ঘুষের টাকা ফেরত চাওয়ায় মা-মেয়েকে কারাদণ্ড

■ কক্সবাজার প্রতিনিধি ■ 

কক্সবাজারের পেকুয়ায় বিচারপ্রার্থী এক কলেজশিক্ষার্থী ও তার মাকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম। পেকুয়া থানা পুলিশের কাছে ঘুষের টাকা ফেরত চাওয়ায় মা-মেয়ে এমন শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে এবং যা নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। 

কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন-পেকুয়া উপজেলার সাবেক গুলদি এলাকার মৃত নুরুল আবছারের স্ত্রী রেহেনা মোস্তফা রানু (৩৮) ও তার মেয়ে কলেজশিক্ষার্থী জুবাইদা জান্নাত (২৩)।

ভুক্তভোগীদের পরিবার জানিয়েছে, জমি সংক্রান্ত একটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন নিজেদের পক্ষে পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পেকুয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) পল্লব ওই পরিবারের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। একপর্যায়ে ভয়ভীতি ও নানা অজুহাত দেখিয়ে টাকা আদায় করলেও পল্লব সেই প্রতিবেদন প্রতিপক্ষের পক্ষে জমা দেন।

গত বুধবার (৪ মার্চ) বিকেলে এ ব্যাপারে কথা বলতে গেলে এসআই পল্লব ক্ষিপ্ত হয়ে মা-মেয়েকে থানা কম্পাউন্ডে মারধর করেন এবং আটকে রাখেন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জুবাইদার প্রতিবেশী মনজিলা বেগম বলেন, ‘আমি তাদের সাথে থানায় গিয়েছিলাম, এসআই পল্লবের কাছে জুবাইদা টাকা ফেরত চাইলে তিনি চড়াও হয়ে তেড়ে যান। পরে পুলিশ সদস্যরা জুবাইদা ও তার মাকে আটকে রাখেন এবং সেখানে উপস্থিত আমাদের কয়েকজনকে চলে যেতে বলেন।’

এমন পরিস্থিতিতে কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশের তথ্যে থানায় আসেন ইউএনও মাহবুব আলম। স্বজনেরা অভিযোগ করেন, ‘ঘুষ লেনদেনের ফলে পল্লবের সাথে তৈরি হওয়া বিরোধের কারণ বর্ণনা করলেও ইউএনও তা আমলে না নিয়ে উলটো ভুক্তভোগীদেরকে বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর হামলার মিথ্যা অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা শুনিয়ে কারগারে পাঠানোর আদেশ দেন।’

ভুক্তভোগী জুবাইদার ছোট ভাই রুবেল বলেন, ‘আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে মামলা চলছে। এসআই পল্লব নানাভাবে হয়রানি করে আসছিল। ন্যায়বিচারের পরিবর্তে আমার মা ও বোনকে দোষী বানিয়েছেন ইউএনও। ওসি-এসআই পল্লবের যোগসাজশে তিনি এমন অন্যায় করেছেন।’

রেহেনা মোস্তফা রানুর বোন আমেনা মুন্নী (জুবাইদার খালা) বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে আমার বোন ও বোনের মেয়েকে ফাঁসানো হয়েছে, আমরা অবিলম্বে তাদের মুক্তি চাই।’

ইউএনও মাহবুব আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘থানায় সরকারি কাজে বাধা এবং এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনায় তাদের সাজা দেওয়া হয়েছে। ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি তদন্তে বেরিয়ে আসবে। খারাপ আচরণের কারণে তাৎক্ষণিক এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

প্রসঙ্গত, পেকুয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নিজের এলাকা। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা তদন্ত করে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে অবিলম্বে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি চেয়েছেন স্থানীয়রা।

শৈশব থেকে উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ

জানা গেছে, জুবাইদা জন্নাতের বয়স তখন এক বছরের কাছাকাছি, এমন সময় তাঁর বাবা নুরুল আবছার ও মা রেহেনা মোস্তফা রানুর মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। অভিযোগ আছে, যৌতুক দাবিকে কেন্দ্র করে নির্যাতনের জেরে এ বিচ্ছেদ হয়। বিচ্ছেদের পর মা জুবাইদাকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে যান। পরে নুরুল আবছার দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করেন। অন্যদিকে রেহেনা মোস্তফা রানুও নতুন সংসার গড়েন। সেই সংসারে জন্ম নেয় তাঁর ছেলে রুবেল। তবে দুই সন্তানকে পড়ালেখা করাতে সংগ্রাম চালিয়ে যান তিনি।

২০১৩ সালের ২৩মে জুবাইদার বাবা নুরুল আবছারের মৃত্যু হলে উত্তরাধিকার সূত্রে তাঁর স্থাবর সম্পত্তিতে দাবি ওঠে জুবাইদার। কিন্তু অভিযোগ আছে, জুবাইদার চাচারা তাঁকে উত্তরাধিকার হিসেবে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান। তখন পৈতৃক সম্পত্তির অধিকার পেতে আইনি লড়াই শুরু করেন জুবাইদা ও তাঁর মা।

ওয়ারিশ সনদ না পাওয়া ও মামলা

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদ সাধারণত নিজ নিজ ইউনিয়নের বাসিন্দাদের ওয়ারিশ সনদ দিয়ে থাকে। জুবাইদা পেকুয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে ওয়ারিশ সনদের আবেদন করেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার পরও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাঁকে সনদ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। জুবাইদার দাবি, স্থানীয় নারী সদস্য বিজু, যিনি সম্পর্কে তাঁর ফুফু, এ ক্ষেত্রে প্রভাব খাটিয়েছেন।

পরে সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য চকরিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা করেন জুবাইদা। আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডকে নির্দেশ দেন। কিন্তু এক বছরেও তদন্ত প্রতিবেদন না আসায় জুবাইদা আদালতে আবেদন করে তদন্তভার এসিল্যান্ডের কাছ থেকে প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। আদালত পরে পেকুয়া থানাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন।

তদন্তে ঘুষের অভিযোগ

পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খাইরুল আলম তদন্তের দায়িত্ব দেন থানার এসআই পল্লবকে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন দিতে ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন তিনি। পরে জুবাইদার খালা নিজের স্বর্ণের আংটি বন্ধক রেখে ওই টাকা জোগাড় করেন এবং তা দেওয়া হয়। কিন্তু এরপরও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জুবাইদার বিপক্ষে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মনজিলা বেগম বলেন, তিনি জুবাইদা ও তাঁর মায়ের সঙ্গে মামলার তদন্তের বিষয়ে পেকুয়া থানায় গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি শুনেছেন, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন পক্ষে দেওয়ার কথা বলে এসআই পল্লব বাদী জুবাইদার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়েছেন। কিন্তু পরে বিপক্ষে প্রতিবেদন দেওয়ায় জুবাইদা টাকা ফেরত চাইলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে পুলিশ মা–মেয়েকে মারধর করে থানার গেটে নিয়ে যায় এবং সেখানে থাকা সেবাপ্রার্থীদের বের করে দেওয়া হয়। পরে ইউএনও এসে তাঁদের এক মাসের সাজা দেন।

পরিবারের অভিযোগ

ঘটনার খবর পেয়ে জুবাইদার ছোট ভাই রুবেল ও তাঁর খালা আমেনা মুন্নী থানায় গেলেও প্রথমে তাঁদের কাছে মা–মেয়ের বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। রুবেল বলেন, তাঁর বোনের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পর বিপক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। পরে টাকা ফেরত চাইলে তাঁদের ওপর নির্যাতন করে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দুইজন নারী থানায় গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা করার অভিযোগ কতটা যুক্তিযুক্ত। তাঁর দাবি, এ ঘটনার সঠিক বিচার হওয়া প্রয়োজন।

প্রশাসনের বক্তব্য

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব আলম বলেন, থানায় একটি ঘটনার সূত্র ধরে তিনি সেখানে যান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, থানায় গিয়ে দেখা যায় সরকারি কাজে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। সে কারণেই তদন্ত করে তাঁদের সাজা দেওয়া হয়েছে।

এসআই পল্লবের সঙ্গে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, বিষয়টি পরবর্তী তদন্তে বেরিয়ে আসবে। তিনি জানান, খারাপ আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার বিষয়ে জানতে এসআই পল্লবের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খাইরুল আলম বলেন, থানায় এসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসআই পল্লবের সঙ্গে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ থেকে ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *