রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহ কী বলেছিলেন

■ ফিচার ডেস্ক ■

১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ১০ দিনের সফরে পূর্ব পাকিস্তানে আসেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ঢাকা ও চট্টগ্রামে তিনি বেশ কয়েকটি জনসমাবেশে ভাষণ রাখেন। এই সব ভাষণে তিনি কি বলেছিলেন তা নিয়ে অনেকে অজ্ঞতাবশত ভুল তথ্য ছড়াচ্ছেন সামাজিক মাধ্যমে। অনেকে আবার শুধু অংশ বিশেষ তুলে ধরে সাধারণ পাঠককে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। তাই আমরা তার বক্তব্যগুলোর সম্পূর্ণ পাঠ আপনাদের সামনে হাজির করছি। আশা করি সকলে উপকৃত হবেন।

পাকিস্তানের গভর্নর-জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভাষণ

রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা, পূর্ব পাকিস্তান; ২১ মার্চ ১৯৪৮

প্রথম খণ্ড

এই প্রদেশের জনগণ, অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যান মহোদয় এবং ঢাকার মানুষ যে আন্তরিক অভ্যর্থনা আমাকে জানিয়েছেন, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। পূর্ব বাংলায় আসতে পেরে যে আমার গভীর আনন্দ হয়েছে, তা আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কারণ এখানেই বিশ্বের বৃহত্তম একক মুসলমান জনগোষ্ঠীর বসবাস। আমি চেয়েছিলাম যত দ্রুত সম্ভব এই প্রদেশে আসতে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এতদিন আমাকে তা করতে দেয়নি। এসব বিষয়ের কিছু সম্পর্কে আপনারা নিশ্চয়ই অবগত। উদাহরণস্বরূপ, দেশভাগের পরপরই পাঞ্জাবে যে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছিল, সে কথা আপনারা জানেন। তার ফলে পূর্ব পাঞ্জাব, দিল্লি ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়েছিল এবং পশ্চিম পাকিস্তানে পুনর্বাসনের আগ পর্যন্ত তাঁদের নিরাপত্তা, আশ্রয় ও খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। ইতিহাসে এমন নজির নেই যে কোনো নতুন রাষ্ট্রকে এ ধরনের ভয়াবহ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আবার ইতিহাসে এমন উদাহরণও নেই যে কোনো নতুন রাষ্ট্র এত দক্ষতা ও সাহসের সঙ্গে এই সমস্যাগুলো মোকাবিলা করেছে। আমাদের শত্রুরা ভেবেছিল পাকিস্তান জন্মলগ্নেই ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু তার বিপরীতে পাকিস্তান বিজয়ী হয়ে উঠেছে, আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়েছে। পাকিস্তান টিকে থাকবে এবং যে মহান ভূমিকার জন্য এটি নির্ধারিত, তা পালন করবে।

আপনার স্বাগত ভাষণে আপনি এই প্রদেশের বিপুল কৃষি ও শিল্পসম্পদের উন্নয়ন, এখানকার তরুণ-তরুণীদের পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদানের জন্য প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি, চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন ও এই প্রদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের অন্যান্য অংশের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষাব্যবস্থার প্রসার এবং সর্বোপরি পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকরা যেন রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের সব ক্ষেত্রে তাঁদের ন্যায্য ও বৈধ অংশ পান—এই বিষয়গুলোর ওপর জোর দিয়েছেন। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই যে, আমার সরকার এসব বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং পূর্ব পাকিস্তান যেন দ্রুততম সময়ে তার পূর্ণ মর্যাদা অর্জন করতে পারে, সে লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। এই প্রদেশের মানুষের সামরিক দক্ষতার প্রমাণ ইতিহাসে সুস্পষ্ট। আপনারা জানেন, সরকার ইতোমধ্যেই নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী এবং পাকিস্তান ন্যাশনাল গার্ডে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এই প্রদেশের যুবকদের প্রশিক্ষণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে, এই প্রদেশের যুবসমাজ যেন রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় তাদের যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারে, সে জন্য সব ধরনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

পূর্ব বাংলার সরকারকে অভিনন্দন

এবার আমি এই প্রদেশ-সংক্রান্ত কিছু সাধারণ বিষয়ের দিকে আসছি। প্রথমেই গত সাত মাসের সংকট ও দুর্দশার সময়ে আপনারা এবং আপনাদের সরকার যে শালীনতা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন, তার জন্য আপনাদের অভিনন্দন জানাতে চাই। পাকিস্তান সৃষ্টির পর যে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা বিরাজ করছিল, তার মধ্য থেকে দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে একটি কার্যকর প্রশাসন গড়ে তোলার জন্য আপনার সরকার এবং পরিশ্রমী ও অনুগত কর্মকর্তারা প্রশংসার দাবিদার। ১৫ আগস্ট ঢাকায় প্রাদেশিক সরকার কার্যত নিজের ঘরেই উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছিল। দেশভাগের আগে যা ছিল একটি ছোট মফস্বল শহর, সেখানে হঠাৎ করে হাজার হাজার সরকারি কর্মচারীর জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করা ছিল একটি তাৎক্ষণিক সমস্যা। প্রশাসনিক এই সমস্যাগুলো সামলাতে না সামলাতেই প্রায় ৭০ হাজার রেলওয়ে ও অন্যান্য কর্মচারী তাঁদের পরিবারসহ ভারত থেকে বিতাড়িত হয়ে এই প্রদেশে এসে পৌঁছান। এর ওপর হিন্দু কর্মচারীদের ব্যাপক প্রস্থানের ফলে প্রশাসনিক কাঠামোতে বড় শূন্যতা সৃষ্টি হয় এবং যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে সরকারের সামনে প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় দ্রুত বাহিনী পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে আসন্ন প্রশাসনিক বিপর্যয় রোধ করা। সরকার তা করেছে অসাধারণ দ্রুততা ও দক্ষতার সঙ্গে। প্রশাসনিক কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চলতে থাকে এবং সমাজজীবনও অস্থির হয়নি। শুধু প্রশাসন পুনর্গঠিতই হয়নি, বরং গুরুতর প্রশাসনিক ঘাটতিগুলোও দ্রুত পূরণ করা হয়, ফলে সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ এড়ানো সম্ভব হয় এবং সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সারা প্রদেশে শান্তি বজায় রাখা গেছে। এ ক্ষেত্রে এই প্রদেশের জনগণেরও কৃতিত্ব রয়েছে, বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সদস্যদের, যাঁরা দেশভাগ-পরবর্তী মাসগুলোতে ভারতীয় ডোমিনিয়নে মুসলমানদের ওপর সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের তীব্র উসকানি সত্ত্বেও শান্তি বজায় রাখতে অসাধারণ সংযম ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন। সেই ভয়াবহ ঘটনাগুলোর পরও এই প্রদেশে শেষ দুর্গাপূজার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ৪০ হাজার শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে, একটিও শান্তিভঙ্গের ঘটনা ঘটেনি এবং এই প্রদেশের মুসলমানদের পক্ষ থেকেও কোনো ধরনের হয়রানি হয়নি।

সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা

যে কোনো নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, এই সংকটকালে পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের যত্ন ও সুরক্ষা ভারতের অন্য যেকোনো স্থানের তুলনায় ভালোভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। আপনারাও নিশ্চয়ই একমত হবেন যে পাকিস্তান শান্তি বজায় রাখতে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। আমি আপনাদের জানাতে চাই যে, শুধু ঢাকা নয়, সমগ্র পাকিস্তানেই সংখ্যালঘুরা অন্য যেকোনো স্থানের তুলনায় বেশি নিরাপদ ও সুরক্ষিত। আমরা স্পষ্ট করে বলেছি যে পাকিস্তান সরকার শান্তি ভঙ্গ করতে দেবে না। যে কোনো মূল্যে পাকিস্তান আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখবে এবং কোনো ধরনের মব শাসন সহ্য করবে না।

এই বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা প্রয়োজন—একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসন গড়ে তোলা, আসন্ন দুর্ভিক্ষ এড়ানো, সার্বিক খাদ্যসংকট ও পরবর্তী প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যেও এই প্রদেশের প্রায় চার কোটি মানুষের জন্য খাদ্য সরবরাহ বজায় রাখা এবং শান্তি রক্ষা করা। কারণ এই সরকারের এসব সাফল্য উপেক্ষা করার এবং সেগুলোকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়ার একটি প্রবণতা রয়েছে। সমালোচনা করা সব সময়ই সহজ, দোষ খোঁজা আরও সহজ। কিন্তু মানুষ প্রায়ই ভুলে যায় যে তাদের জন্য কী করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কী করা হবে, এবং পাকিস্তানের জন্মলগ্নে আমাদের কী ধরনের পরীক্ষা, দুর্ভোগ, কঠিনতা ও বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তা উপলব্ধি না করেই এসব অর্জনকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়।

আমি মনে করি না যে আপনার প্রশাসন নিখুঁত—তা মোটেই নয়। আমি বলছি না যে উন্নতির কোনো সুযোগ নেই। আমি এটাও বলছি না যে প্রকৃত পাকিস্তানিদের সৎ সমালোচনা অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু যখন আমি কিছু মহলে কেবল অভিযোগ, দোষারোপই দেখি এবং সরকার বা সেই অনুগত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের স্বীকৃতির একটি কথাও শুনতে পাই না, যারা দিনরাত আপনাদের জন্য পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, তখন তা স্বাভাবিকভাবেই আমাকে কষ্ট দেয়।

ভালো কাজের জন্য ভালো কথা বলুন

অতএব অন্তত যে ভালো কাজগুলো করা হয়েছে, তার জন্য কিছু ভালো কথা বলুন, তারপর সমালোচনা করুন। বৃহৎ প্রশাসনে ভুল হওয়াই স্বাভাবিক; আপনি আশা করতে পারেন না যে সেখানে কোনো ত্রুটি থাকবে না। পৃথিবীর কোনো দেশই ত্রুটিমুক্ত নয়। কিন্তু আমাদের আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্য হলো, ত্রুটি যেন যতটা সম্ভব কম থাকে। আমরা চাই প্রশাসনকে আরও দক্ষ, আরও কল্যাণমুখী এবং আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত করতে। সরকারের লক্ষ্য আর কী হতে পারে? সরকারের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে—মানুষের সেবা করা, তাদের কল্যাণ ও উন্নতির জন্য উপায় ও পদ্ধতি উদ্ভাবন করা। সরকারের আর কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে? এবং মনে রাখবেন, এখন সরকারকে ক্ষমতায় আনা বা ক্ষমতা থেকে সরানো আপনার হাতেই। কিন্তু তা মব তৈরি করে নয়। আপনার হাতে ক্ষমতা রয়েছে, সেই ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সেই কৌশল আপনাকে শিখতে হবে; রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

ছবি: রেসকোর্স ময়দানে ভাষণরত জিন্নাহ, মার্চ ২১, ১৯৪৮। কৃতজ্ঞতা: ডন, পাকিস্তান

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *