■ সাহিত্য ডেস্ক ■
পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত সাহিত্যিক ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসের স্রষ্টা শংকর মারা গেছেন। শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) বেলা পৌনে ১টার দিকে কলকাতার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর।
লেখক শংকরের আসল নাম মণিশংকর মুখোপাধ্যায়।
বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় বেশ কিছুদিন ধরেই ভুগছিলেন এই বর্ষীয়ান লেখক। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে অবস্থার অবনতি হলে ৪ ফেব্রুয়ারি তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসক সুদীপ্ত মিত্র জানান, শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ করে শুক্রবার দুপুরে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। এর আগে গত ডিসেম্বর মাসে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় তাঁর। অস্ত্রোপচারের পর কিছুটা সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলেও শারীরিক অবস্থা আর স্বাভাবিক হয়নি।
১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর বর্তমান বাংলাদেশের যশোর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন শংকর। পরে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা। ‘কত অজানারে’ উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি পাঠকমহলে ব্যাপক পরিচিতি পান। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘চৌরঙ্গী’ অবলম্বনে নির্মিত ১৯৬৮ সালের চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার। এছাড়া ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জন অরণ্য’ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সত্যজিৎ রায়।
শংকরের প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
সাহিত্যিকের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘এক্স হ্যান্ডলে’ শোকপ্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী লেখেন, ‘বাংলার প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণি শঙ্কর মুখোপাধ্যায় (শংকর)-এর প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হল। ‘চৌরঙ্গী’ থেকে ‘কত অজানারে’, ‘সীমাবদ্ধ’ থেকে ‘জনঅরণ্য’—তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করেছে। তাঁর লেখনীর আধারে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের না-বলা কথা। বিশেষ করে স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর সুগভীর গবেষণা ও গ্রন্থসমূহ আমাদের কাছে অমূল্য সম্পদ। তাঁর প্রয়াণ আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমি তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও অগণিত গুণগ্রাহীকে আমার আন্তরিক সমবেদনা জানাই।’
শংকরের জন্ম অবিভক্ত যশোর জেলার বনগ্রামে বা বনগাঁয় ১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর। বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন নামী আইনজীবী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই শংকরের পরিবার এসেছিল কলকাতায়। তাঁর শৈশব কেটেছে কলকাতার পাশের হাওড়ায়।
প্রখ্যাত এই সাহিত্যিক বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। আক্রান্ত হয়েছিলেন ব্রেন টিউমারে। গত ডিসেম্বর মাসে বাড়িতে পড়ে গিয়ে কোমরে চোট পেয়ে হাড় ভেঙে যায়। এরপর চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু দিন ১৫ আগে তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে নেওয়া হয় কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ দুপুরে শেষবিদায় নেন তিনি।
শংকরের কালজয়ী উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ হলো চৌরঙ্গী, সীমাবদ্ধ, জনঅরণ্য, কত অজানারে, চরণ ছুঁয়ে যাই, বিবেকানন্দ, অচেনা অজানা, দ্বিতীয় পুরুষ, মণিহার, পিকলুর কলকাতা ভ্রমণ ইত্যাদি। চৌরঙ্গী, সীমাবদ্ধ ও জনঅরণ্য নিয়ে চলচ্চিত্র হয়েছে। তিনি কলকাতার শেরিফ ছিলেন। করেছেন সরকারি চাকরিও।
শংকরের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে কলকাতার শিল্প–সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে।
মৃত্যুর আগে শংকর শেষ ইচ্ছার কথা জানিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর মরদেহ নিয়ে যেন কোনো শোক মিছিল না হয়, সেটি ছিল তাঁর ইচ্ছা। হাসপাতাল থেকে তাঁর মরদেহ যেন সোজা কেওড়াতলা মহাশ্মশানে নিয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়, সে ইচ্ছার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
শংকর থাকতেন কলকাতার বালিগঞ্জের বন্ডেল রোডে। শংকরের স্ত্রী অনেক আগেই প্রয়াত হয়েছেন। এ দম্পতির দুই মেয়ে আছে, দুজনই বিদেশে থাকেন।
মণিশংকর মুখোপাধ্যায়, আপামর পাঠকদের কাছে তিনি শংকর নামেই পরিচিত। তাঁর কলমেই সৃষ্ট হয়েছে স্যাটা বোস, মার্কো পোলো, মিসেস পাকড়াশি, সুজাতা মিত্ররা। শংকরের জন্ম বাংলাদেশের যশোরে হলেও বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগেই চলে আসেন পশ্চিম বাংলার হাওড়ায়। এই শহরেই বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা এবং লেখালেখির শুরু। যুবকবয়স খুব একটা সুখের ছিল না। আজীবন লিখতে চাওয়া এই মানুষটি কখনও ফেরি করেছেন, টাইপরাইটার ক্লিনারের কাজ করেছেন, প্রাইভেট টিউশানি করেছেন, আবার কখনও জুট ব্রোকারের কেরানিগিরিও করেছেন। তারপরেই শংকরের সঙ্গে আলাপ হয় এক ইংরেজের। যাঁর অনুপ্রেরণায় শুরু করেন লেখালেখি।
চৌরঙ্গী (১৯৬৮)
আজীবন লিখতে চাওয়া এই মানুষটি কখনও ফেরি করেছেন, টাইপরাইটার ক্লিনারের কাজ করেছেন, প্রাইভেট টিউশানি করেছেন, আবার কখনও জুট ব্রোকারের কেরানিগিরিও করেছেন। তারপরেই শংকরের সঙ্গে আলাপ হয় এক ইংরেজের। যাঁর অনুপ্রেরণায় শুরু করেন লেখালেখি।
শংকরকে আমরা আজীবন মনে রাখব ‘জন অরণ্য’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘কত অজানারে’, ‘স্থানীয় সংবাদ’, কিংবা ‘চৌরঙ্গী’র জন্য। ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসের জন্য তিনি অমর। এখনও এই শহরে স্যাটা বোস যে কোনো তরুণের কাছেই বড়দার মতো। যাকে ঘিরে বা যার সঙ্গে মিশে সারাটা জীবন বাঁচা যায়। সেই স্বপ্নের চরিত্রকে কীভাবে খুঁজে পেলেন শংকর? এক সাক্ষাৎকারে সেই প্রসঙ্গে নিজেই জানাচ্ছেন, “ইস্টার্ন রেলওয়েতে এক ভদ্রলোক ছিলেন। তাঁর নাম ছিল সত্যসুন্দর বসু। আমি তখন ওখানে চাকরি করি। তিনি সাহেবদের সঙ্গে খুব মিশতেন। স্কাউটিং করতেন। স্মার্ট লোক ছিলেন। কায়দা করে ইংরেজি বলতেন। সব সময় বলতেন আমার নাম স্যাটা বোস। খুব পপ্যুলার ফিগার ছিলেন। আমি অবশ্য দূর থেকে দেখেছি। অতটা আলাপ ছিল না। আবার স্পেনসেস হোটেলে একজনকে পেয়েছিলাম, যিনি পরে গ্রেট ইস্টার্নে চলে যান। তাঁর মধ্যে একটা অভিভাবক সুলভ ব্যাপার ছিল। তাঁরও ধারণা ছিল ওঁকে ভিত্তি করে লিখেছি।”
সীমাবদ্ধ (১৯৭১)
‘চৌরঙ্গী’র প্রেক্ষাপট ১৯৫০ সালের কলকাতা। উপন্যাসের কথক একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবক। এক ইংরেজ ব্যারিস্টারের কাছে সচিবের চাকরি করত। কিন্তু সেই ব্যারিস্টারের অকালমৃত্যুর পর সে বেকার হয়ে পড়ে।
আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই হয়তো স্যাটা বোসেরা আছেন তাঁদের নিজস্ব ভঙ্গিমায়। ‘চৌরঙ্গী’র প্রেক্ষাপট ১৯৫০ সালের কলকাতা। উপন্যাসের কথক একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবক। এক ইংরেজ ব্যারিস্টারের কাছে সচিবের চাকরি করত। কিন্তু সেই ব্যারিস্টারের অকালমৃত্যুর পর সে বেকার হয়ে পড়ে। দরজায় দরজায় ঘুরে নিউজপেপার বিক্রির পেশা গ্রহণ করতে হয়। একদিন বন্ধু বায়রন শহরের সবচেয়ে পুরোনো ও খ্যাতনামা হোটেল শাহজাহানে একটি কাজ জোগাড় করে দেয়। সেই হোটেলের চিফ রিসেপশনিস্ট স্যাটা বোস। কিছুদিন টাইপিস্টের কাজ করার পর সে স্যাটা বোসের প্রধান অ্যাসিস্ট্যান্ট হয় এবং হয়ে ওঠে স্যাটা বোসের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তি। কলকাতার উচ্চবিত্ত সমাজের খানিক কুৎসিত একটি দিক তুলে ধরেন শংকর। সমাজের লোভ, অপকর্ম ও লজ্জাজনক ব্যবহার প্রথম দিকে সেই যুবককে অবাক করেছিল। অচিরেই এই সবে সে ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে উঠল। আর উপন্যাসের কেন্দ্রে রইল প্রেম। ১৯৬৮ সালে পরিচালক পিনাকী ভূষণ মুখোপাধ্যায় চলচ্চিত্রের আকার দেন এই উপন্যাসটিকে। সেখানে অভিনয় করেন উত্তমকুমার, সুপ্রিয়াদেবী, অঞ্জনা ভৌমিক, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।
জন অরণ্য (১৯৭৬)
‘চৌরঙ্গী’ প্রসঙ্গে শংকর বলেছেন, “প্রথম দিন থেকেই শক্তিমানদের নাক-উঁচু ঘেন্না। প্রথম দিন থেকেই সমালোচনা যে রেস্টুরেন্ট আর রেস্তোরাঁর তফাৎ বোঝে না, সে লিখেছে হোটেল নিয়ে বই। এক নামী লেখিকা ‘দেশ’-এর সম্পাদককে চিঠি পাঠালেন ‘অশিক্ষিতের উপন্যাস’ অভিযোগ করে। বললেন, যে লোকটা ‘ব্রেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট’-এর সঙ্গে ‘বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট’-কে গুলিয়ে ফেলতে পারে সে লিখেছে হোটেল নিয়ে বই। পাঠকরা যেমন ঢেলে দিয়েছেন, সমালোচকেরাও তেমনই ঢেলে আক্রমণ করে গেছেন। মানুষ বলে কেউ মনে করেনি। কোনও পুরস্কার দেয়নি। ভুল বললাম। একটা পুরস্কার ‘চৌরঙ্গী’ পেয়েছিল। শ্রেষ্ঠ বাইন্ডিং-য়ের জন্য।”
শংকরের দুটি গল্প নিয়ে কাজ করেছেন পরিচালক সত্যজিৎ রায় – ‘সীমাবদ্ধ’ (১৯৭১) এবং ‘জন অরণ্য’ (১৯৭৬) [কলকাতা ত্রয়ীর অন্যতম দুটি ছবি। যেখানে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসাবে ‘সীমাবদ্ধ’ পেয়েছিল জাতীয় পুরস্কার।] শংকর এখনও যে কথাটি বিভিন্ন জায়গায় বলে থাকেন, সেটা হল সত্যজিৎবাবুই তাঁকে সকলের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে।
শংকর লিখিত চৌরঙ্গী উপন্যাস (দে’জ পাবলিকেশন)
এই এতকিছুর পরেও শংকর ঝেড়ে ফেলতে পারেননি ‘ওয়ান বুক অথার’-এর তকমা। অন্যান্য সাধারণ মানুষরা মৃত্যুর পর মরে যান, কিন্তু লেখক-শিল্পীদের মরণ নেই। সমস্ত বিতর্ক উস্কে শংকর বাঙালি পাঠক সমাজে থেকে যাবেন ‘বেস্টসেলার’ হয়ে। শংকর বলেন, “মৃত্যুর পর পাঁচটা বছর আমার পরীক্ষা”। …সংসারে যে যত বেশি থাকবে, যে যত বেশি দেরি করবে তাকে তত বেশি বিল মিটিয়ে যেতে হবে।”
