■ নাগরিক প্রতিবেদক ■
কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার (৩০ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, শনিবার বিকালে একদল বিক্ষোভকারী মিছিল নিয়ে কাকরাইল মোড় হয়ে জাতীয় পার্টির অফিস পার হওয়ার সময় পুলিশের দিকে ইট-জুতা নিক্ষেপ করতে থাকে। এর কিছুক্ষণ পর তারা সড়কে অগ্নিসংযোগ করে। পরে তারা জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলা করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ করে পুলিশ।
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বিক্ষুব্ধ কয়েকজন নেতা-কর্মী পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে জাতীয় পার্টির কার্যালয় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। কার্যালয়ের পশ্চিম পাশে একটি শাটার আর ভেঙে তারা ভেতরে প্রবেশ করে অগ্নিসংযোগ করে। এরপর পুলিশ জলকামান দিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এর আগে জাতীয় পার্টির কার্যালয় থেকে নেতা-কর্মীরা বের হয়ে যান।
এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে ওই ঘটনার সময় দায়িত্ব পালনকালে ইটের আঘাতে আহত হয়েছেন বাংলাদেশ প্রতিদিন–এর রিপোর্টার নাইমুর রহমান (২৫) ও বাংলানিউজের ফটোসাংবাদিক জিএম মজিবর (৪৫)। তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
ঘটনা সম্পর্কে জাতীয় পার্টির ঢাকা জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক লাইজুল ইসলাম বলেন, ‘যারা দেশব্যাপী মব সৃষ্টি করে, তারাই আজকে জাতীয় পার্টির অফিসে হামলা চালিয়েছে। এই হামলাকারীদের মধ্যে গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীর রয়েছে কিনা জানি না, তবে তাদের আমরা স্লোগান দিতে দেখেছি।’
জাতীয় পার্টির এই নেতা বলেন, ‘শনিবার এই কার্যালয়ে ময়মনসিংহ জেলার প্রতিনিধিদের সম্মেলন ছিল। সম্মেলনের দলটির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটওয়ারী উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর ঢাকা জেলার নেতা–কর্মীরা কার্যালয়ে দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। তবে বিকেলে গণঅধিকার পরিষদের বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং ইসলামি আন্দোলনের বিক্ষোভের পর সন্ধ্যার দিকে পুলিশ কার্যালয় থেকে জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীদের বের করে দেন। এরপরই কার্যালয়টিতে হামলার ঘটনা ঘটে।
জাতীয় পার্টির যুগ্মমহাসচিব জুবের আলম খান গণমাধ্যমকে বলেন, গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন জেলার নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক আলোচনা চলছে। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আজও দুটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনা শেষ হয় বিকেল ৫টায়। এরপর মাগরিবের নামাজ পড়তে যাচ্ছিলেন অনেকে। তখন বিকট শব্দ ও স্লোগান শোনা যায়। এরপর একদল লোক এসে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা চালায়। জুবের আলমের অভিযোগ, তারা গণঅধিকার পরিষদের নেতা–কর্মী।
তবে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সরেজমিনে দেখা গেছে, জাতীয় পার্টির কার্যালয় এলাকার পরিস্থিতি থমথমে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও জায়গাটি ছেড়ে দিয়েছেন। গণঅধিকার পরিষদ এবং ইসলামি আন্দোলনের নেতা-কর্মীরাও বিক্ষোভ সমাবেশ করে চলে গেছে। বর্তমানে জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা অফিসটির সামনে অবস্থান করছেন।
এর আগে কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন জাপা একাংশের মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী। গতকালের ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, মশাল মিছিলের নামে শুক্রবার জাতীয় পার্টির অফিসে আগুন দিতে আসেন বেশ কয়েকজন। ওই সময় আগুনে পুড়ে যাওয়ার হাত থেকে নেতাকর্মীদের রক্ষা করেছে সেনাবাহিনী ও পুলিশ। দেশের মঙ্গলের জন্য সেনাবাহিনীর আরও দৃশ্যমান হওয়া উচিত।
এর আগে, গত বছরের আগস্টে ও নভেম্বরে একই কার্যালয় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল।
প্রসঙ্গত, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ-মহাসড়ক অবরোধ করেছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
এর আগে শুক্রবার (২৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর বিজয়নগরে জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষের পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে মশাল মিছিল করেন গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা।
এরপর বিজয়নগরে দলীয় কার্যালয়ের সামনে গণঅধিকার পরিষদের নেতারা ব্রিফিং করতে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লাঠিপেটা করে বলে দলটির সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান দাবি করেন।
এ হামলায় গুরুতর আহত অবস্থায় গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
জাতীয় পার্টিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিষিদ্ধসহ তিন দাবি গণ অধিকার পরিষদের
জাতীয় পার্টিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিষিদ্ধ করাসহ তিনটি দাবি জানিয়েছে গণ অধিকার পরিষদ। অন্য দাবি দুটি হলো, আজ শনিবারের মধ্যে নুরুল হক নুরের ওপর হামলার ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা এবং গতকালের হামলার ঘটনার দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে পদত্যাগ করতে হবে।
আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর বিজয়নগরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশে দাবিগুলো তুলে ধরেন গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান।
গণ অধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য মাহফুজুর রহমানের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলের চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদ খান, জনতার অধিকার পার্টির সভাপতি তরিকুল ইসলাম, গণ অধিকার পরিষদের মুখপাত্র ফারুক হাসান, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন, এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন, পরিষদের সভাপতি নুরুল হকের ছোট ভাই আমিনুল ইসলাম প্রমুখ।
সমাবেশে বক্তারা জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। এর আগপর্যন্ত রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা বলেন। সমাবেশে নুরুলের ওপর হামলার ঘটনা পরিকল্পিত বলে দাবি করা হয়।
সমাবেশে ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে, ‘নুরের ওপর হামলা কেন, প্রশাসন জবাব দে’, ‘আওয়ামী লীগের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’, ‘জাতীয় পার্টির ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’, ‘ওয়ান টু থ্রি ফোর, জাতীয় পার্টি নো মোর’, ‘জাতীয় পার্টির আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়।
এ সময় রাস্তায় টায়ার পোড়ানো হয়। পরে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি পুরানা পল্টন মোড়, জাতীয় প্রেসক্লাব, মৎস্য ভবন, কাকরাইল মোড়, বিজয়নগর মোড় হয়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হয়।