সাবেক দুই শিবির নেতার নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম

■ নাগরিক প্রতিবেদক ■

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সম্পৃক্ত ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের উদ্যোগে এপ্রিলে আরেকটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম আসছে। যা ভবিষ্যতে রূপ নেবে রাজনৈতিক দলে।

রোববার (১৬ মার্চ) রাতে জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি আলী আহসান জুনায়েদ রোববার রাতে তার ফেসবুক প্রোফাইলে নতুন প্ল্যাটফর্মের ঘোষণা দেন।

ঘোষণাপত্রে যুক্ত করা গ্রাফিতিতে দু’জন তরুণীসহ ছয়জনের মুখচ্ছবি রয়েছে। নারীদের একজন হিজাব পরা, অন্যজনের মাথা খোলা। তরুণদের একজন দাড়ি-টুপি জোব্বা পরা, একজন আদিবাসী। জামায়াতে ইসলামীর মতো ধর্মভিত্তিক নয়, এর মাধ্যমে মধ্যপন্থি দল গঠনের আভাস দিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

অভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের সাবেক সভাপতি আলী আহসান জুনায়েদ, রাফে সালমান রিফাত, শরফুদ্দিনসহ অন্তত ৩০ নেতা যোগ দেন জাতীয় নাগরিক কমিটিতে (জানাক)। তারা আলী আহসান জুনায়েদকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব পদে চেয়েছিলেন। ছাত্রশক্তি, ছাত্র অধিকার, ছাত্রলীগের পক্ষত্যাগী এবং বাম সংগঠন থেকে আসা নেতারাও নিজ নিজ বলয় থেকে শীর্ষ পদ চেয়েছিলেন।

এ বিরোধে সাবেক শিবির নেতারা এনসিপিতে যোগ দেননি। যোগ না দেওয়া নেতাদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ আমলে শিবির হত্যাকে যেভাবে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল, নতুন দলেও শুধু অতীতে শিবির সংশ্লিষ্টতার কারণে নেতৃত্বে আসতে দেওয়া হয়নি। ট্যাগিংয়ের রাজনীতি অব্যাহত রাখা হয়েছে।

তারা জানান, রাজনৈতিক প্রেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করবে প্ল্যাটফর্মটি।  জনগণ চাইলে রাজনৈতিক দলে পরিণত হবে। শুধু সাবেক শিবির নয়, সব মতের মানুষের জন্যই উন্মুক্ত থাকবে। শিবির ‘ট্যাগিং’-এ এনসিপিতে যাদের জায়গা হয়নি, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুত ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ পূরণের সম্ভাবনা না থাকায় যারা এনসিপিতে যোগ দেননি, তাদের নিয়ে হবে প্ল্যাটফর্ম। সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া হবে।

রাফে সালমান রিফাত জানাকের যুগ্ম সদস্য সচিব ছিলেন। নতুন প্ল্যাটফর্ম সম্পর্কে তিনি বলেন, এনসিপি গঠন প্রক্রিয়ায় অনেক কিছুই ন্যায্য হয়নি। শুধু সাবেক শিবির নয়, কওমি মাদ্রাসা এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেকে তা মনে করেন। তাই অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণা করবে, এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হচ্ছে। যা রাজনৈতিক প্রেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করবে। ঈদের পর পর জনগণের কাছে যাবে। জনগণ গ্রহণ করলে, রাজনৈতিক দল গঠিত হতে পারে।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জানাকের সর্বশেষ সভায় সিদ্ধান্ত হয় কেন্দ্রীয় কমিটি ১৫ দিনের মধ্যে বিলুপ্ত হবে। তাই জানাক আর কার্যকর নয় জানিয়ে রাফে সালমান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের আরেক সাবেক সভাপতি মির্জা গালিবসহ যারা অভ্যুত্থানের পক্ষে ছিলেন, তারাও নতুন প্ল্যাটফর্মে থাকবেন। 

প্ল্যাটফর্মের ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, পিলখানা, শাপলা ও জুলাই গণহত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধের বিচার, ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধকরণ, দুর্নীতিমুক্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণ, ধর্মবিদ্বেষ ও ইসলামোফোবিয়ামুক্ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ গঠন, ফ্যাসিবাদী কাঠামোর সম্পূর্ণ বিলোপ এবং আধিপত্যবাদের বিপক্ষে কার্যকর অবস্থান—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আজ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গৌণ হয়ে পড়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের স্বীকৃতি ও সম্মান দেওয়া এখনও অসম্পূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে, আমরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের সব রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ নিয়েছি। এর মাধ্যমে আমরা গণঅভ্যুত্থানের দাবিগুলোর প্রকৃত বাস্তবায়ন চাই। নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে বাংলাদেশ পুনর্গঠন সম্ভব।

‘আসসালামু আলাইকুম’ সম্বোধন করে জুনায়েদ লিখেছেন, “৩৬শে জুলাই ফতহে গণভবনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হলেও, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বহু মানুষের কাছে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।”

“পিলখানা, শাপলা ও জুলাই গণহত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধের বিচার, ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধকরণ, দুর্নীতিমুক্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণ, ধর্মবিদ্বেষ ও ইসলামোফোবিয়ামুক্ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ গঠন, ফ্যাসিবাদী কাঠামোর সম্পূর্ণ বিলোপ এবং আধিপত্যবাদের বিপক্ষে কার্যকর অবস্থান- এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আজ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গৌণ হয়ে পড়েছে।”

জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের স্বীকৃতি ও সম্মান দেওয়ার কাজ এখনও অসম্পূর্ণ রয়েছে বলে মন্তব্য করে জুনায়েদ লিখেছেন, “এই পরিস্থিতিতে, আমরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ নিয়েছি। এর মাধ্যমে আমরা গণঅভ্যুত্থানের দাবিগুলো প্রকৃতই বাস্তবায়ন করতে চাই।”

“৩৬শে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে বিপ্লবের সূচনা হয়েছে, তা পূর্ণতা দেওয়ার লক্ষ্যে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সমাজের সর্বস্তরে যোগ্য ও নৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, সামাজিক সুবিচার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিতকরণ, সামাজিক নিরাপত্তা বিধান, বিদ্যমান ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার মূলোৎপাটন এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারলে এই বিপ্লব পরিপূর্ণতা পাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

ফেসবুক পোস্টে জুনায়েদ লিখেছেন, “আমরা বিশ্বাস করি, নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে বাংলাদেশ পুনর্গঠন সম্ভব।”

অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ পুনর্গঠনের এই উদ্যোগে সবার সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তিনি লিখেছেন, “আসুন, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গঠনের এই সংগ্রামে শামিল হই।”

নতুন প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে কমন্টে অংশ গুগল ফর্ম জুড়ে দিয়েছেন জুনায়েদ।

পোস্টের শেষে জুনায়েদ নিজেকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ শক্তির নতুন প্ল্যাটফর্মের প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।

আলী আহসান জুনায়েদ ও রাফে সালমান রিফাত দুজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র। জুনায়েদ পড়েছেন উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগে। আর রিফাত পড়েছেন ফার্মেসিতে। তাঁরা দুজনই ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। যদিও জুলাই আন্দোলনের সময় এবং তাঁর আগের বছরগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কমিটি প্রকাশ্য ছিল না।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা তরুণদের উদ্যোগে গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠিত হয়। ২৬ নভেম্বর এই প্ল্যাটফর্মে কেন্দ্রীয় সদস্য হিসেবে যোগ দেন আলী আহসান জুনায়েদ ও রাফে সালমান রিফাত। এরপরই মূলত তাঁদের দুজনের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় সামনে আসে। জুলাই অভ্যুত্থানে তাঁদের ভূমিকার কথাও আলোচিত হয়।

এরপর ৯ ডিসেম্বর জাতীয় নাগরিক কমিটির সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন করা হয়। সেখানে জুনায়েদকে যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাফেকে যুগ্ম সদস্যসচিব করা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে নতুন দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলে দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক পদের জন্য জুনায়েদের নাম আলোচিত হয়। রাফে সালমান রিফাতও দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে পারেন, এমন আলোচনাও তখন ছিল।

কিন্তু একপর্যায়ে নতুন দলের শীর্ষ একটি পদে জুনায়েদকে বসানোর দাবিকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোক্তাদের ভেতরে বিতর্ক তৈরি হয়। এ নিয়ে ফেসবুকে পাল্টাপাল্টি পোস্ট দেন কমিটির দুটি পক্ষের সমর্থকেরা। আন্দোলনের কৃতিত্ব দাবি করে শুরু হয় কাদা–ছোড়াছুড়ি। এই বিতর্কে এক পক্ষে ছিলেন নাগরিক কমিটিতে থাকা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতারা, অন্য পক্ষে আখতার হোসেনের (বর্তমানে এনসিপির সদস্যসচিব) সমর্থকেরা।

এর মধ্যেই চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে বিএনপিসহ ৮টি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে ২৪ ফেব্রুয়ারি চীন সফরে যান আলী আহসান জুনায়েদ ও রাফে সালমান রিফাতসহ জাতীয় নাগরিক কমিটির চারজন নেতা। এ নিয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটিতে প্রশ্ন তৈরি হয়। সেদিন মধ্যরাতে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে নাগরিক কমিটি বলেছিল, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে তারা কোনো আমন্ত্রণ পায়নি। জুনায়েদ, রিফাতসহ চারজনের এই সফরের বিষয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটি অবগত নয়। এমন পরিস্থিতিতে ২৫ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে ফেসবুকে পৃথক পোস্ট দিয়ে জুনায়েদ ও রিফাত জানান, তাঁরা নতুন রাজনৈতিক দলে থাকছেন না।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *