■ মুহাম্মদ শামীম ■
নব্বই দশকের বাংলাদেশে শবে বরাত ছিল এক অনন্য সামাজিক-ধর্মীয় অভিজ্ঞতা—যার সঙ্গে মিশে ছিল বিশ্বাস, লোকাচার, পারিবারিক উষ্ণতা আর পাড়ার সম্মিলিত জীবনের রঙ। আজকের ঝলমলে আলো, সোশ্যাল মিডিয়ার ঘোষণা বা ডিজিটাল প্রস্তুতির যুগের আগে শবেবরাত মানেই ছিল অপেক্ষা, প্রস্তুতি আর স্মৃতির এক গভীর আবেশ।
নব্বই দশকে শবেবরাত আসত সাধারণত নীরব উত্তেজনা নিয়ে। দিন কয়েক আগে থেকেই পাড়া-মহল্লায় কথাবার্তা শুরু হতো—কবে শব-ই-বরাত, কোন রাতে চাঁদ দেখা গেল, কে কী রান্না করবে। তখনকার দিনে ক্যালেন্ডার বা টিভির ঘোষণাই ছিল ভরসা; মোবাইল নোটিফিকেশন তো দূরের কথা। বয়স্করা বিশেষ করে এই রাতকে ‘লাইলাতুল বরাত’ বলে গুরুত্ব দিতেন—বিশ্বাস ছিল, এই রাতে মানুষের ভাগ্য লেখা হয়, গুনাহ মাফ হয়, মৃতদের রূহ ঘরে ফিরে আসে।
শবেবরাতের প্রস্তুতি শুরু হতো বিকেল থেকেই। বাড়ির মেয়েরা রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। সবচেয়ে পরিচিত ছিল হালুয়া—সুজির হালুয়া, সেমাইয়ের হালুয়া, কখনো বা চালের গুঁড়ার হালুয়া। কোথাও কোথাও পায়েস, রুটি, ডাল-পুরি বা খিচুড়িও রান্না হতো। রান্নার গন্ধে পুরো উঠান, বারান্দা ভরে যেত। ছোটরা বারবার উঁকি দিত—কখন হবে, কখন খাওয়া যাবে। রান্না শেষে থালায় থালায় করে প্রতিবেশীদের বাড়ি পাঠানো হতো। সেই আদান-প্রদান ছিল আন্তরিকতার এক নীরব ভাষা—“আমাদের তরফ থেকে শবেবরাতের হালুয়া।”
আজ ফিরে তাকালে বোঝা যায়, নব্বইয়ের দশকের শবেবরাত ছিল শুধু একটি ধর্মীয় রাত নয়; ছিল সামাজিক বন্ধনের উৎসব। রান্নাঘরের ধোঁয়া, মসজিদের প্রার্থনা, কবরস্থানের নীরবতা, শিশুদের হাসি—সব মিলিয়ে এক সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা। সময় বদলেছে, আয়োজন বদলেছে, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো এখনো মনে হলেই এক ধরনের শান্তি আসে। শবেবরাতের সেই রাতগুলো আমাদের শেখায়—বিশ্বাসের পাশাপাশি সম্পর্ক, আর আচার-অনুশীলনের পাশাপাশি মানবিক উষ্ণতাই আসলে উৎসবের প্রাণ।
সন্ধ্যা নামলেই শুরু হতো আরেক দৃশ্য। পাড়ার মসজিদগুলো পরিষ্কার করা হতো আগেভাগেই। নব্বইয়ের দশকের মসজিদে তখনও আজকের মতো মাইকিং বা আলো-সাজ কম ছিল, কিন্তু ভক্তির গভীরতা ছিল প্রবল। এশার নামাজের পর বিশেষ নফল নামাজ, দোয়া-মুনাজাত চলত। ইমাম সাহেব ভাগ্য, ক্ষমা, হেদায়েতের কথা বলতেন। অনেকেই হাতে তসবিহ নিয়ে দীর্ঘ সময় বসে থাকতেন। কারও চোখে জল, কারও ঠোঁটে নীরব প্রার্থনা।
এই রাতের আরেকটি বড় অংশ ছিল কবর জিয়ারত। অনেক পরিবার এশার পর বা গভীর রাতে কবরস্থানে যেতেন। হাতে থাকত মোমবাতি বা হারিকেন। বিদ্যুৎ তখনও সব জায়গায় নির্ভরযোগ্য ছিল না। কবরস্থানের সেই আলো-আঁধারিতে এক ধরনের শিহরণ থাকত, তবে ভয় নয়—বরং এক গভীর শ্রদ্ধা। মৃত আত্মীয়দের জন্য ফাতেহা পাঠ, দোয়া—এসব ছিল নব্বইয়ের শবেবরাতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শিশুদের কাছে শবেবরাত মানে ছিল অন্যরকম আনন্দ। অনেক জায়গায় ছোটরা দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি যেত—হালুয়া বা খাবার চাইতে। কেউ কেউ একে বলত “হালুয়া তোলা।” যদিও বড়রা সবসময় এটাকে সমর্থন করতেন না, তবু গ্রাম বা মফস্বলের জীবনে এটি ছিল এক ধরনের সামাজিক খেলা। বড়রা হাসিমুখে খাবার দিতেন, কেউ কেউ কয়েনও দিতেন। সেই রাতের হাঁটাহাঁটি, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে গল্প—সব মিলিয়ে শবেবরাত ছিল শিশুদের জন্যও স্মরণীয়।
নব্বইয়ের দশকের শবেবরাতে প্রযুক্তির প্রভাব ছিল সামান্য। টেলিভিশনে হয়তো বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান হতো, কিন্তু সবাই সেটার দিকে তাকিয়ে থাকত না। মূল আকর্ষণ ছিল বাস্তব জীবনের মিলন—একই ছাদের নিচে পরিবারের সবাই, একই পাড়ার মানুষ, একই মসজিদে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো। ফোনে মেসেজ পাঠানোর বদলে মানুষ সরাসরি গিয়ে খোঁজ নিত—“নামাজ পড়ছো তো?” এই সরাসরিত্বই ছিল সেই সময়ের সৌন্দর্য।
নারীদের অংশগ্রহণ ছিল নীরব কিন্তু গভীর। অনেকেই ঘরে বসে কোরআন তিলাওয়াত করতেন, নফল নামাজ পড়তেন। বয়স্ক দাদী-নানীরা শিশুদের শোনাতেন শবেবরাতের ফজিলতের গল্প—কীভাবে এই রাতে আল্লাহ রহমত নাজিল করেন, কীভাবে ক্ষমা চান। সেই গল্পগুলো বিশ্বাস আর কল্পনার মাঝামাঝি কোথাও অবস্থান করত, কিন্তু শিশুমনে গেঁথে যেত স্থায়ীভাবে।
আজ ফিরে তাকালে বোঝা যায়, নব্বইয়ের দশকের শবেবরাত ছিল শুধু একটি ধর্মীয় রাত নয়; ছিল সামাজিক বন্ধনের উৎসব। রান্নাঘরের ধোঁয়া, মসজিদের প্রার্থনা, কবরস্থানের নীরবতা, শিশুদের হাসি—সব মিলিয়ে এক সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা। সময় বদলেছে, আয়োজন বদলেছে, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো এখনো মনে হলেই এক ধরনের শান্তি আসে। শবেবরাতের সেই রাতগুলো আমাদের শেখায়—বিশ্বাসের পাশাপাশি সম্পর্ক, আর আচার-অনুশীলনের পাশাপাশি মানবিক উষ্ণতাই আসলে উৎসবের প্রাণ।
