■ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ■
আন্তর্জাতিক তেল পরিবহনের অন্যতম গুরত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। সরু সামুদ্রিক এ পথটি ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরকে যুক্ত করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেভাল মিশন এসপাইডেসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বলছে, ‘হরমুজ দিয়ে আর কোনো জাহাজ চলাচল করতে দেওয়া হবে না।’
হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পরিবাহিত হয়।
উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারীদের জন্য তেল রপ্তানির পথ হলো হরমুজ প্রণালী। এই পথ দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় তেল পাঠায় সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আরব উপদ্বীপ ও ইরানের মাঝ দিয়ে যাওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে পরিবহন স্থগিত হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি একটি সরু জলপথ যা পশ্চিমের পারস্য উপসাগরকে পূর্বে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে এবং আরব উপদ্বীপ থেকে ইরানকে পৃথক করেছে। ৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রণালিটি পারস্য উপসাগরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ওমান ও ইরানকে সংযুক্ত করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরানকে পৃথক করেছে।
এই সামুদ্রিক পথটি আন্তর্জাতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ খনিজতেলবাহী জাহাজ যাতায়াতের এটিই একমাত্র পথ। বিশ্বব্যাপী পেট্রোলিয়াম পরিবহনে প্রণালিটির কৌশলগত গুরুত্ব অত্যধিক। জলপথটির সবচেয়ে সরু অংশের দৈর্ঘ্য ২১ মাইল এবং প্রস্থ দুই মাইল। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন কর্তৃপক্ষের মতে, ২০০৯ সালে সমুদ্রপথে বৈশ্বিক খনিজ তেল বাণিজ্যের ৩৩ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সম্পাদিত হয়। ২০১৯ সালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে এক দিনে এক কোটি ৯০ লক্ষ ব্যারেল খনিজ তেল পরিবাহিত হয়। এ অঞ্চল দিয়ে তেল পরিবহন নির্বিঘ্ন রাখতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ নিয়মিত পাহারা দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত তেলের বেশির ভাগই এশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যায়। জাপানের আমদানিকৃত তেলের তিন-চতুর্থাংশ হরমুজের ওপর দিয়ে নিয়ে যায়। আর চীনের আমদানিকৃত তেলের অর্ধেকই আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে। হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেলের মতো তেলজাত দ্রব্য রপ্তানি হয়ে থাকে। এর সঙ্গে আছে তরলীকৃত গ্যাসও।
হরমুজ প্রণালি নামটি পারস্যের রাজা দ্বিতীয় শাপুর-এর মা ইফরা হুরমিজদ-এর নাম থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। তিনি ৩০৯ থেকে ৩৭৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন।
১ম শতকের নাবিকদের জন্য লেখা গাইডবুক এরিত্রিয়ান সাগরের পেরিপ্লাস-এ পারস্য উপসাগরের প্রবেশপথের বর্ণনা রয়েছে, যদিও সেখানে প্রণালির নাম উল্লেখ করা হয়নি:
এই কালাই দ্বীপপুঞ্জের উপরের দিকে আছে কালন নামের একটি পর্বতশ্রেণি, এবং এর কিছু দূরেই শুরু হয় পারস্য উপসাগরের মুখ, যেখানে মুক্তা আহরণের জন্য অনেক ডুব দেওয়া হয়। প্রণালির বাঁ দিকে আছে আসাবন নামে বিশাল পাহাড়, আর ডান দিকে আছে আরেকটি গোল ও উঁচু পাহাড়, যার নাম সেমিরামিস; এই দুই পর্বতের মাঝখান দিয়ে প্রণালির প্রস্থ প্রায় ৬০০ স্টেডিয়া; এরপর শুরু হয় বিশাল ও প্রশস্ত পারস্য উপসাগর, যা অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই উপসাগরের শেষপ্রান্তে একটি বাজার শহর রয়েছে, যার নাম আইনগতভাবে নির্ধারিত ‘আপোলোগাস’, এটি চারাক্স স্পাসিনি ও ইউফ্রেটিস নদীর কাছে অবস্থিত।
১০ম থেকে ১৭শ শতাব্দীর মধ্যে এখানে হরমুজ রাজ্য ছিল, যেখান থেকে ধারণা করা হয় এই প্রণালির নাম এসেছে। ইতিহাসবিদ ও ভাষাবিদদের মতে, “হরমুজ” নামটি এসেছে স্থানীয় ফারসি শব্দ হুর-মঘ থেকে, যার অর্থ খেজুর গাছ। হুরমোজ ও মিনাব এলাকার স্থানীয় উপভাষায় এই প্রণালিকে এখনও “হুরমঘ” বলা হয়, যার অর্থও ওই রকমই। এই শব্দের সাথে জরাথ্রুষ্ট্রীয় দেবতা হরমুজ (অহুর মাজদা-এর আরেক নাম) নামটির মিল থাকার কারণে অনেকেই মনে করেন এই দুটি শব্দের মধ্যে সম্পর্ক আছে।
