মিয়ানমারে ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়াল

■ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ■

ভয়াবহ ভূমিকম্পে মিয়ানমারে মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে এক হাজার ছাড়িয়েছে। গতকাল উদ্ধার তৎপরতা শুরুর পর রাজধানী নেইপিদো, মান্দালয়, সাগাইংসহ বিভিন্ন শহর-গ্রামের ধ্বংসস্তূপ থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে ২ হাজার ৩৭৬ জনকে। এছাড়া ৩০ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্যমতে, গতকাল স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এর কেন্দ্র ছিল মিয়ানমারের দ্বিতীয় বড় শহর মান্দালয় থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পের ১২ মিনিট পর ৬ দশমিক ৪ মাত্রার একটি পরাঘাত (আফটার শক) হয়।

এই ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়েছে মিয়ানমারের প্রতিবেশী থাইল্যান্ড, দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশেও।  এই ৭ দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে থাইল্যান্ডের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। রাজধানী ব্যাংককে কয়েকটি বহুতল ভবন ধসে পড়ায় এখনও নিখোঁজ আছেন শতাধিক মানুষ। এছাড়া দেশটিতে এ পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে ১০ জনের দেহ। এরা সবাই ভূমিকম্পে ভবন ধসে মারা গেছেন।

ভূমিকম্প বিধ্বস্ত নেইপিদো, সাগাইং, মান্দালয়, ম্যাগওয়ে, বাগো ও পূর্ব শান— এই ছয় প্রদেশ ও অঞ্চলে ইতোমধ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সামরিক সরকার।

মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শক্তিশালী কম্পনে নেইপিদো, সাগাইং, মান্দালয়সহ পাঁচটি শহরে ভবন ধসে পড়েছে। এ ছাড়া একটি সেতু ও একটি রেলসেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, ইরাবতি নদীর ওপর আভা সেতু ধসে পড়েছে। সেতুটি ভেঙে পানির মধ্যে হেলে পড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে সব দেশকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মিয়ানমারের এ আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় শোক প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের জনগণের পাশে দাঁড়াতে এরই মধ্যে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট দল কার্যক্রম শুরু করেছে।

ভূমিকম্পে হাসপাতালও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাস্তাঘাট ভেঙে গেছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগটিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হাসপাতালে প্রবেশপথে একটি গাড়ি চাপা পড়েছে।

এএফপিকে হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানিয়েছে, ‘অনেক আহত মানুষ আসছেন। আমি এর আগে এমন কিছু দেখিনি। আমরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমি খুব ক্লান্ত।’

এদিকে আহতদের দেখতে মিয়ানমারের সামরিক প্রধান মিন অং হ্লাইং হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন।

বিশ্বে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত দেশগুলোর একটি মিয়ানমার। দেশটিতে বিভিন্ন সময় ভূমিকম্পে জনবহুল এলাকাগুলো কেঁপে উঠলেও গতকাল শহরগুলো যেভাবে আক্রান্ত হয়েছে, তা আগে দেখা যায়নি। ইউএসজিএসের অনুমান, দেশটিতে নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

থাইল্যান্ডে ভূমিকম্পে ১০ জন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে রাজধানী ব্যাংককের কর্তৃপক্ষ। একটি বহুতল ভবনসহ তিনটি নির্মাণাধীন স্থাপনায় নিখোঁজ আছেন অন্তত ১০১ জন। বিভিন্ন ভবনের ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া ব্যক্তিদের অনেকেই বেঁচে আছেন বলে আজ ধারণা প্রকাশ করেছেন ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপান্ত।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়, ইতিমধ্যে আজ সকালে ইয়াঙ্গুনে পৌঁছেছে দেশটির ৩৭ সদস্যের একটি উদ্ধারকারী দল। আর রাশিয়া ১২০ সদস্যের একটি উদ্ধারকারী দল মিয়ামারে পাঠিয়েছে বলে জানিয়েছে রুশ সরকারি সংবাদমাধ্যম তাস।

এদিকে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণসহায়তা হিসেবে ৫০ লাখ ডলার বরাদ্দ করেছে জাতিসংঘ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বলেছেন, তাঁর দেশ ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি যেভাবে আন্তর্জাতিক সহায়তা কাটছাঁট করেছে তাতে তাঁর এ আশ্বাস নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন কিছু বিশেষজ্ঞ।

মিয়ানমারের ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির কর্মকর্তা মোহাম্মদ রিয়াজ বলেন, ‘ধ্বংস ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য পেতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে বলে আমাদের আশঙ্কা।’

মিয়ানমারের শোচনীয় এক সময়ে এই ভূমিকম্প হলো বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মিয়ানমারবিষয়ক গবেষক জো ফ্রিম্যান। তিনি বলেন, দেশটিতে চলমান সংঘাতের কারণে এরই মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সেখানে আগে থেকেই ত্রাণসহায়তার প্রয়োজন ছিল। এর মধ্যে ভূমিকম্পের কারণে সেই সংকট আরও তীব্র হলো।

উল্লেখ্য, মিয়ানমার বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলোর একটি। ২০১১ সালে মিয়ানমারের পূর্বাঞ্চলে ৬ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে ৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন এবং শতাধিক ভবন ধ্বংস হয়েছিল।

মিয়ানমারে ২০২১ সালে নির্বাচিত অং সান সু চি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক জান্তা। এর পর থেকে দেশটি সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সংঘাত চলছে। বর্তমানে দেশটির বড় অংশ দখলে রয়েছে এই বিদ্রোহীদের। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের ৩০ লাখের বেশি মানুষ এখন বাস্তুচ্যুত। আর দেশটির এক–তৃতীয়াংশের বেশি মানুষের ত্রাণসহায়তা প্রয়োজন।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *