■ নাগরিক প্রতিবেদন ■
রাজধানীর জিগাতলার একটি ছাত্রী হোস্টেল থেকে জান্নাতারা রুমী নামে এক এনসিপি নেত্রীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার ভোরে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, হাজারীবাগ থানার জিগাতলা এলাকার একটি ছাত্রী হোস্টেল থেকে জান্নাতারা রুমীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ‘ভোর চারটার দিকে জান্নাতারা রুমীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মরদেহ ঢাকা মেডিকেলের মর্গে পাঠানো হয়েছে।’
থানার পরিদর্শক (অপারেশন) দেলওয়ার হোসেন বলেন, ‘জান্নাতারা রুমী এনসিপির ধানমন্ডি শাখার যুগ্ম সমন্বয়কারী ছিলেন। প্রাথমিকভাবে আমাদের ধারণা, আত্মহত্যা হতে পারে।’
পুলিশ এই ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করলেও এনসিপির এক নেতা একে ‘খুন’ আখ্যায়িত করেছেন। যুক্তি হিসেবে তিনি বলেছেন, সম্প্রতি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে মধ্যবয়স্ক এক নারীকে লাঠি দিয়ে আঘাতের ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর অনলাইনে হয়রানি ও হুমকি পাচ্ছিলেন জান্নাতারা।
৩০ বছর বয়সী জান্নাতারা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। তিনি জিগাতলার ওই হোস্টেলের পঞ্চম তলার একটি কক্ষে একা থাকতেন।
সকালে ওই হোস্টেলের গৃহকর্মী ডাকাডাকি করেও জান্নাতারার কোনো সাড়া না পেয়ে দরজায় ধাক্কাধাক্কি করেন। এ সময় হার্ডবোর্ডের দরজার ছিটকিনি খুলে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না প্যাঁচানো জান্নাতারাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায়। এ সময় হোস্টেল থেকে ঘটনাটি থানায় জানানো হলে পুলিশ এসে জান্নাতারার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে।
জান্নাতারার কক্ষের টেবিলে বিষণ্ণতামুক্ত থাকার কিছু ট্যাবলেট পাওয়া গেছে জানিয়ে ওসি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, জান্নাতারার দুবার বিয়ে হয়েছিল এবং প্রতিবারই তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছিল। পারিবারিক অশান্তি থাকায় তিনি বিষণ্নতা থেকে আত্মহত্যা করেছেন বলে মনে হচ্ছে।
জান্নাতারার গ্রামের বাড়ি নওগাঁ জেলার নজিপুর পৌরসভার পত্নীতলায়। তাঁর বাবা পেশায় কৃষক। এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে জান্নাতারা দ্বিতীয় ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে জান্নাতারার চাচাতো ভাই মেহেদী হাসান ছুটে আসেন। দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গের সামনে মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, জান্নাতারার দুই ঘরে এক ছেলে (৪) ও এক মেয়ে (২) রয়েছে। ছেলে–মেয়েরা তাদের নিজ নিজ বাবার কাছে থাকে।
মেহেদী হাসান বলেন, দ্বিতীয়বার বিবাহবিচ্ছেদ হওয়ার পরই জান্নাতারা বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। এই বিষণ্নতা থেকেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে মনে হচ্ছে।
গত ১৪ নভেম্বর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ‘ঢাকা লকডাউন’ চলাকালে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে মধ্য বয়সী এক নারী মারধরের শিকার হন। সেই মারধরে জড়িত থাকার ঘটনায় আলোচনায় আসেন রুমী।
রুমীর বর্তমান ঠিকানা, পারিবারিক পরিচয়, গ্রামের ঠিকানা সবই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে জানান এনসিপি নেতা আরিফুল ইসলাম আদীব।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডি থেকে দেওয়া সর্বশেষ স্ট্যাটাসে তিনি ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির কথা উল্লেখ করেন। ওই স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ‘ইয়া আল আল্লাহ, হাদি ভাইকে আমাদের খুব দরকার।’
এক দিন আগের আরেক পোস্টে একটি ছবি যোগ করে তিনি লেখেন, ‘একদিন ভোর হবে, সবাই ডাকাডাকি করবে কিন্তু আমি উঠব না..কারণ আমি ভোরে উঠি না.!’
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্যসচিব তারেক রেজা নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘কিভাবে লিখবো বুঝতেছি না। আমার হাত কাঁপতেছে।
আপনাদের মনে থাকার কথা, গত মাসে শেখ হাসিনার ফাঁসির রায়ের দিন ধানমন্ডি ৩২-এ ফ্যাসিস্ট ও খুনি আওয়ামী লীগাররা কী সিন ক্রিয়েট করেছিলো।
সেখানে একজন জেন-জি নারীকে আপনারা দেখেছিলেন এক আওয়ামী লীগারকে (যে জিয়ার কবর খুড়তে চাইছিলো) পিটায়ে পুলিশের কাছে ধরায়ে দিতে।’
স্ট্যাটাসে তিনি আরও লেখেন, ‘সেই জেন-জি নারী গত এক মাস ধরে আওয়ামী লীগের ক্রমাগত সাইবার বুলিং, হ/ত্যা ও রেপ থ্রেটে অতিষ্ঠ হয়ে আজ রাতে আত্মহত্যা করেছে।
ধানমন্ডির ভাইব্রাদারদের সাথে কথা হলো। তারা গত এক মাসে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে তার পাশে থাকার।
কিন্তু সাইবার বুলিং আর ফোনকলে সারাদিন থ্রেট পাওয়ার পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য পাওয়া যায়নি।
তবে কারোর কল্পনাতেও ছিলো না, বুলিংয়ের মাত্রা এত তীব্র যে সে আত্মহননের পথ বেছে নেবে।’
তারেক রেজা আরও লেখেন, ‘এটাকে আমরা আত্মহত্যা হিসেবে দেখতে রাজি নই। এটা খুন। যারা আমার বোনের জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে, তাদের জীবন আমরা শান্তিতে কাটাতে দেবো না। আমার বোনের রক্তের শপথ!’
তাঁকে শেষবার দেখতে বিকেলে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিনসহ কয়েকজন ঢাকা মেডিকেলের মর্গের সামনে যান। সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামান্তা শারমিন বলেন, ‘রুমির (জান্নাতারা রুমি) ঝুলন্ত মরদেহ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কত বড় একটি শত্রুর বিপক্ষে আমরা লড়াই করেছি। আওয়ামী লীগের পেজ থেকে রুমিকে হিট লিস্টে আছো বলে বারবার হুমকি দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, এই পরিষ্কার কমেন্টগুলো থাকা সত্ত্বেও অ্যাকাউন্টগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রের পক্ষে এই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল। রুমির মৃত্যুর জন্য এর দায়ভার রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে।
