স্ত্রী-সন্তানের জন্য সাদ্দামের স্মৃতিচিহ্ন জেলের দুমুঠো মাটি

■ বাগেরহাট প্রতিনিধি ■

যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকের ভেতরে তখন দুটি মরদেহ। একটি ২২ বছর বয়সী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর আরেকটি তাঁর ৯ মাস বয়সী শিশুসন্তান সেজাদ হাসান নাজিফের।

কারাফটকের সেই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে সাদ্দামের ভাই শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সন্তানকে কোলে নিতে অনুরোধ করছিলাম সাদ্দামকে। আমার ভাই বলছিল, জীবিত অবস্থায় বাচ্চাটাকে কোলে নিতে পারিনি। মরার পর এখন কোলে নিয়ে কী হবে!’ এরপর বাচ্চার নিথর দেহ স্পর্শ করে বলছিল, ‘ভালো বাপ হতে পারিনি। তোর বাপকে ক্ষমা করে দিস।’ একইভাবে স্ত্রীর উদ্দেশে বলছিল, ‘ভালো স্বামী হতে পারলাম না। ক্ষমা করে দিও।’

শহিদুল আরও বলেন, ‘পলিথিনে মোড়ানো দুমুঠোর মতো মাটি আমার কাছে দেয় সাদ্দাম। বলছিল, তোর ভাবির কবরে এক মুষ্টি আর ছেলের কবরে এক মুষ্টি দিস। পলিথিনে মুড়িয়ে প্যান্টের পকেটে ওই সামান্য মাটি নিয়ে আসে। এই দৃশ্য দেখে কান্না ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। হয়তো কারা কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে জেলে রাখার ভেতর থেকে সামান্য ওই মাটি সাদ্দাম সংগ্রহ করেছিল।’ 

শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাট সদরের সাবেকডাঙ্গা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে স্বর্ণালী ও ৯ মাসের শিশুসন্তান নাজিফের লাশ উদ্ধার করা হয়। নাজিফের বাবা জুয়েল হাসান সাদ্দাম যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। তিনি ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলা সভাপতি। 

স্থানীয়দের ভাষ্য, স্বামীর বাড়ির সিলিংয়ে রশির সঙ্গে ঝুলছিল গৃহবধূ স্বর্ণালীর মরদেহ। আর নাজিফকে বাথরুমের বালতির পানিতে চুবিয়ে রাখা হয়েছিল। স্বজন ও প্রতিবেশীরা দ্রুত শিশুটিকে বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই শিশুটির মৃত্যু হয়। 

সাদ্দামের ভাই শহিদুল ইসলাম বলেন, আমার ভাইকে একের পর এক মামলায় আটকানো হওয়ায় ভাবি হতাশ হয়ে পড়ছিল। অনেকে বলাবলি করছিল, সহসা ছাড়া পাবে না। আর ছাড়া পেলে মেরে ফেলবে। এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা করত ভাবি। এ ছাড়া বাগেরহাট থেকে যশোর জেলে নেওয়ার পর আরও হতাশ হয়ে পড়ে। একবার আদালতে হাজিরা দিতে নেওয়ার সময় ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে যায় ভাই। তখন ছোট্ট সন্তানকে কোলে নিতে চেয়েছিল। হাতকড়া পরা থাকায় নিতে পারেনি। তখন পুলিশের পায়ে ধরে আকুতি জানায় যেন সন্তানকে একবারের জন্য কোলে নিতে পারে। পরে এক লোকের মাধ্যমে আমাকে একটি চিঠি পাঠায়। সেখানে অনেক করুণ কথা লেখা ছিল।
 
সাদ্দামের বিরুদ্ধে বর্তমানে ১১টি মামলা আছে। এর মধ্যে দুটি মামলায় তিনি এজাহারভুক্ত। অন্যগুলোতে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে তাঁকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। স্ত্রী ও সন্তান মারা যাওয়ার পর সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির ব্যাপারে চেষ্টা করে তাঁর পরিবার।

সাদ্দামের ভাই শহিদুল ইসলাম বলেন, শুক্রবার বিকেলে আমার মামা প্যারোলের আবেদন নিয়ে বাগেরহাট প্রশাসকের কার্যালয়ে যান। ছুটির দিন থাকায় জেলা অফিস থেকে বলা হয়, ডিসির বাংলাতে গিয়ে যোগাযোগ করতে। এরপর ডিসি বাংলোয় যান মামা। বাংলোতে কর্মরত একজন আমাদের দরখাস্ত নিয়ে ডিসিকে দেন। এরপর বাংলাতে কর্মরত ওই ব্যক্তি বাগেরহাট জেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। আমাদের কেউ বুঝিয়ে বলেনি, কোথায় আবেদন করলে প্যারোলে মুক্তি পাবে আমার ভাই। 

সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন করেছিলেন জানিয়ে তাঁর মামা হেমায়েত হোসেন বলেন, আমি আবেদন করেছিলাম। জেলা প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে, যেহেতু যশোর জেলে, তাই আমাদের প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। পরে বাগেরহাটের জেল সুপারের সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি বলেছেন, আমাদের কোনো সুযোগ নেই, আপনারা যশোরে মরদেহ নিয়ে দেখা করিয়ে আসেন। এরপর তাদের পরামর্শে লাশ নিয়ে শনিবার যশোর কারাগারে যাই। যাওয়ার আগে কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের কথা হয়। তারা বলেছিল, পরে আমরা যশোরে দেখা করিয়েছে। সেখানেও মাত্র চার মিনিট সময় দিয়েছে। 
এ ঘটনায় ‘স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুতে প্যারোলে মুক্তি-সংক্রান্ত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার সঠিক তথ্য শিরোনামে যশোর জেলা প্রশাসকের মিডিয়া সেল একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। সেখানে বলা হয়, বাগেরহাট কারাগার থেকে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর সাদ্দামকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়। তাঁর স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো ধরনের আবেদন করা হয়নি।

যশোরের জেলা প্রশাসক আশেক হাসান বলেন, প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে লিখিত বা মৌখিক কোনো আবেদন পাওয়া যায়নি।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, যেহেতু বন্দি যশোর কারাগারে ছিলেন, প্যারোল দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। আইন অনুযায়ী যে জেলায় বন্দি, সেই জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটই সিদ্ধান্ত দেবেন।

আর কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, মানবিক দিক বিবেচনায় মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে জুয়েলের পরিবারের ছয় সদস্যকে কারা ফটকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়।
সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি নেই বলে জানিয়েছেন সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মো. জান্নাত-উল-ফরহাদ। রোববার দুপুরে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। জান্নাত-উল-ফরহাদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্যারোল সাধারণত কারা কর্তৃপক্ষ দেখে না, প্যারোল বাস্তবায়ন করে কারা কর্তৃপক্ষ। তিনটি পার্টের মধ্যে আমরা একটি পার্ট। মূলত প্যারোল দেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, এটা তাঁর এখতিয়ার। আমাদের কাছে প্যারোলের আদেশ এলে ওই আদেশের একটা অংশ হিসেবে বন্দিকে সংশ্লিষ্ট পুলিশের হাতে হস্তান্তর করি। প্যারোলের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট টাইম দেওয়া থাকে, ওই সময় অতিবাহিত হলে পুলিশ ওই বন্দিকে আবার আমাদের কাছে হস্তান্তর করে।’

যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবিদ আহম্মেদ জানান, নিয়ম অনুযায়ী বন্দি যে কারাগারে আছে, সেই জেলার জেলা প্রশাসকের কাছে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করতে হবে। আমার জানামতে যশোরের জেলা প্রশাসক ও আমাদের কাছে সাদ্দামের স্বজনরা কোনো আবেদন করেননি। তবে স্বজনরা মোবাইল ফোনে আমাকে জানিয়েছিলেন। তাদের বলেছিলাম, প্যারোলে জামিন না হলে কারাফটকে কিছুক্ষণের জন্য দেখা করার সুযোগ রয়েছে। সাধারণত যে কোনো বন্দির স্বজন মারা গেলে; কারাফটকে এলে মানবিক দিক বিবেচনা করে মরদেহ দেখিয়ে দিই।

এ ঘটনায় নিহত স্বর্ণালীর বাবা ও জাতীয় পার্টির জেলা সহসভাপতি মো. রুহুল আমিন হাওলাদার বাদী হয়ে শনিবার বাগেরহাট সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। তিনি বলেন, আমার মেয়ে আত্মহত্যা করলেও নাতিটা কীভাবে মারা গেল? সেটাই বড় প্রশ্ন। পুলিশ তদন্ত করুক, সত্যটা বের হোক– এটাই চাই। বাগেরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুম খান বলেন, মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বর্ণালীর শরীরে বাহ্যিক কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। শিশুটির মস্তিষ্ক ও ফুসফুসে পানি এবং পাকস্থলীতে মায়ের বুকের দুধ পাওয়া গেছে– যা পানিতে ডুবে মৃত্যুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।

হাসপাতালে নেওয়ার আগেই শিশুটির মৃত্যু হয়– জানিয়ে সে সময় জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. সাকিয়া হক বলেন, শুক্রবার দুপুরের দিকে শিশুটিকে হাসপাতালে আনা হয়। তখন সে জীবিত ছিল না। পানিতে ডোবার রোগী এলে আমরা সাধারণত রেসকিউ ব্রিদিং ও সিপিআর দিয়ে চেষ্টা করি। প্রায় ৪৫ মিনিট চেষ্টা করা হয়। শিশুটির মুখ দিয়ে পানি বের হয়, তখনই বোঝা যায় পানিতে ডুবে থাকার ঘটনা। তবে শিশুটি নিজে পড়ে গেছে নাকি কেউ ফেলে দিয়েছে। এটি তদন্ত ছাড়া আমাদের পক্ষে বলা সম্ভব নয়।

ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দামের স্ত্রী-সন্তানকে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে। শনিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে স্বর্ণালীর বাবার বাড়ির কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। সাবেকডাঙ্গা স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে রাত ১১টা ২০ মিনিটে তাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

আজ রোববার সাদ্দামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় লোকজনের ভিড়। বাড়িটি একতলা ভবন। সাদ্দামরা তিন ভাই ও তিন বোন। বাবা একরাম হাওলাদার মারা গেছেন ৫ বছর আগে। বাড়িতে সাদ্দামের মা ও এক বোনের সঙ্গে সন্তান নিয়ে থাকতেন স্বর্ণালী। সাদ্দামের এক ভাই সরকারি চাকরি করেন, আরেক ভাই প্রকৌশলী। তিনি ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।

সাদ্দামের মা দেলোয়ারা একরাম জানান, শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ভাতিজীর বিয়েতে তিনি বাগেরহাট শহরের বগা ক্লিনিক এলাকায় যান। তখন বাড়িতে ছেলের বউ, নাতি, এক মেয়ে ও মেয়ের ছেলে ছিল। কিন্তু একটা ৪৫ মিনিটের পাশের বাড়ি থেকে ফোনে জানানো হয়, তার ছেলের বউ স্বর্ণালী গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এই খবরে দ্রুত ছুটে আসেন তিনি।

সাদ্দামের মা বলেন, ‘আমার খুব শান্তির সংসার, বউ মা ও নাতিকে নিয়ে থাকতাম বাড়িতে। বউমার সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। আমার সংসারে কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু কেন যে এমন করল জানি না।’

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *