■ নাগরিক প্রতিবেদক ■
ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্টার (এনইআইআর) পদ্ধতি আগামী তিন মাস বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম।
রোববার (৪ জানুয়ারি) মোবাইল ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ কথা বলেন তিনি।
ডিসি মাসুদ আলম জানান, ৩ মাস কোনো ফোন ব্ল্যাকলিস্ট হবে না। চালুর আগের সব স্টক লট বৈধ হবে। এছাড়া উৎপাদনকারীরা ডিস্ট্রিবিউটরদের বাড়তি ৩ থেকে ৪ শতাংশ ডিসকাউন্ট দেবে, যাতে শো রুমের চেয়ে কমে তারা ফোন বিক্রি করতে পারেন।
এর আগে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে এনইআইআর চালুর ঘোষণা দেয়া হলেও ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদের মুখে তা ১৫ দিন পিছিয়ে ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেয় বিটিআরসি। পরবর্তীতে এনইআইআর পদ্ধতি চালুর প্রতিবাদে গত ১ জানুয়ারি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীদের একটি অংশ।
ওইদিন বিক্ষোভের একপর্যায়ে তারা ইট-পাটকেল নিক্ষেপসহ অতর্কিত হামলা চালিয়ে বিটিআরসি কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সেই সঙ্গে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়।
এনইআইআর পদ্ধতির বিরোধিতা করে বেশ কিছুদিন ধরেই আন্দোলন করে আসছেন মোবাইল ব্যবসায়ীরা। এই পদ্ধতি কার্যকরের পর থেকে দেশে কেবল বৈধ ও সরকার অনুমোদিত মোবাইল হ্যান্ডসেটই নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকতে পারবে বলে জানিয়েছে বিটিআরসি।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এনইআইআর কার্যকর হলে অবৈধভাবে দেশে আসা ফোন আর ব্যবহার করা যাবে না। একইসঙ্গে বিদেশ থেকে অবৈধভাবে আনা পুরনো ফোনের ব্যবসাও বন্ধ হবে। তবে এনইআইআর চালুর আগ পর্যন্ত নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত কোনো ফোন বন্ধ করা হবে না।
সরকারের অভিযোগ, ব্যবসায়ীদের একটি অংশ অবৈধ পথে কর ফাঁকি দিয়ে নিম্নমানের, ক্লোনড, ব্যবহৃত ও পুরনো ফোন দেশে এনে বাজারজাত করছে। এসব অনিয়ম বন্ধ করতেই হ্যান্ডসেট নিবন্ধনে এনইআইআর চালুর উদ্যোগ নেয় সরকার।
এনইআইআর কার্যক্রম চালুর প্রতিবাদে মোবাইল ব্যবসায়ীদের সংগঠন মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (এমবিসিবি)-এর ব্যানারে সকাল ১০টার দিকে কারওরান বাজারে সার্ক ফোয়ারা মোড় অবরোধ করে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীরা। এ সময় তারা তাদের পরিবারের সদস্যদেরকেও সঙ্গে নিয়ে আসেন। তারা সড়কে বসে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এতে আশপাশের সড়কে পুরোপুরি যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ প্রথম দফায় লাঠিপেটা করে ব্যবসায়ীদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। এতে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। তবে তারা আবারো কাওরান বাজার টু বসুন্ধরা সিটি শপিংমল সড়কে অবস্থান নেন। শিশু সন্তান নিয়ে ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ সড়কে বসে পড়েন। এসময় পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন তারা। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান, রায়টকার ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে পুলিশ। এতে ছত্রভঙ্গ হয়ে আশপাশের দোকানে ঢুকে পড়েন মোবাইল ব্যবসায়ীরা। পুলিশ কাওরান বাজারের দিকে চলে আসলে আবারো সংঘবদ্ধ হয়ে বসুন্ধরা শপিংমলের সামনের রাস্তায় অবস্থান নেয় মোবাইল ব্যবসায়ীরা। পুলিশ তাদেরকে আবারো ধাওয়া দিলে তারা শপিংমলের ভেতরে ঢুকে পড়েন। কেউ কেউ রাস্তায় শুয়ে নিজেদেরকে ব্যবসায়ী দাবি করে বলেন- আমরা কোনো সন্ত্রাসী না, আমরা ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীরা বলেন, আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই জোর করে এই এনইআইআর প্রকল্প চালু করা হয়েছে। আমরা মোবাইল ব্যবসায়ীরা এখন বৌ-বাচ্চা নিয়ে না খেয়ে মারা যাবো। তাই আমরা বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছি। কিন্তু আমাদের ওপর আজ অন্যায়ভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। পুলিশের তোপের মুখে কাওরান বাজার এলাকায় টিকতে না পেরে দুপুরের পর হাতিরপুলের মোতালেব প্লাজার সামনে অবস্থান নেন মোবাইল ব্যবসায়ীরা।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. শওকত আলী বলেছেন, সকাল থেকেই মোবাইল ব্যবসায়ীদের একটি অংশ সোনারগাঁও ক্রসিং এলাকায় অবস্থান নেন। বেলা ১১টার দিকে তারা পুরো রাস্তা বন্ধ করে দিলে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় এবং জনভোগান্তি চরমে পৌঁছায়। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ আইনের আওতায় থেকে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে এবং তারা তখন এলাকা ছেড়ে যায়। তবে কিছুক্ষণ পর আবারো ওই ব্যবসায়ীদের একটি অংশ রাস্তা অবরোধের চেষ্টা করে। তাই পুলিশকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হয়। এ সময় সংঘর্ষে পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হন।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। এতে আন্দোলনকারীরা অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়েন। আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে ডিসি বলেন, পুলিশের কাছে তাদের কোনো সরাসরি দাবি জানানো হয়নি। তারা যে কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানানোর কথা, সেখানেই তা জানানো উচিত ছিল। কিন্তু জনভোগান্তি সৃষ্টি করে সরকারকে চাপ দেয়ার উদ্দেশ্যে তারা রাস্তায় নেমেছেন বলে মনে হচ্ছে।
