বাংলাদেশ-পাকিস্তানের সম্পর্ক নতুন যুগে প্রবেশ করছে

■ নাগরিক প্রতিবেদক ■

দুই দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। তাঁর এ সফরকে আঞ্চলিক কূটনীতিতে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। গত ১৩ বছরের মধ্যে পাকিস্তানের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটি প্রথম বাংলাদেশ সফর। এই সফর ইঙ্গিত করছে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তান সম্পর্ক জোরালো করতে চায়।

সংবাদমাধ্যম পাক ট্রিবিউন জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনসহ বাংলাদেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন ইসহাক দার। এসব বৈঠকে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক, বৈশ্বিকসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হবে।

সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কূটনীতিকেরা এটিকে দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাস পুনঃ স্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তা নিয়ে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো ছিল না।

পাক ট্রিবিউন বলেছে, সাবেক স্বৈরাচার শেখ হাসিনার বিদায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যে সংলাপ এবং সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বৃদ্ধির নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

ইসহাক দারের এ সফরে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হবে বলে উভয় দেশের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। বাণিজ্য বৃদ্ধি, ভিসা প্রক্রিয়া সহজ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং সম্মিলিতভাবে আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রতিষ্ঠায় এসব সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হবে বলে জানিয়েছে পাক ট্রিবিউন।

সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকেরা দেখছেন, পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের বাণিজ্য করিডর বৃদ্ধি করতে চায়। তারা বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির সুযোগ নিতে চায়।

অপর দিকে বাংলাদেশ পাকিস্তানি বাজারে আরও প্রবেশাধিকার, টেক্সটাইল ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো খাতে দক্ষতা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে আরও বৃহৎ সহযোগিতা চায়।

ইসহাক দারের এই সফরকে পাকিস্তানের একটি কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে, যার লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক সম্পর্কগুলো নতুন করে সাজানো। এ ক্ষেত্রে এমন অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও টিকে থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদ ও ঢাকার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে, বিশেষত যখন প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোতে উত্তেজনা বাড়ছে।

এই সফর দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সাফল্যের দিকে নিয়ে যাবে কি না, তা নির্ভর করছে টেকসই রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং চলমান আলোচনা থেকে কী বাস্তব ফল আসে, তার ওপর। তবে আপাতত এই সফরকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে, যা আরও বেশি সহযোগিতা ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার পথ খুলে দেবে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, ‘প্রায় ১৩ বছর পর একজন পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করছেন, এই সফর পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।’

২০১২ সালের নভেম্বরে শেষবারের মতো কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় সরকারি সফরে এসেছিলেন। সেই সময় হিনা রব্বানী খার ছয় ঘণ্টার জন্য বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। তিনি ইসলামাবাদে এক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুসারে, সফরকালে ইসহাক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসে সহ বিভিন্ন বাংলাদেশি নেতার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করবেন।

এতে বলা হয়, ‘বৈঠকগুলোতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সম্পূর্ণ পরিসর এবং বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে।’

এদিকে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাসসকে জানিয়েছেন, এই সফরে বাণিজ্য, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, প্রশিক্ষণ এবং ভ্রমণের ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করার জন্য চার থেকে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক সই হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গত এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচের ঢাকা সফরের মাধ্যমে ১৫ বছর পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত হয়। গত মাসে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি ঢাকা সফর করেন। এরপর পাকিস্তান ও বাংলাদেশ কূটনৈতিক ও সরকারি পাসপোর্টধারীদের ভিসা-মুক্ত প্রবেশাধিকার প্রদানে সম্মত হয়।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *