■ কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ■
প্রতিবেশীর সঙ্গে কাজের সন্ধানে গিয়ে হারিয়ে যায় শিশু সাইফুল ইসলাম। দীর্ঘ প্রায় ২৮ বছর পর ছেলেকে ফিরে পেলেন তার বাবা-মা ও পরিবার। ছেলেকে ফিরে পেয়ে আপ্লুত পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন।
আনন্দঘন ঘটনাটি ঘটেছে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার গুনাইগাছ ইউনিয়নের নেফরা গ্রামে। আব্দুল লতিফ ও আমেনা বেগম দম্পতির দরিদ্র পরিবারের সন্তান সাইফুল ইসলাম। পরিবারে পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে সাইফুল ছিলেন চতুর্থ। অভাব আর দারিদ্রে আট শতক বাড়ির ভিটে ছাড়া সম্বল বলে আর কিছুই ছিল না। পরিবারের দশ সদস্যের সংসারে মা-বাবা গ্রামে গ্রামে কাজ করে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতেন। অধিকাংশ সময় কাটতো খেয়ে না খেয়ে।
১৯৯৭ সালে ৯ বছরের সাইফুলকে চট্টগ্রামে মানুষের বাসায় কাজের উদ্দেশ্যে পাঠায় পরিবার। পথিমধ্যে স্টেশনে ট্রেন দাঁড়ালে সাইফুল প্রাকৃতিক কাজ সারতে ট্রেন থেকে নেমে পড়লে ট্রেনটি ছেড়ে চলে যায়। এরপর থেকে নিখোঁজ সাইফুল। চট্টগ্রামের সিতাকুন্ড উপজেলার ভাটিয়ারি রেল স্টেশন এলাকায় একটি চায়ের দোকানে আশ্রয় ও কাজ জোটে সাইফুলের। সেখানেই কাটে ২৮টি বছর।
গত সপ্তাহে নেফরা গ্রামের এক বাসিন্দার সঙ্গে হঠাৎ কথার এক পর্যায়ে সাইফুল জেলা-উপজেলার নাম বলতে না পারলেও বাবা-মা এবং গ্রামের নাম বলতে সক্ষম হয়। এভাবেই পরিবারের খোঁজ মেলে সাইফুলের।
পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর সাইফুলের বড় ভাই মাহফুজ রহমান গত বৃহস্পতিবার ভাটিয়ারি রেল স্টেশনে চায়ের দোকান থেকে সাইফুলকে নিয়ে বাড়ি আসেন। শনিবার সকালে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এ মিলনে আবেগাপ্লুত সাইফুলের বাবা-মা, ভাই-বোন এবং স্থানীয়রা। এতে খুশি এলাকাবাসী ও আত্মীয়-স্বজন। সাইফুলকে ফিরে পাবার খবর ছড়িয়ে পড়লে শতশত মানুষের ভীড় জমে সাইফুলের বাড়িতে।
সাইফুলের বড় ভাই মাহফুজ রহমান বলেন, গত সপ্তাহে সাইফুলের তথ্য পাই। এরপর সেই ঠিকানা অনুসারে গিয়ে আমার ভাইকে দেখে চিনতে একটুও কষ্ট হয়নি। সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ তৈরি হয়। এ সময় ভাটিয়ারি রেল স্টেশনের চায়ের দোকানের মালিক মোস্তাকিনের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে স্ট্যাম্পে লিখিত এবং ভোটার আইডি দিয়ে আমার ভাইকে নিয়ে বাড়ি চলে আসি। এতদিন পরে ভাইকে ফেরত পাওয়ার অনুভূতির ভাষা প্রকাশ করার মতো নয়।
অশ্রুসিক্ত বাবা আব্দুল লতিফ বলেন, ছেলেকে দেখে আমি চিনতে পেরেছি। ছেলের জন্য নামাজ পড়েছি, আল্লাহর কাছে অনেক কেঁদেছি। ছেলেকে পেয়ে আমি খুব খুশি হয়েছি।
অশ্রুসিক্ত মা আমেনা বেগম বলেন, সংসারে অভাব, মঙ্গা, খাবার জুটতো না। পরিবারের ১০ সদস্য খেয়ে না খেয়ে দিন কাটিয়েছি। সেজন্য ছোট শিশুকে মানুষের বাড়িতে কাজের জন্য এলাকার এক মহিলার সাথে চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। যাবার পথে ছেলে হারিয়ে যায়। এরপর বহু খুঁজেছি, কবিরাজের কাছে গেছি। আল্লাহর কাছে কেঁদেছি। আল্লাহর রহমতে ২৭/২৮ বছর পর সন্তানকে ফেরত পেলাম।
স্থানীয় বাসিন্দা জলিল, মকবুল, কামরুল, বুলবুলি বলেন, পরিবারটি সন্তান হারিয়ে দিশেহারা হয়ে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। মসজিদের বারান্দায় ওর দাদী আচল বিছিয়ে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে নাতিকে ফেরত চেয়েছিল। কিন্তু বেশ কয়েক বছর হলো ওর দাদী মারা গেছে। দাদী বেঁচে থাকলে আজ সাইফুলের ফেরত আসায় অনেক খুশি হতো। খাদ্য-পুষ্টির অভাবে সাইফুল ও তার বাবার কিছুটা জ্ঞান-বুদ্ধি কম। পরিচয়বিহীন ২৮টি বছর কেটে যাওয়ায় জাতীয় পরিচয়পত্রও জোটেনি। পরিবারের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার পাশাপাশি সরকারি ভাবে দ্রুত জাতীয় পরিচয়পত্র দিলে পরিবারটির উপকার হবে।
উলিপুর গুনাইগাছ ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কাশেম বলেন, সাইফুলকে হারিয়ে পরিবারটি দিশেহারা হয়ে পড়ে। স্থানীয়ভাবে অনেকেই সাইফুলের খোঁজ করলেও পাওয়া যায়নি এতদিন। পরিবারটিকে রক্ষার্থে সরকারি-বেসরকারি ভাবে পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।
উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নয়ন কুমার সাহা বলেন, ২৮ বছর পরে সন্তানকে ফিরে পাওয়া সত্যিই আনন্দের খবর। ভোটার হওয়াসহ এই পরিবারের পাশে থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছি।