খামেনিকে হত্যার পর ইরানে কী হবে

তাফসির বাবু ■  

ইরানে হামলার পেছনে আমেরিকার ঘোষিত কোন রাজনৈতিক লক্ষ্য নেই। তবে ট্রাম্পের কথায় দুটি বিষয় স্পষ্ট। একটি হচ্ছে, তারা চান রেজিম চেইঞ্জ অর্থাৎ ইসলামপন্থী বিপ্লবী সরকারকে উৎখাত করা। দ্বিতীয় হচ্ছে, ইরানের পরমাণু সক্ষমতা এবং মিসাইল শক্তি ধ্বংস করা।

এখানে আমেরিকা প্রাথমিকভাবে প্রথমটায় গুরুত্ব দিয়েছে। অথাৎ রেজিম চেইঞ্জের জন্যই আমেরিকা টার্গেট করেছে খামেনিকে। এর আগে ইরান-ইসরায়েল যে ১২ দিনের যুদ্ধ হয়েছিলো, তখন খামেনিকে হত্যা করা হয়নি। এখন হত্যা করা হয়েছে, কারণ আমেরিকা মনে করছে এতে সরকার ভেঙে পড়বে। নেতৃত্বে ক্রাইসিস দেখা দেবে। তাছাড়া ট্রাম্পের প্ল্যান হলো হয়তো সেক্যুলার নাগরিকরা রাস্তায় নেমে আসবে। রেজিম চেঞ্জ হয়ে যাবে।

কিন্তু আসলে এয়ার পাওয়ার দিয়ে ইরানে রেজিম চেঞ্জ সম্ভব না। সেটা করতে হলে মার্কিন সৈন্যকে লাখে লাখে ঢুকতে হবে ইরানে। কিন্তু আমেরিকা সেটা করবে না। আবার বিমান হামলাতেও কাজ হবে না কারণ ইরানের লাখ লাখ অস্ত্র সজ্জিত সৈন্য ইনট্যাক্ট আছে, পুলিশ আছে, আরও বাহিনী আছে। আবার খামেনির মৃত্যুর পর সমর্থকদের ঐক্য আরো বেড়েছে। ফলে সরকারের পতন হবে না। সেক্যুলার শক্তি মাঠে নামলে তাদের দমন করা হবে খুবই সহজ।

যেহেতু আমেরিকার দুর্বলতা হচ্ছে, তারা সৈন্য নামিয়ে ইরান দখল করতে পারবে না। সেহেতু ইরানের নতুন নেতৃত্ব নত হবে বলে মনে হয় না। মানে তারা আপস করে সকল পরমাণু অ্যাসেট আমেরিকার হাতে তুলে দেবে এবং মিসাইল ধ্বংস করবে, তারপর চুক্তি করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মূলধারায় ফিরবে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করার কৌশল নেবে -সেটা মনে হচ্ছে না।

আমেরিকার আরেকটা আশা আছে। তারা ভাবছে, রেজিম চেইঞ্জ না হলেও নতুন সরকার নমনীয় হবে। তাদের ভাবনা হচ্ছে, খামেনিই ছিলেন ইরানের অনমনীয় মনোভাব অথবা বলতে পারেন আত্মসমর্পণ না করার পেছনে মূল ব্যক্তি। অর্থাৎ ইরান-আমেরিকা ডিল যে হলো না, ইরান সরকার যে অস্ত্রসমর্পণ না করে মৃত্যুকে বেছে নিলো, তার পেছনে খামেনিকেই তারা দায়ী করে। তাই খামেনিকেই সরাতে হবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, খুব একটা লাভ হবে না। ইরান দ্রুতই শূণ্যস্থান পূরণ করছে। কারণ খামেনি নিজেই ব্যাকআপ প্ল্যান করে রেখেছিলেন।

যেহেতু আমেরিকার দুর্বলতা হচ্ছে, তারা সৈন্য নামিয়ে ইরান দখল করতে পারবে না। সেহেতু ইরানের নতুন নেতৃত্ব নত হবে বলে মনে হয় না। মানে তারা আপস করে সকল পরমাণু অ্যাসেট আমেরিকার হাতে তুলে দেবে এবং মিসাইল ধ্বংস করবে, তারপর চুক্তি করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মূলধারায় ফিরবে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করার কৌশল নেবে -সেটা মনে হচ্ছে না।

সেক্ষেত্রে যুদ্ধ কে কতদিন চালাতে পারে সেটাই হবে নির্ধারক। মনে রাখতে হবে ঐতিহাসিক এবং জাতিগতভাবেই ইরান কষ্টসহিষ্ণু। যে কোনো আঘাত সয়ে নেয়ার ক্ষমতা ইরানীদের মজ্জাগত। তাদের ভূপ্রকৃতি, মানসিকতা, শতশত বছর ধরে কারবালার শোক বয়ে বেড়ানো -সবমিলিয়ে তাদের সহ্য করার ক্ষমতা অসাধারণ। তাদের সুবিশাল পাহাড়, বিশাল বিশাল শহর বিমান হামলা অ্যাবজর্ব করে নেবে। যেভাবে আগেরবারের যুদ্ধে সয়ে নিয়েছে।

কিন্তু যদি সহ্য করার সঙ্গে সঙ্গে ইরান তার মিসাইল শক্তি ধরে রেখে পাল্টা হামলা অব্যাহত রাখতে পারে, তাহলে সেটা অস্থির ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক এবং সামরিক বিপর্যয়ের কারণ হবে। ইসরায়েল এবং আমেরিকার ব্যয়বহুল মিসাইল ঠেকানোর ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতি আছে। তখন তারা ইউরোপের সাহায্য নিতেই পারেন। কিন্তু মার্কিন বেইসগুলোতে মিসাইল পড়তে থাকলে ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। অন্য আরব দেশগুলোর অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকায় তারাও যুদ্ধ থামানোর জন্য চাপ দিতে থাকবে আমেরিকাকে। এরকমটা হলে যুদ্ধ থামতে বেশিদিন লাগবে না। ট্রাম্পও ব্যয়বহুল যুদ্ধ থামিয়ে দেয়ার উপায় খুঁজবেন। কারণ?

ক. ট্রাম্প মূলত: ব্যবসায়ী। সে টাকা এবং অর্থনীতি ধ্বংস করে যুদ্ধ টিকিয়ে রাখবে বলে মনে হয় না।

খ. দূরে থেকে বিমান হামলা করে সরকার পরিবর্তন যখন সম্ভব হবে না এবং অস্ত্র ভান্ডারও পুরোপুরি ধ্বংস করা অসম্ভব সেই চিত্র যখন স্পষ্ট হবে, আশা করা যায় তখন ট্রাম্প তার সম্বিৎ ফিরে পাবেন। তিনি যুদ্ধ থেকে বের হবেন।

লেখক: সাংবাদিক

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *