■ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ■
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর সোমবার (৯ মার্চ) ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করেছে।
ইরানের ৮৮ সদস্যের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ মোজতবাকে এই পদে নির্বাচিত করেছে। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, এই পরিষদই সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত।
১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর এ নিয়ে দ্বিতীয়বার নতুন কোনো নেতা নির্বাচন করল এই পরিষদ। এর আগে তিন দশকেরও বেশি সময় আগে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর আলী খামেনিকে দ্রুততার সঙ্গে নির্বাচিত করা হয়েছিল।
৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি প্রয়াত আলী খামেনির দ্বিতীয় পুত্র। যদিও তার কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি পদ ছিল না, তবুও পর্দার আড়ালে তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে বলে জানা যায়। বিশেষ করে দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ-এর সঙ্গে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
উল্লেখ্য, মোজতবা কোনো উচ্চপদস্থ ধর্মীয় নেতা নন। ২০১৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তৎকালীন মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ মোজতবার বিরুদ্ধে তার বাবার আঞ্চলিক লক্ষ্য পূরণ এবং অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নে আইআরজিসি-কুদস ফোর্স ও বাসিজ বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অভিযোগ এনেছিল
১৯৬৯ সালের আটই সেপ্টেম্বর ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন মোজতবা।
তিনি খামেনির ছয় সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। তেহরানের ধর্মীয় আলাভি স্কুলে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন।
ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ বছর বয়সে ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে তিনি স্বল্প সময়ের জন্য বেশ কয়েকবার সেনাবাহিনীতে কাজ করেছিলেন।
এরপর ১৯৯৯ সালে তিনি ধর্মীয় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পবিত্র শহর কোমে যান, যা শিয়া ধর্মতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে, তিনি বেশিরভাগ সময়েই নিজেকে আড়ালে রেখে আসছিলেন।
তিনি কখনও কোনো সরকারি পদে ছিলেন না এবং জনসমক্ষে কোনো বক্তৃতা বা সাক্ষাৎকারও দেননি। তার খুব অল্প সংখ্যক ছবি ও ভিডিওই বাইরে এসেছে।
নতুন সর্বোচ্চ নেতার নির্বাচন উদযাপনে তেহরানের রাস্তায় হাজারো মানুষ
ইরানে সরকার সমর্থকরা দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নিয়োগ উদযাপন করতে তেহরানের রাস্তায় নেমেছেন। একটি ছবিতে দেখা গেছে- এক জনসমাবেশে মোজতবা খামেনি ও তার বাবা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি হাতে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে জনগণ। গত সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন।
আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি এমন একটি প্ল্যাকার্ড ধরে আছেন, যা দেখে মনে হচ্ছে আলী খামেনি তার ছেলের হাতে পতাকা তুলে দিচ্ছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, সোমবার সকালে তেহরানের একটি কেন্দ্রীয় চত্বরে হাজারো মানুষ জড়ো হয়ে নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। সেখানে অনেকে প্রকাশ্যে মোজতবা খামেনির নিয়োগকে উদযাপন করলেও অনেকে বলেছেন, তিনি, ‘তার বাবার চেয়েও খারাপ’ এবং ‘তার পরিণতিও যেন তার বাবার মতোই হয়’, এমনটাও অনেকে আশা করেছেন।
তবে এখানে উল্লেখ্য, বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকেই ইরান ভিসা দেয় না। ফলে সাংবাদিকদের জন্য সেখান থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা বেশ কঠিন। বিশেষ করে, বিবিসি পার্সিয়ানের সাথে ইরানিসহ বিশ্বের প্রায় ২৪ মিলিয়ন মানুষ যুক্ত থাকলেও ইরানি কর্তৃপক্ষ এটির সম্প্রচারে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে।
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনি সোমবার দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলি লারিজানি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মোজতবা খামেনি কখনো কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি কিংবা জনমতের মুখোমুখি হননি। তবে কয়েক দশক ধরে তিনি সর্বোচ্চ নেতার ঘনিষ্ঠ মহলে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি উত্তরসূরি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে কখনো জনসমক্ষে আলোচনা করেননি। এটি একটি সংবেদনশীল বিষয়, কারণ তার এই দায়িত্বপ্রাপ্তি দেশটিতে একটি রাজবংশীয় শাসন ব্যবস্থা তৈরির ঝুঁকি তৈরি করবে, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের আগের পাহলভি রাজতন্ত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়।
এদিকে, আইআরজিসি মোজতবা খামেনিকে অভিনন্দন জানিয়েছে এবং তাকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি খামেনির প্রতি তাদের ‘একনিষ্ঠ ও আজীবন আনুগত্য’ ঘোষণা করে জোর দিয়ে বলেছে, তারা তার সব আদেশ পালন করতে এবং তা বাস্তবায়নে প্রস্তুত থাকবে।
আইআরজিসি আরও যোগ করেছে যে, ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস) কর্তৃক খামেনির এই নির্বাচন ‘সবার কাছে প্রমাণ করেছে যে ইসলামিক ব্যবস্থার গতিশীলতা থেমে থাকে না এবং বিপ্লব ও ইসলামিক ব্যবস্থা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।’
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীও নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রতি তাদের সমর্থন ঘোষণা করেছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সামরিক বাহিনী খামেনিকে ‘ন্যায়পরায়ণ, জ্ঞানী… ধর্মপ্রাণ এবং বিচক্ষণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা বলেছে, বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাকে নির্বাচিত করে তাদের ‘বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ’ দিয়েছে।
মোজতবাকে অভিনন্দন জানিয়ে পুতিন বললেন, ইরানের প্রতি রাশিয়ার ‘অবিচল সমর্থন’ রয়েছে
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি বলেছেন, মোজতবা খামেনি তার বাবার কাজ ‘মর্যাদার সঙ্গে’ এগিয়ে নিয়ে যাবেন এবং ‘কঠিন পরিস্থিতির মুখে’ ইরানি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রাখবেন।
ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এ সময় রুশ প্রেসিডেন্ট তেহরানের প্রতি রাশিয়ার ‘অবিচল সমর্থন’ এবং ‘ইরানি বন্ধুদের সঙ্গে সংহতির’ বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেন।
এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নিয়োগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘সন্তুষ্ট নন’ বলে জানিয়েছেন। ট্রাম্পের বরাত দিয়ে রক্ষণশীল মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলা হয়।
ফক্স নিউজের উপস্থাপক ব্রায়ান কিলমিড বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণার পর তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন। ট্রাম্প তাকে বলেছেন, ‘আমি সন্তুষ্ট নই।
