■ নাগরিক প্রতিবেদক ■
ঢাকার সাত সরকারি কলেজকে একীভূত করে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রণীত অধ্যাদেশ উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদিত হয়েছে। শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল আবরার নিজেই টেলিফোনে শিক্ষার্থীদের এই সুখবর জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) দুপুর দুইটার দিকে ঢাকা কলেজের সামনে অবস্থানরত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কাছে এই খবর পৌঁছালে সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুর দুইটার দিকে ঢাকা কলেজের সামনে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের কাছে এই সুখবরটি পৌঁছায়। খোদ শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল আবরার (সি আর আবরার) টেলিফোনে শিক্ষার্থীদের অধ্যাদেশ অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। উপদেষ্টার কাছ থেকে ইতিবাচক বার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অপেক্ষমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কেটে যাওয়ায় অনেকেই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং মুহুর্মুহু স্লোগানে পুরো এলাকা মুখরিত করে তোলেন। শিক্ষার্থীরা ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি স্লোগান দিয়ে রাজপথ প্রকম্পিত করেন।
আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও ঢাকা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, শিক্ষা উপদেষ্টা তাকে নিজে ফোন করে নিশ্চিত করেছেন যে উপদেষ্টা পরিষদে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশ অনুমোদন পেয়েছে। তিনি বলেন, তাদের দীর্ঘ দেড় বছরের নিরলস আন্দোলন ও সংগ্রামের ফসল হিসেবে আজ এই স্বীকৃতি মিলেছে। উল্লেখ্য, ঢাকার সাতটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্বতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করে আসছিলেন। সরকারের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সাত কলেজের সংকট নিরসন এবং উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবেন একজন উপাচার্য, দুজন উপ-উপাচার্য (একাডেমিক ও প্রশাসনিক), একজন ট্রেজারার এবং একজন প্রক্টর। সাত কলেজের প্রতিটিতে একজন পুরুষ ও একজন নারী করে মোট ১৪ জন ডেপুটি প্রক্টর দায়িত্ব পালন করবেন। শিক্ষা হবে ইন্টারডিসিপ্লিনারি (একাধিক শাখার মধ্যে সমন্বয়) ও হাইব্রিড (অনলাইন ও অফলাইন দুটি পদ্ধতিকে এক করে সমন্বয়) ধাঁচের। যেখানে ৪০ শতাংশ ক্লাস অনলাইন এবং বাকি ৬০ শতাংশ হবে অফলাইনে। তবে সব পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে সশরীরে। শিক্ষার্থীরা প্রথম চার সেমিস্টারে নন-মেজর কোর্স এবং পরবর্তী চার সেমিস্টারে পড়বেন মেজর কোর্স।
পঞ্চম সেমিস্টারে শর্তসাপেক্ষে ডিসিপ্লিন পরিবর্তনের সুযোগ থাকলেও কলেজ পরিবর্তন করা যাবে না। বর্তমানে বিভিন্ন বর্ষে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা আগের নিয়মেই তাদের শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করবেন। তবে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ এবং এর পর ভর্তি হওয়া সব শিক্ষার্থী নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদ (সার্টিফিকেট) পাবেন।
২০১৭ সালে কোনো আইনি ও প্রশাসনিক পদ্ধতি অনুসরণ না করেই রাজধানীর সরকারি সাতটি বড় কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। এরপর থেকেই সেশনজট, পরীক্ষার ফল প্রকাশে বিলম্ব, শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকট, সার্টিফিকেট পেতে বিড়ম্বনাসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে অধিভুক্তি বাতিল করে স্বতন্ত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে দফায় দফায় আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। অসংখ্যবার সড়ক অবরোধ করে সংঘর্ষে জড়ায় পুলিশের সঙ্গে। এরপর সাত কলেজের সমস্যা চিহ্নিত করতে একটি পর্যালোচনা কমিটি করে দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই কমিটির সুপারিশের পর আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের জন্য ইউজিসির নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের আরেকটি কমিটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে সাত কলেজের ঢাবির অধিভুক্তি বাতিল এবং স্বতন্ত্র ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয় করার সুপারিশ করে গত ডিসেম্বর মাসে। ওই সুপারিশ জমার পর নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও কাঠামোগত দিক চূড়ান্তে একাধিক বৈঠক করে এ-সংক্রান্ত কমিটি। আজ সোমবার শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার একটি সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাবেন।
শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয়টিকে চারটি প্রধান স্কুল বা অনুষদে ভাগ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে স্কুল অব সায়েন্স পরিচালিত হবে ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ এবং বেগম বদরুন্নেসা কলেজ থেকে। স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ সরকারি বাঙলা কলেজ এবং সরকারি তিতুমীর কলেজে পরিচালিত হবে স্কুল অব বিজনেস স্টাডিজ। স্কুল অব ল অ্যান্ড জাস্টিস কবি নজরুল সরকারি কলেজ এবং সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে পরিচালিত হবে। স্নাতক পর্যায়ে মোট ২৩টি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানো হবে। যেখানে প্রতিটি ডিসিপ্লিনে সর্বোচ্চ ৪০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারবেন। মিরপুরের সরকারি বাঙলা কলেজে প্রায় ২৫ একর জমি অব্যবহৃত রয়েছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস, প্রশাসনিক ভবন, লাইব্রেরি, মেডিকেল সেন্টার এবং ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) স্থাপন করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম পরিচালিত হবে একাডেমিক কাউন্সিল, সিনেট ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। কলেজগুলো শুধু স্নাতক (অনার্স) পর্যায়ের শিক্ষা প্রদান করবে। বিশ্ববিদ্যালয় হলেও সাত কলেজের পাঁচটিতে আগের মতোই একাদশ পর্যায় চালু হবে। বাকি দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইডেন এবং কবি নজরুল কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় চালু করতে হবে। স্নাতক ও উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা টাইম, স্পেস ও রিসোর্স শেয়ারিং পদ্ধতিতে একই ক্যাম্পাস ব্যবহার করতে পারবেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জনবল ও বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ দেওয়া হবে। কলেজগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়োগকৃতদের বণ্টন করতে পারবে। বাজেট গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনা হবে কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে। প্রতিটি কলেজে ওয়ানস্টপ সার্ভিস পয়েন্ট থাকবে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা যে কোনো প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবেন। প্রতিটি কলেজে থাকবে আধুনিক মানসম্পন্ন লাইব্রেরি, ক্যাফেটেরিয়া ও মেডিকেল সেন্টার। এ ছাড়াও প্রতিটি কলেজেই পরিবহন ব্যবস্থা থাকবে।
যেসব বিষয়ে করা যাবে স্নাতক:
ঢাকা কলেজে পড়ানো হবে গণিত, পরিসংখ্যান, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, ডাটা সায়েন্স, বায়োকেমিস্ট্রি, বায়োটেকনোলজি ও রসায়নসহ ৭টি বিষয়।
ইডেন কলেজে থাকবে পদার্থবিজ্ঞান, অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি, ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি, ফরেস্ট্রি সায়েন্সসহ ৫টি বিষয়।
বদরুন্নেসা কলেজে ২টি বিষয়—আরবান অ্যান্ড রুরাল প্ল্যানিং এবং এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়ার সুযোগ থাকছে।
সরকারি তিতুমীর কলেজে পড়ার সুযোগ থাকছে অ্যাকাউন্টিং, ফিন্যান্স, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট, হোটেল অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস এবং ব্যাংক অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স ম্যানেজমেন্টসহ ৬টি বিষয়ে।
সরকারি বাঙলা কলেজে জার্নালিজম অ্যান্ড কমিউনিকেশন স্টাডিজ, ফটো অ্যান্ড ভিডিওগ্রাফি, অ্যাপ্লাইড সোশিওলজি, পলিটিক্যাল ইকোনমি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, অর্থনীতি এবং ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্স অ্যান্ড ডিপ্লোমেটিক স্টাডিজসহ ৬টি বিষয় পড়ানো হবে।
কবি নজরুল কলেজ এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ যৌথভাবে ‘ল অ্যান্ড জাস্টিস’-এর একটি বিভাগে পাঠদান চলবে।
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাতটি কলেজ—ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ এবং সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ ও সাত কলেজের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসক অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস বলেন, ‘যেহেতু শিক্ষা উপদেষ্টা কথা বলবেন (আজকের ব্রিফিং) তাই আমি বিস্তারিত কিছু বলতে চাই না। তবে আমাদের প্রস্তাব ছিল যাই করা হোক না কেন, কলেজগুলোর যেন স্বতন্ত্রতা বজায় থাকে। যেমন ঢাকা কলেজ ছেলেদের ও ইডেন-বদরুন্নেসা মেয়েদের। এসব যেন মিক্সড (মিশ্র) না হয়।’
