স্বর্ণের বাজারে ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বাধিক দরপতন

নাগরিক নিউজ ডেস্ক

ইরান যুদ্ধের প্রভাব যেন পড়েছে বৈশ্বিক স্বর্ণের বাজারেও। সোমবার ৫ শতাংশের বেশি কমে ২০২৬ সালের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে নেমে এসেছে। প্রায় ৪৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ সাপ্তাহিক পতনের পর এই ধস দেখা দিল।

গ্রিনিচ মান সময় আজ সকাল ৬টা ৩৩ মিনিট পর্যন্ত স্পট মার্কেটে (যেসব সোনা তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রি করা হবে এবং নিটক ভবিষ্যতেই এর ডেলিভারি দেওয়া হবে) স্বর্ণের দাম ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ২২৬ দশমিক ১৬ ডলারে দাঁড়ায়, যা ১১ ডিসেম্বরের পর সর্বনিম্ন। টানা নবম দিনের মতো পতন অব্যাহত ছিল আজ।

গত সপ্তাহে এই মূল্যবান ধাতুর দাম ১০ শতাংশের বেশি কমেছে, যা ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারির পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক পতন। ২৯ জানুয়ারি প্রতি আউন্স ৫ হাজার ৫৯৪ দশমিক ৮২ ডলারের রেকর্ড উচ্চতা থেকে সোনা ইতিমধ্যে ২০ শতাংশেরও বেশি নেমে এসেছে। এপ্রিল ডেলিভারির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণের ফিউচার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৪ হাজার ২৩১ দশমিক ৮০ ডলারে নেমে এসেছে।

গতকাল রোববার ইরান জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের বিদ্যুৎ গ্রিডে হামলার হুমকি বাস্তবায়ন করলে প্রতিশোধ হিসেবে তারা উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর জ্বালানি ও পানি অবকাঠামোতে আঘাত হানবে।

এর প্রভাবে এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতেও শেয়ারের দাম পড়ে যায় এবং তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১১০ ডলারের অনেক ওপরে স্থির থাকে। ওয়াটারার আরও বলেন, উচ্চ তারল্যই এখন সোনার জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঝুঁকি এড়ানোর এই সময়ে শেয়ারবাজারে পতনের কারণে বিনিয়োগকারীরা অন্য সম্পদের মার্জিন কল মেটাতে সোনার অংশ বিক্রি করে দিচ্ছেন।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম উঁচু অবস্থায় রয়েছে। এতে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা জোরদার হচ্ছে। সাধারণত মূল্যস্ফীতি বাড়লে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়ে, কিন্তু উচ্চ সুদের হার সুদবিহীন এই সম্পদের চাহিদা কমিয়ে দেয়।

ফিচ সলিউশন্সের একটি ইউনিট বিএমআই বলেছে, নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিনিয়োগ থেকে সরে গিয়ে বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রবণতাভিত্তিক অবস্থান নেওয়ার ঝোঁক বাড়লে সোনার দর আরও নিচে নামার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। শক্তিশালী মার্কিন ডলার এবং ফেডারেল রিজার্ভের সুদ কমানোর সম্ভাবনা কমে যাওয়াই এখন বাজারের প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

সিএমইর ফেডওয়াচ টুল অনুযায়ী, চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়াতে পারে এমন বাজার প্রত্যাশা বেড়েছে। ২০২৬ সালের শেষে সুদ কমানোর চেয়ে বাড়ার সম্ভাবনাই এখন বেশি দেখা যাচ্ছে।

অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও তীব্রভাবে কমেছে। স্পট রুপা ৮ দশমিক ৯ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৬১ দশমিক ৭৬ ডলারে নেমেছে। প্লাটিনাম ৯ শতাংশ কমে ১ হাজার ৭৪৯ দশমিক ৩১ ডলার এবং প্যালাডিয়াম ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমে ১ হাজার ৩৩০ দশমিক ৫০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

কেন কমছে দাম?

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বেশ কয়েকটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক কারণের সংমিশ্রণে এই নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে:

১. শক্তিশালী মার্কিন ডলারের প্রভাব: বিশ্ববাজারে মার্কিন ডলারের মান শক্তিশালী হওয়ায় অন্যান্য মুদ্রার (যেমন—ইউরো, পাউন্ড বা ইয়েন) অধিকারীদের কাছে সোনা ও রুপা কেনা আগের চেয়ে ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সোনা ডলারে কেনাবেচা হয় বলে ডলারের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই সোনার চাহিদা ও দাম কমে যায়।

২. বন্ড মার্কেটের আকর্ষণ বৃদ্ধি: যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বা লভ্যাংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সোনা একটি নন-ইল্ডিং সম্পদ, অর্থাৎ এটি ধারণ করলে কোনো নিয়মিত সুদ পাওয়া যায় না। যখন বন্ডের সুদ বেড়ে যায়, তখন বড় বিনিয়োগকারীরা সোনা বিক্রি করে বন্ডের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন।

৩. মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও মূল্যস্ফীতির শঙ্কা: মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরও অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের খবর দিয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো (ফেডারেল রিজার্ভ) সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ রাখতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা সোনা ছেড়ে দিচ্ছেন।

৪. মুনাফা সংগ্রহের হিড়িক: গত কয়েক মাসে সোনার দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর বিনিয়োগকারীরা এখন তাদের মুনাফা ঘরে তুলতে চাচ্ছেন। প্রযুক্তিগত সূচকগুলো দেখাচ্ছিল যে বাজার ‘ওভারবট’ বা অতিরিক্ত ক্রয় পর্যায়ে চলে গেছে, যা এই ত্বরান্বিত বিক্রির অন্যতম কারণ।

স্বর্ণের দাম ৪৪৯৪ ডলারের নিচে নামলে কী হবে

বর্তমানে বাজার পর্যবেক্ষকেরা দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টেকনিক্যাল স্তরের দিকে নজর রাখছেন: স্বর্ণ প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৪৯৪ ডলার; রুপা প্রতি আউন্স ৬৮ ডলার।

বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৪৯৪ ডলারের সীমা ভেঙে নিচে নামে, তবে এটি একটি শক্তিশালী ‘সেল সিগন্যাল’ হিসেবে কাজ করবে এবং স্বল্প মেয়াদে আরও বড় পতন ঘটতে পারে। একইভাবে রুপার দাম ৬৮ ডলারের নিচে গেলে বিক্রির চাপ আরও তীব্র হবে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই পতন আসলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য পুনরায় বাজারে প্রবেশের একটি সুযোগ হতে পারে।

অন্যান্য ধাতুর ওপর প্রভাব

কেবল স্বর্ণ বা রুপা নয়, শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত মূল্যবান ধাতুগুলোর বাজারেও মন্দাভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক লেনদেনে প্লাটিনাম এবং প্যালাডিয়ামের দামও উল্লেখযোগ্য হারে নিচে নেমেছে। এটি নির্দেশ করে যে বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে ধাতব সম্পদ থেকে মূলধন সরিয়ে লিকুইড ক্যাশ বা বন্ডের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

আগামী দিনগুলোতে বাজারের দিক পরিবর্তন মূলত দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে: যদি মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ফেডারেল রিজার্ভ) সুদের হার কমানোর কোনো ইঙ্গিত দেয়, তবে স্বর্ণ ও রুপার দাম আবার লাফিয়ে বাড়তে পারে। ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্য বা ইউক্রেন সংকটের কোনো প্রশমন ঘটলে সোনার ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ আশ্রয়ের চাহিদা সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে।

বিশ্লেষকেরা সাধারণ ও বড় উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীদের বর্তমান অস্থির বাজারে অত্যন্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, বর্তমান অস্থিরতায় একবারে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ না করে ধাপে ধাপে বা নির্দিষ্ট বিরতিতে বিনিয়োগ করা নিরাপদ হতে পারে।

এ ছাড়া যারা নতুন করে বড় পজিশন নিতে চান, তাঁদের উচিত স্বর্ণের ৪ হাজার ৪৯৪ ডলারের সাপোর্ট লেভেলটি স্থায়ী হয় কি না, তা দেখার জন্য কয়েক দিন অপেক্ষা করা। সেই সঙ্গে কেবল মূল্যবান ধাতুর ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য সম্পদের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষার পরামর্শ দিচ্ছেন বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞরা।

দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রমবর্ধমান স্বর্ণের মজুত এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি দামকে পুনরায় স্থিতিশীল করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। সরবরাহ সংকট, বিশেষ করে রুপার ক্ষেত্রে, ভবিষ্যতে দাম পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *