মুসাব্বির হত্যা: সিসিটিভি ফুটেজে ২ জনের মুখ

■ নাগরিক প্রতিবেদক ■

ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দুইজনের মুখ প্রকাশ্যে এসেছে। ঘটনাস্থলের সিসি টিভি ক্যামেরায় ধরা পড়া দৃশ্যে দুইজনের চেহারা চিহ্নিত হয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক কারণকে সামনে রেখে তদন্ত শুরুর কথা জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। কারওরান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক অস্থিরতার সঙ্গে এই ঘটনার যোগসূত্র আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার রাতে স্টার কাবাব হোটেলের দ্বিতীয়তলা থেকে আলোচনা শেষ করে সিটি হোন্ডা সার্ভিস পয়েন্টের সামনে দিয়ে গলির দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন মুসাব্বির ও মাসুদ। তাদের পেছন পেছন আরও দুই ব্যক্তি যাচ্ছে। সামনের রাস্তায় বসে আছে আরও কয়েকজন যুবক। মুসাব্বির ও মাসুদ ওই রাস্তা দিয়ে সামনে এগুতেই দুই যুবক গলির মধ্যে থেকে হঠাৎ এসে মুসাব্বিরকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। একটি গুলি লাগে মুসাব্বিরের ডান হাতের কনুইয়ের নিচে, আরেকটি তার পেটের ডান পাশে। গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়েন তিনি। ওই সময় মাসুদ তাকে রক্ষা করতে গেলে তাকেও লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। এলোপাতারি গুলির শব্দ শুনে ওই সময় রাস্তাটি দিয়ে চলাচলকারীর এদিক-ওদিকে দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। ওই দুই শুটার কোমরে পিস্তল গুঁজতে গুঁজতে হেঁটে মেইন রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যায়।

মাসুদ আলম নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, আমরা ঠিক হোন্ডা শেরুমের সামনে ছিলাম। ঘটনার কিছু সময় আগে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কারওরান বাজারের ব্যবসায়ীদের একটা মিছিল যায় স্টার হোটেলের সামনে দিয়ে। মুসাব্বির স্টার কাবাব থেকে বের হয়ে গলির মধ্যে ঢুকার পরই গুলির শব্দ। প্রথমে আমরা মনে করেছি কোনো গাড়ির চাকা ব্লাস্ট হয়েছে, কিন্তু যখন এক এক করে ৫ বার শব্দ হলো তখন বুঝলাম গুলি। দৌড়ে গিয়ে দেখি কারা যেন গুলি করে চলে যাচ্ছে। অস্ত্রের ভয়ে আমরা কেউ প্রথমে এগুতে সাহস পাইনি। তবে তারা শুধু দু’জনই ছিল না। তাদের সঙ্গে আরও লোক ছিল। কেউ কেউ পেছনের গলি দিয়ে চলে গেছে, আর দু’জন এই মেইন রাস্তার দিকে এসেছে। 

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, নিহত মুসাব্বির ছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি’র সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরবের অনুসারী। তিনি আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এই এলাকা থেকে কাউন্সিলর নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। আলোচনায়ও ছিলেন। এটাই কাল হয়েছে তার। 

এদিকে গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে মুসাব্বিরের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে তার পরিবারের কাছে হস্থান্তর করা হয়। ময়নাতদন্তকারী ঢামেক মর্গের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. আয়শা পারভীন উল্লেখ করেছেন, পেটের ডান পাশে আধাইঞ্চি পরিমাণ ছিদ্র। ডান হাতের কনুইয়ের পেছনে একটা ছিদ্র। বাম পায়ের হাঁটুতে জখম ছিল। 

স্বামীর লাশ বুঝে নিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আসা নিহত মুসাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম জানান, তারা বসুন্ধরা সিটির পেছনে ১৬/সি, গার্ডেন ভিউ ভবনে থাকেন। তাদের ২ মেয়ে ও ১ ছেলে রয়েছে।  সুরাইয়া বেগম বলেন, প্রতিদিন মুসাব্বির বিকালে বাসা থেকে বের হতেন, আবার রাতে ফিরতেন। বুধবারও সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার আগে বলেছিলেন, ‘তুমি একটা কফি বানিয়ে দাও, আমি নামাজ পড়ে বের হবো।’ এটাই ছিল তার সঙ্গে আমার শেষ কথা। প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি পানির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর অন্যদের দিয়েই ওই ব্যবসা পরিচালনা করতেন।

তিনি বলেন, কয়েকদিন আগেই আমাকে বলেছিল, আমার বহিষ্কার আদেশ খুব শিগগিরই উঠে যাবে। সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। তবে কিছু শত্রুও তৈরি হয়ছে বলে জানিয়েছিলেন। তাই সব সময় কাউকে না কাউকে সঙ্গে নিয়ে চলতেন। কিন্তু সেই হামলা হলোই। আর  প্রথম হামলাতেই সব শেষ। তিনি হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচার দাবি করেন। ময়নাতদন্ত শেষে নয়া পল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে এবং কাওরান বাজার আম্বরশাহ্ জামে মসজিদের সামনে জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে  মুসাব্বিরের লাশ দাফন করা হয়। 

মুসাব্বিরের স্ত্রী আরও বলেন, ২০ বছর ধরে পানির ব্যবসা করে আসছিলেন মুসাব্বির। প্রথমে সরাসরি জড়িত থাকলেও রাজনীতিতে প্রবেশ করার পর লোক দিয়ে এই ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। ব্যবসা নিয়ে কোনো ঝামেলা থাকার কথা না।

গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাত সোয়া ৮টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে কারওয়ান বাজারের স্টার কাবাবের পেছনের গলিতে আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

সিসিটিভিতে দেখা গেছে হত্যাকাণ্ডের পুরো দৃশ্য। এতে দেখা যায়, স্টার কাবাবের পেছনের গলিতে বস্তা নিয়ে বসে ছিল দুই দুর্বৃত্ত, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুসাব্বিরকে দেখামাত্র বস্তা থেকে পিস্তল বের করে পেছন থেকে গুলি করে তারা। এতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। আবার উঠে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন মুসাব্বির। এ সময় মুসাব্বিরের ফোন পড়ে যায়। শুটাররা সেই ফোন নিয়েই পালিয়ে যায়।

এছাড়া মুসাব্বিরের সঙ্গে থাকা আবু সুফিয়ান মাসুদ নামে আরও একজন গুলিবিদ্ধ হন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান  বলেন, মুসাব্বিরের শরীরে দুইটি গুলি লাগে। তার সঙ্গে থাকা আবু সুফিয়ান মাসুদের শরীরে লাগে একটি গুলি। ঘটনাস্থল থেকে আলামত হিসেবে ৭.৬৫ বুলেটের তিনটি খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার পর আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ এখন পর্যন্ত দুজন দুর্বৃত্তকে দৌড়ে পালাতে দেখেছে। আরও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ওই দুজনকে শনাক্তে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যেই তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারবো। 

একাধিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, বুধবার রাতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ফারুক ও আবদুল মজিদ মিলন নামে দুই ব্যক্তিকে ডিবি হেফাজতে নেয়া হয়। এই কিলিং মিশনে ৫ থেকে ৬ জন অংশ নিয়েছিল। এদিকে তদন্তকারী সংস্থাগুলো রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও চাঁদাবাজিসহ কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। পুলিশ ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দুই জনের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে। সেখানে একজনের চেহারা কিছুটা বোঝা যাচ্ছে। ডিসি ইবনে মিজান বলেন, তাকে শনাক্ত করতে পারলেই হত্যার তদন্তে অনেকটা অগ্রগতি হবে। ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে থানা পুলিশ ছাড়াও গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাব সমন্বয় করে কাজ করছে। 

মুসাব্বির হত্যা নিয়ে মির্জা ফখরুলের প্রতিক্রিয়া

স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে, এমন মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) বিকেলে এক শোক বার্তায় এ প্রতিক্রিয়া জানান তিনি। দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা সংঘটিত অমানবিক ও নৃশংস এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল।

শোক বার্তায় বিএনপি মহাসচিব বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর পতনের পর দুস্কৃতিকারিরা আবারও দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিসহ নৈরাজ্যের মাধ্যমে ফায়দা হাসিলের অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে। দুষ্কৃতকারীদের নির্মম ও পৈশাচিক হামলায় ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বির নিহতের ঘটনা সেই অপতৎপরতারই নির্মম বহিঃপ্রকাশ।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এ ধরনের লোমহর্ষক ঘটনার বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হচ্ছে। তাই এসব দুষ্কৃতকারীকে কঠোর হাতে দমনের বিকল্প নেই।

সতর্ক করে মির্জা ফখরুল বলেন, গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ দেশের মানুষের জানমাল রক্ষায় দল-মত-নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। না হলে ওত পেতে থাকা আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের দোসররা মাথাচাড়া দিয়ে দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন করতে মরিয়া হয়ে উঠবে।

বিবৃতিতে আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে হত্যাকারী দুষ্কৃতকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানান বিএনপি মহাসচিব। একই সঙ্গে নিহতের রুহের মাগফিরাত কামনাসহ শোকার্ত পরিবার-পরিজনদের প্রতি গভীর সহমর্মিতা জ্ঞাপন করেন।

শনিবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি স্বেচ্ছাসেবক দলের

ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বিরের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কার্যালয়ের সামনে মুসাব্বিরের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজার নামাজের আগে মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবিতে আগামী শনিবার (১০ জানুয়ারি) ঢাকাসহ সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দল।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *