জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে যৌথবাহিনীর বিশেষ চিরুনি অভিযানে অধরা মূল হোতারা। তারা গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে।

সোমবার (৯ মার্চ) ভোর ৬টা থেকে শুরু হওয়া অভিযান বিকেল পর্যন্ত চলে। ভোরে জঙ্গল সলিমপুরের চারপাশ ঘিরে ফেলে যৌথবাহিনী।

প্রশাসনিক কাঠামোতে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান সীতাকুণ্ড উপজেলার আওতায় হলেও ওই এলাকায় প্রবেশ করতে হয় চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানার বাংলাবাজার এলাকা দিয়ে। বায়েজিদ লিঙ্ক রোড দিয়ে ভাটিয়ারি যাওয়ার পথে ডান দিকে জঙ্গল ছলিমপুর। এলাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে বসানো হয়েছে তল্লাশিচৌকি, যাতে অভিযান শুরুর পর কেউ পালিয়ে যেতে না পারে।

যৌথবাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে অভিযানে অংশ নিয়েছেন। অতীতে এলাকাটিতে অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবারের অভিযানে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশের নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়। এ সময় চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক এবং চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁন সরেজমিনে উপস্থিত থেকে সার্বিক অভিযান তদারকি ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। এছাড়াও ৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করেন।

চট্টগ্রাম জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) রাসেল বলেন, অভিযানে যৌথ বাহিনীর চার হাজার সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪৮৭ জন সদস্য, জেলা পুলিশের ১৪৬ জন সদস্য, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) এর ৮০০ জন সদস্য, আরআরএফ চট্টগ্রামের ৪০০ জন সদস্য, ফেনী জেলা পুলিশের ১০০ জন সদস্য, পার্বত্য জেলার ৩০০ জন সদস্য, এপিবিএন ৩৩০ জন সদস্য, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর ১২২ জন সদস্য এবং র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) এর ৩৭১ জন সদস্যসহ সর্বমোট ৩ হাজার ১৮৩ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য অংশগ্রহণ করেন।

এছাড়াও অভিযানকে কার্যকর ও নিরাপদভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে ৩টি হেলিকপ্টার, ১৫টি এপিসি, র‌্যাব ও সিএমপির তিনটি ডগ স্কোয়াড এবং ১২টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষ কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।

অভিযানে যৌথবাহিনীর সদস্যরা জঙ্গল সলিমপুর এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ি ও দুর্গম স্থানে একযোগে অবস্থান গ্রহণ করে চিরুনি তল্লাশি শুরু করেন। সন্দেহভাজন আস্তানা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি, পাহাড়ি পথ, গোপন স্থাপনা এবং অপরাধীদের সম্ভাব্য অবস্থানসমূহে তল্লাশি চালানো হয়।

এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে মোট ১২ জনকে আটক করেন। তল্লাশিকালে আগ্নেয়াস্ত্র ২টি (পিস্তল ০১টি ও এলজি ০১টি), কার্তুজ ৪টি, ককটেল (বিস্ফোরক) ১১টি, দেশীয় অস্ত্র ১৭টি, সিসি ক্যামেরা ১৯টি, ডিভিআর ২টি, পাওয়ার বক্স ১টি ও ২টি বাইনোকুলার উদ্ধার করা হয়।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জঙ্গল সলিমপুরে দুপক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হন। একই ঘটনায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে, যা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বেপরোয়া আচরণের প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়। গত জানুয়ারিতে অভিযান চালানোর সময় র‍্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন।

এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় মোহাম্মদ ইয়াসিনকে প্রধান আসামি করা হয় এবং আরও ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০০ জনকে আসামি করা হয়।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, র‍্যাব সদস্যরা আসামি ধরতে গেলে তাদের ওপর ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালানো হয়, একটি আসামি ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং চার র‍্যাব সদস্যকে অপহরণ করা হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাদের উদ্ধার করে।

সোমবার ভোরে শুরু হওয়া অভিযানের সময় পাহাড়ি অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। কোথাও রাস্তার ওপর ট্রাক রাখা হয়েছে, কোথাও কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়েছে, নালার স্ল্যাবও তুলে ফেলা হয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে ধাপে ধাপে অভিযান অগ্রসর হয়।

পাহাড় ঘেরা এই অঞ্চলটি ছিল ইয়াসিন ও রোকন বাহিনীর মুক্ত সাম্রাজ্য। এখানে তাদের কথায় ছিল আইন। এখানকার শত শত পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে ঘর-বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে এতদিন বাইরের কেউ ঢুকতে পারতেন না। এমন কি আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরাও। হামলার মুখে পড়ছিল প্রশাসনের লোকজনও। সর্বশেষ ১৯ জানুয়ারি অভিযানে এক র‌্যাব সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতিতে পুরোপুরি ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে এবার। আগে মোড়ে মোড়ে কোলাহল থাকলেও আজ ছিল সুনশান নীরবতা, আতঙ্ক আর উদ্বেগ।

সোমবার তিন হাজার ২০০ সদস্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে যৌথ বাহিনী সেখানে অভিযানে অংশ নেয়। বিকেল পর্যন্ত ২৫ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেলেও মূলহোতা ইয়াছিন কিংবা রোকনের হদিস পায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে র‌্যাব কর্মকর্তারা। সরকারি পাহাড় কেটে এখানে সাম্রাজ্য গড়ে উঠলেও নাগরিক সব সুযোগ-সুবিধা আছে এখানে। বিদ্যুতের লাইন আছে। পানির জন্য আছে ডিপ টিউবেল। কালভার্ট, ব্রিজ ও ড্রেনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তুলেছে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা। এতে নিম্ন আয়ের লোকজন এখানে কম ভাড়ায় বসবাসে উৎসাহী হয়ে উঠেছেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেপরোয়াভাবে পাহাড় কেটে হাজার হাজার প্লট তৈরি করে বিক্রি করেছেন সন্ত্রাসী বাহিনী।  

সরেজমিন নগরের বায়েজিদ আরেফিন নগর থেকে যে সড়কটি জঙ্গল সলিমপুরে ঢুকেছে সেটি দিয়ে প্রবেশ করে দেখা যায়, আরসিসি ঢালাইয়ের সড়ক। যেটি প্রায় এক কিলোমিটার গিয়ে শেষ হয়েছে। আগে এই প্রবেশ মুখ থেকে ঢুকতে চাইলে ইয়াছিন ও রোকন বাহিনীর জেরার মুখে পড়তে হতো। দেখাতে হতো পরিচয়পত্র। তা না থাকলে ফিরিয়ে দেওয়া হতো। আধা কিলোমিটার গেলেই একটি বাজার। এখানে একটি চারতলা বিদ্যালয় রয়েছে। নাম এসএম পাইলট প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়। পাশেই বাজার। এখানে সীতাকুণ্ড থানার অস্থায়ী একটি ক্যাম্প রয়েছে। 

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এখানে পুলিশ সদস্যরা থাকলেও তাদের কোনো কাজ ছিল না। এখানে ইয়াছিন ও তাদের লোকজন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। স্থানীয় পাঁচজনের সঙ্গে কথা হলেও তারা কেউ নাম বলতে রাজি হননি।

বাজারে বিএনপির একটি কার্যালয়। ১৯ জানুয়ারি এই কার্যালয় উদ্বোধনের দিন বাহিনী প্রধান ইয়াছিনকে গ্রেফতার করতে অভিযান চালায় র‌্যাব। এই সময় র‌্যাব-৭ এর গোয়েন্দা টিমের প্রধান নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াসহ চারজনকে ধরে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। এরপর তাদের পেটানো হয়। মোতালেব হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

শহীদুল ইসলাম নামে স্থানীয় এক যুবক জানান, এই কার্যালয়ে থেকে ওইদিন ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল।

বাজার পার হলেই মাটির প্রশস্ত সড়ক। যেটি পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে। দুইপাশে উঁচু পাহাড়ে বসতি। এক কিলোমিটার যাওয়ার পর লোহারপুল এলাকায় মিলেছে আরেকটি বাজার। এই বাজারের একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। ব্রিজের পাশে বিদ্যুতের পোলে লাগানো দুইটি সিসিটিভি ক্যামেরা। যেগুলো অপসারণ করছে পুলিশ। 

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *