন, ‘বিগত আওয়ামী শাসনামলে এই শিক্ষক সহকারী প্রক্টর থাকাকালীন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দিতেন। তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নিজ বাসায় ডেকে নেশা করানো এবং শাহ আমানত হলকে ছাত্রলীগের আস্তানা বানানোর প্রমাণ আমাদের কাছে আছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি সরাসরি গণহত্যার পক্ষে ছিলেন। এমন একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি কীভাবে পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পান, তা জানতে আমরা ডিনের কাছে গিয়েছিলাম।’
দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা খবর পেয়ে সেখানে গেলে তিনি গ্যালারির পেছন দিয়ে দৌড়ানোর সময় ব্যথা পান। তাকে কোনো প্রকার আঘাত করা হয়নি।’
সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমান তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আমি একদিনও বের হইনি। সহকারী প্রক্টর হিসেবে কাউকে মামলা দেইনি। পরীক্ষার হলে থাকা অবস্থায় স্টাফরা আমাকে জানায় যে বাইরে থেকে লোকজন আসছে। আমি বের হওয়ার সময় তারা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলে ভয়ে দৌড় দেই এবং পড়ে যাই। আমার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে মব সৃষ্টি করা হয়েছে।’
আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. জাফর উল্লাহ জানান, চাকসু নেতারা তার কাছে এসে ওই শিক্ষকের ডিউটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে শিক্ষকদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি তার একতিয়ারে নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘উক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে তার বেতন বন্ধ রয়েছে। এই অবস্থায় তিনি কীভাবে পরীক্ষার দায়িত্ব পেলেন, তা বোধগম্য নয়।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা প্রক্টর অফিসে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। বর্তমানে ওই শিক্ষকের ফোন ও তার বিরুদ্ধে ওঠা সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।’
পরীক্ষার দায়িত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার সমন্বয়কারী মো. ইকবাল শাহীন খান বলেন, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা তদন্ত চলাকালীন তিনি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। যতক্ষণ পর্যন্ত সিন্ডিকেট থেকে শিক্ষককে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি আমাদের কাছে শিক্ষক। এ কারণে তাঁকে পরীক্ষা কেন্দ্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
জানতে চাইলে প্রক্টর অধ্যাপক হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সব পরীক্ষায় তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। হট্টগোলের খবর শুনে আমরা তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে গিয়েছি। আমরা এই মুহূর্তে তাঁর (হাসান মোহাম্মদ) মুঠোফোনে তল্লাশি করছি। এ ছাড়া সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখছি। গণমাধ্যমে এ বিষয়ে বিস্তারিত পরে জানানো হবে।’
