■ নাগরিক প্রতিবেদক ■
রাজধানীর পল্টনে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরীরের ‘মার্চ ফর খিলাফত’ কর্মসূচি থেকে মিছিল বের হলে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়েছে পুলিশ। এ সময় মিছিলটি ছাত্রভঙ্গ হয়ে গেছে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা অলিগলিতে অবস্থান নেয়। আটক করা হয়েছে কমপক্ষে ১৫ জনকে।
প্রাথমিকভাবে আটককৃতদের মধ্যে আবু শোয়াইব, মাশফিউর রহমান, আশফাকসহ কয়েকজনের নাম জানা গেলেও বাকিদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার শাহরিয়ার ও রমনা বিভাগের ডিসি মাসুদ আলম আটকের ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তবে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানাতে রাজি হননি। তাঁরা জানান, আটকের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
শুক্রবার জুমার নামাজ শেষ হওয়ার পরেই হিযবুত তাহরীরের ব্যানার নিয়ে একটি মিছিল বের হয়। তুরস্কে খিলাফত পতনের ১০১ বছরের প্রেক্ষাপটে ‘মার্চ ফর খিলাফত’ কর্মসূচি ডাক দেয় হিযবুত তাহরীর। জুমার নামাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটের সামনের রাস্তায় জড়ো হয় কয়েক হাজার মানুষ। সিঁড়িতে অবস্থান নেওয়া হিযবুত তাহরীরের কর্মীরা কালিমা খচিত ব্যানার উঁচিয়ে স্লোগান দিতে থাকে। ‘মুক্তির একপথ, খিলাফত খিলাফত’ স্লোগানে তারা মিছিল শুরু করেন। শুরুতে পুলিশের একটি দল তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও জনবল কম থাকায় তারা সফল হয়নি। পুলিশের বাধা অতিক্রম করে মিছিলটি পল্টন মোড় পার হয়ে বিজয়নগর মোড়ের দিকে যায়। এ সময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিপেটা করে। মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা অলিগলিতে ঢুকে পড়ে। কিছুক্ষণ পরে তাঁরা আবার সংগঠিত হয়ে পল্টন মোড়ের দিকে আসতে থাকে। পুলিশ এ সময় সাউন্ড গ্রেনেড ছোঁড়ে। তখন মিছিলটি আবার ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। তবে তার আগে প্রায় ১৫ মিনিট নির্বিঘ্নে মিছিল করে নিষিদ্ধ এই সংগঠন।
বেলা আড়াইটার দিকে পল্টন ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন অলিগলিতে যায় পুলিশ। পরে হিযবুত তাহরীরের সদস্য সন্দেহে বেশ কয়েকজনকে আটক করে পুলিশের গাড়িতে তুলতে দেখা যায়।
এর আগে নিষিদ্ধঘোষিত হিযবুত তাহরীরের ‘মার্চ ফর খিলাফত’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে ও আশপাশের এলাকায় সতর্ক অবস্থান নেন সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের বিভিন্ন শাখার সদস্যরা।
আজ শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বায়তুল মোকাররম এলাকায় গিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জোরদার করার এমন দৃশ্য দেখা গেছে।

দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, পল্টন মোড়ে প্রচুর পুলিশ ও এপিবিএন সদস্যরা রয়েছেন। পল্টন মোড় থেকে গুলিস্তানমুখী সড়কে (সচিবালয়ের বিপরীত পাশের রাস্তায়) একটি সাঁজোয়া যান (এপিসি), একটি জলকামান ও একটি প্রিজন ভ্যানও দেখা গেছে। বায়তুল মোকাররম থেকে পল্টন মোড়মুখী সড়কে পুলিশের আরেকটি প্রিজন ভ্যান দেখা গেছে।
পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মো. মাসুদ আলম সাংবাদিকদের বলেন, হিযবুত তাহরীরের সদস্যরা বিভিন্ন অলিগলিতে অবস্থান নিয়েছে। পুলিশ সতর্ক অবস্থায় আছে।
পুলিশের রমনা বিভাগের পদস্থ এক কর্মকর্তা বলেন, রায়তুল মোকাররম এলাকায় হিযবুত তাহ্রীরকে বাধা দেওয়া হয়নি। কেননা, সেখানে অনেক মুসল্লি ছিলেন। তাদের হালকা বাধা দিয়ে পুরানা পল্টন ও বিজয়নগরের দিকে বের করে আনা হয়। সেখানে সাধারণ মানুষ থাকায় এই এলাকাতেই তাদের প্রতিরোধ করা হয়।
এদিকে মিছিলের কারণে পল্টন-বায়তুল মোকাররম এলাকায় সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে গাড়ির দীর্ঘ জট পড়ে সড়কে।
গতকাল রাত সোয়া ১২টার দিকে ঢাকার উত্তরা থেকে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। উত্তরা ১১ ও ১২ নম্বর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন মনিরুল ইসলাম (৪০), মোহতাসিন বিল্লাহ (৪০) ও মাহমুদুল হাসান (২১)।
ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায় ‘মার্চ ফর খিলাফত’ নামে সমাবেশ পালন-সংক্রান্ত গোপন পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত থাকায় তাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে।
হিযবুত তাহরীরের সব কার্যক্রম শাস্তিযোগ্য অপরাধ
হিযবুত তাহরীরের সব কার্যক্রম শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। শুক্রবার (৭ মার্চ) এক বার্তায় এ কথা জানানো হয়।
পুলিশ সদরদপ্তরের বার্তায় বলা হয়, হিযবুত তাহরীর একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন। আইন অনুযায়ী এদের সব কার্যক্রম শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এদিকে পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯ অনুযায়ী নিষিদ্ধ ঘোষিত যেকোনো সংগঠনের কার্যক্রম দণ্ডনীয় অপরাধ। এর আওতায় হিযবুত তাহরীরের সভা, সমাবেশ, মিছিল, পোস্টার-লিফলেট বিতরণ বা প্রচারের যেকোনো প্রচেষ্টা আইন লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
এর আগে, বৃহস্পতিবার (৬ মার্চ) ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, জননিরাপত্তার প্রতি হুমকি বিবেচনায় সরকার ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর থেকে সংগঠনটির যেকোনো কার্যক্রম বেআইনি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর যেকোনো প্রচারণামূলক কার্যক্রম কঠোর নজরদারিতে রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে তা দমনে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংঘর্ষের সময় আটক ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে আনলেন উপদেষ্টা আসিফ
নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরীরের ‘মার্চ ফর খিলাফত’ পুরানা পল্টনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় সেনাবাহিনীর সদস্যরা এক ব্যক্তিকে আটক করে নিয়ে যান। পরে তাঁকে ছাড়িয়ে আনেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। প্রথমে সেই ব্যক্তিকে রিকশাচালক বলে প্রচার করা হলেও পরবর্তী সময়ে জানা যায় তিনি একজন পানি সরবরাহকারী।
আজ শুক্রবার (৭ মার্চ) বিকেল ৪টা ৪৬ মিনিটে তাঁকে ডিবি অফিস থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এ-সংক্রান্ত একটি পোস্টও দেন আসিফ।
এর আগে রাজধানীর পল্টনে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকায় নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরীরের মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে যৌথ বাহিনীর লাঠিচার্জের সময়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, লাঠিচার্জের সময় পুলিশের সঙ্গে নিজ থেকেই যুক্ত হন লাল টি-শার্ট পরিহিত এক যুবক। সেনাসদস্যরা দ্রুতই তাঁকে সরিয়ে দেন। পরে আরও কিছু ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, ওই যুবককে সেনাবাহিনীর সদস্যরা আটক করে নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর মুক্তির দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালান নেটিজেনরা।
খবর পাওয়া মাত্রই যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া মিন্টো রোডের ডিবি অফিসে যান এবং ওই যুবককে ছাড়িয়ে আনেন। শুক্রবার (৭ মার্চ) বিকেল ৪টা ৪৬ মিনিটে তাঁকে ডিবি অফিস থেকে মুক্ত করে আনা হয়।
বিকেল ৫টা ৩৬ মিনিটে দেওয়া ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘৫ আগস্টের পর এই জনতা সব সংকট থেকে দেশকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছে। বিপ্লবোত্তর একটা ভঙ্গুর আর অসহযোগিতা পূর্ণ প্রশাসন নিয়ে জনতার সাহায্য ছাড়া টিকে থাকা অসম্ভব ছিল। গতকাল যারা সরকারকে মিস ইনফরমেশন দিয়েছেন নোট করে রাখা হয়েছে।’
তিনি আরও লেখেন, ‘আর যারা মুখোশ পরে নানা রকম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তারাও সাবধান হয়ে যান। জনতাকে এখন আর ঘোল খাওয়ানো যায় না, তাঁরা সব বোঝে।’
পোস্টে তিনি লেখেন, ‘মামার নাম আরমান, উনি রিকশাওয়ালা না। আগে রিকশা চালাতেন। এখন বায়তুল মোকাররমের সামনের দোকানগুলোতে পানি সাপ্লাইয়ের কাজ করেন। পুলিশকে সহায়তা করতে গেলে তার উপরেও হামলা করে আহত করা হয়। পরবর্তীতে আর্মির সদস্যরা তাকে এরেস্ট করে ডিবিতে সোপর্দ করে। তাকে ছাড়িয়ে এখন ঢাকা মেডিকেলে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছে। জনতাই শক্তি।’