সাবেক কাউন্সিলর বাপ্পির পরিকল্পনায় হাদিকে হত্যা

■ নাগরিক প্রতিবেদক ■

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্ববায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলায় সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

মঙ্গলবার বিকেলে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, রাজধানীর মিরপুরের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পির নির্দেশে শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। মামলার তদন্তে ১৭ জনের নামে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি ছয়জনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। 

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে হাদিকে হত্যা করা হয় বলেও জানান ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম।

মঙ্গলবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা শেষে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এ তথ্য জানান তিনি।

শফিকুল ইসলাম বলেন, হাদি হত্যা মামলায় ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল, ফয়সালের বোন জেসমিন, আলমগীর ও ফিলিপসহ পাঁচজন এখনো পলাতক রয়েছে। অধিকতর তদন্তে আরও যদি কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তাহলে আদালতে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হবে।

হত্যার বিষয়ে তিনি বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেন হাদি। বিভিন্ন সময়ে তিনি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের বিগত দিনের কার্যকলাপ সম্পর্কে সমালোচনামূলক জোরালো বক্তব্য প্রদান করেন। তার এই বক্তব্যে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়। ঘটনার দিন তাকে গুলি করা পলাতক আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

তিনি বলেন, ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে পলায়নের বিষয়ে সার্বিক সহায়তা করেন আসামি তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী। বাপ্পী পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৬নং ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ মনোনীত নির্বাচিত কমিশনার (কাউন্সিলর) ছিলেন। আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং হাদির পূর্ববর্তী বিভিন্ন বক্তব্যের কারণে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

হাদি হত্যার পরিকল্পনা ও নির্দেশদাতার বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাইজুল ইসলাম বাপ্পীর নির্দেশে হত্যা করা হয় ওসমান হাদিকে।

উদ্ধারকৃত অস্ত্র দিয়েই গুলি করা হয়েছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা অস্ত্রের ফরেনসিক করেছিলাম। এই অস্ত্র ব্যবহার করেই তারা হাদিকে গুলি করে হত্যা করেছিল।”

সম্প্রতি মূল অভিযুক্ত ফয়সালের ভিডিও ও সর্বশেষ অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ফয়সালের ভিডিওর ফরেনসিক করা হয়েছে। ভিডিওটি সঠিক, কিন্তু তার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আসামিদের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী ওসমান হাদিকে সরাসরি গুলি করেন ফয়সাল করিম এবং তাঁকে সহযোগিতা করেন আলমগীর হোসেন। এই তিনজনই ভারতে পালিয়ে গেছেন। ফয়সাল করিমের ভগ্নিপতি মুক্তি মাহমুদ (৫১) তাঁদের বাসায় ফয়সাল ও আলমগীরকে আশ্রয় দেন এবং অস্ত্র সংরক্ষণ করেন। ফয়সালসহ অন্য আসামিদের সীমান্ত পারাপারে সাহায্য করার কাজে সরাসরি যুক্ত ছিলেন ফিলিপ স্নাল (৩২)।

গ্রেফতার ১২ জনের সম্পৃক্ততার বিষয়ে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নুরুজ্জামান নোমানী উজ্জ্বল (৩৪), সিবিয়ন দিও (৩২) ও সঞ্জয় চিসিম (২৩) হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ফয়সাল করিম ও আলমগীরকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন। ফয়সাল করিমের বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০) হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট পরিবর্তন, অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ ও নরসিংদীতে অস্ত্র স্থানান্তরের কাজে জড়িত ছিলেন। ফয়সাল করিমের মা হাসি বেগমের (৬০) বিষয়ে বলা হয়েছে, তিনি ফয়সাল ও আলমগীরকে আশ্রয় দিয়েছেন এবং অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের কাজে যুক্ত ছিলেন। ফয়সালের বোন জেসমিন আক্তারের (৪২) বিষয়ে বলা হয়েছে, তিনি ফয়সালকে বাসায় আশ্রয় দেন এবং অস্ত্র সংরক্ষণ করে হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করেন।

ফয়সালের স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়ার (২৪) বিষয়ে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, স্বামীকে পালিয়ে যাওয়ার খরচ বাবদ বিকাশে ৩০ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। আর ফয়সালের শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপু (২৭) ঢাকা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র সংগ্রহ করে নরসিংদীতে নিয়ে যান বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছে পুলিশ। বলা হয়েছে, ওয়াহিদ সেই অস্ত্র তাঁর ঘনিষ্ঠ মো. ফয়সাল (২৫) নামের এক ব্যক্তির কাছে রেখেছিলেন।

ফয়সালের বন্ধু মো. কবির (৩৩) হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি সরবরাহ করেছিলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছে পুলিশ। এতে বলা হয়েছে, ফয়সাল ও আলমগীরের বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১) হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এই হত্যায় আমিনুল ইসলাম রাজু (৩৭) নামের এক ব্যক্তির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তিনি হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত বলে পুলিশের তদন্তে এসেছে।

ডিবি জানায়, এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য–উপাত্ত পর্যালোচনা করে যাঁদের বিষয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, তাঁদের অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে। ভবিষ্যতে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে ও নতুন কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *