■ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ■
যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন সম্পর্কিত নতুন ৩০ লাখের বেশি নথি প্রকাশ হয়েছে। এবার সেই নথিতে দাবি করা হয়েছে, মুসলিমদের পবিত্র স্থান কাবা শরিফের গিলাফ (কিসওয়া) অর্থাৎ পবিত্র কালো কাপড়ের কিছু অংশ সৌদি আরব থেকে জেফরি এপস্টেইন কাছে পাঠানো হয়েছিল।
নথি অনুযায়ী, আজিজা আল-আহমাদি নামে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক এক সৌদি নারী ২০১৭ সালে একটি ইমেইল পাঠান, যেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে ‘ওই কাপড়টি তাওয়াফের সময় প্রায় এক কোটি মুসলমান স্পর্শ করেছেন এবং এতে তাদের দোয়া, অশ্রু ও আশা জড়িয়ে আছে’।
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবদুল্লাহ আল-মারি নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে কাবা শরিফের গিলাফের তিন টুকরা এপস্টেইনের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন আমিরাতের ব্যবসায়ী আজিজা আল-আহমাদি।
ই-মেইলে দেখা যায়, কাপড়ের অংশগুলো সৌদি আরব থেকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের কার্গো বিমানে করে ফ্লোরিডায় পাঠানো হয়। চালানটি যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে ইনভয়েস, কাস্টমস ব্যবস্থা এবং দেশের ভেতরে সরবরাহ—সবকিছুর সমন্বয় করা হয়েছিল।
অন্যদিকে আজিজা আল-আহমাদির ই-মেইলে তিনটি আলাদা টুকরার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে— একটি কাবার ভেতরের অংশ থেকে, একটি ব্যবহৃত বাইরের আবরণ থেকে এবং তৃতীয়টি একই উপকরণে তৈরি হলেও ব্যবহার করা হয়নি। ব্যবহার না হওয়া টুকরাটিকে ‘শিল্পকর্ম’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করার উপায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আজিজার সঙ্গে এপস্টেইনের অনেকগুলো ইমেইল আদান-প্রদান হয়েছে। তাদের যোগাযোগ শুরু হয়েছিল আরও আগে, যখন এপস্টেইন সৌদি আরবের রয়্যাল কোর্টের এক সদস্য রাফাত আল-সাবাঘকে বিটকয়েনের আদলে ‘শরিয়া’ নামের একটা ডিজিটাল কয়েন চালুর প্রস্তাব দেয়। এই রাফাত ছিলেন একইসঙ্গে আরব আমিরাত প্রবাসী সৌদি ব্যবসায়ী আজিজা আল আহমাদির কোম্পানির টিমের সদস্য।
আজিজার এই শরিয়া কয়েনের প্রস্তাবটা পছন্দ হয় এবং সে এপস্টেনে সঙ্গে যোগাযোগ করে। এ বিষয়ে এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য ব্যাপারে তাদের মধ্যে অনেক আলোচনা হয়। একপর্যায়ে ২০১৭ সালের ২২ মার্চ আজিজা এপস্টেইনকে কাবাঘরের কিসওয়া উপহার হিসেবে পাঠায়। তার টিমের সদস্যরা এপস্টেইনের টিমের কাছে কিসওয়া সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য দেয়। তারা এর ছবি তুলে বিভিন্ন অংশ চিহ্নিত করে সেগুলোর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে। একমাস পর এপস্টিনের টিম পাল্টা ইমেইল করে যে, তারা কিসওয়াটা রিসিভ করেছে।
তবে আহমাদি কখনও এপস্টেইনের দ্বীপে গিয়েছিলেন কিনা কিংবা সেখানে কী ঘটত, সে সম্পর্কে তিনি জানতেন কিনা ই-মেইলে তা পরিষ্কার হওয়া যায়নি। ‘লিটল সেন্ট জেমস’ নামে পরিচিত ওই দ্বীপটি এপস্টেইনের যৌন পাচার কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
উল্লেখ্য, এপস্টেইন ছিলেন নিউইয়র্কের এক ধনী আর্থিক বিনিয়োগকারী, যিনি ছিলেন নাবালিকাদের যৌন নির্যাতন, মানব পাচার ও যৌন নিপীড়নের একাধিক অভিযোগে অভিযুক্ত। ২০০৮ সালে এপস্টেইন ফ্লোরিডায় অপ্রাপ্তবয়স্ক এক তরুণীর সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলেও অত্যন্ত বিতর্কিত এক চুক্তির মাধ্যমে মাত্র ১৩ মাসের হালকা শাস্তি ভোগ করে মুক্তি পান।
পরে জানা যায়, সেই চুক্তিটি ছিল বিচার বিভাগ ও স্থানীয় প্রসিকিউশনের অস্বাভাবিক ছাড়, যা এপস্টেইনকে আরও বহু গুরুতর অভিযোগ থেকে রক্ষা করেছিল। ২০১৯ সালে নিউইয়র্কে আবারও তার বিরুদ্ধে নাবালিকাদের যৌন পাচারের অভিযোগে বড় ধরনের মামলা হয়।
এফবিআই ও ফেডারেল প্রসিকিউটররা জানান, এপস্টেইন ‘বহু বছর ধরে’ ১৪–১৭ বছর বয়সী কিশোরীদের বিশ্বজুড়ে তার বাড়ি ও ব্যক্তিগত বিমানে এনে শারীরিক নির্যাতন করতেন। তদন্তে উঠে আসে, তিনি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যবহার করে নিজের অপরাধমূলক চক্রকে দীর্ঘদিন আড়াল করে রেখেছিলেন।
২০১৯ সালের আগস্টে নিউইয়র্কের কারাগারে এপস্টেইনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। মেডিকেল পরীক্ষায় এটিকে আত্মহত্যা বলা হলেও, কারাগারের নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি, নজরদারি ক্যামেরা বিকল হয়ে যাওয়া এবং প্রহরীদের দায়িত্বে অবহেলাসহ একাধিক অসঙ্গতি সামনে আসায় তার মৃত্যুকে ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।
এপস্টেইনের সহযোগী ঘিষলেইন ম্যাক্সওয়েলকে ২০২০ সালে গ্রেফতার করা হয় এবং ২০২১ সালে তিনি নাবালিকাদের যৌন পাচারসহ কয়েকটি গুরুতর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। বর্তমানে ঘিষলেইন ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
বিষয়টি নিয়ে তুর্কি সংবাদমাধ্যম ‘ইয়েনি সাফাক’ লিখেছে—জেফ্রি এপস্টেইন কেলেঙ্কারি মূলত যৌন নিপীড়ন ও মানব পাচারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও, কাবার গিলাফ নিয়ে নতুন দাবি কেলেঙ্কারিটিকে আরও ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। কাবা শরিফ মুসলমানদের কাছে সর্বোচ্চ পবিত্র স্থান; এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো বস্তুর অবমাননা বা অপব্যবহার বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিতে গভীর আঘাত হানতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগটি সত্য প্রমাণিত হলে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে ব্যাপক নিন্দা, কূটনৈতিক চাপ এবং স্বাধীন তদন্তের দাবি জোরালো হতে পারে। তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে, যেখানে ধর্মীয় পবিত্রতার প্রতি শ্রদ্ধা সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সেখানে এই অভিযোগের প্রতিক্রিয়া বিশেষভাবে তীব্র হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
