সাইফুল আমিন কাজল
অনাথ মাঝির বজরা নৌকা আর চিরকুমার আমানুল হক, রান্না হত চাল-ডাল দিয়ে খিচুড়ি আর ভর্তা ভাত। মাসের পর মাস বছরের পর বছর দেশব্যাপী ঘুরে বেরিয়েছেন ছবির খোজে। একেকবার সাথে থাকত কমপক্ষে ৬ থেকে ৭টি ক্যামেরা আর লেন্স ৭ থেকে ৮টি। ব্যাগভরা (ঝোলা) থাকত নানারকম প্রপস। কি থাকত না সেই ঝোলায় – শাড়ি, চুড়ি, টিপ, কত কিছু !
তাঁর জন্ম ৬ নভেম্বর ১৯২৫ সালে শাহজাদপুর,সিরাজগঞ্জে এবং মৃত্যু ৩ এপ্রিল ২০১৩-তে। তাঁর আলোকচিত্রী হিসেবে বিচরণ ছিল ৫০ থেকে ৯০ দশক পর্যন্ত।
আমানুল হকের অপুস্টিজনিত সমস্যা ছিল। ‘‘পুস্টি সমস্যা সমাধানে অনাথ মাঝি মাঝেমধ্যেই সুস্বাদু ডাল রান্না করতেন। আলুভর্তার সাথে গরম ডাল, নৌকায় বসে খাওয়ার কি যে আনন্দ, একদিন রাতে সেই রান্না খেয়ে তৃপ্তি প্রকাশে খুশীতে আত্মহারা হয়ে চিৎকার দিয়ে উঠেছিলাম- আশেপাশের নৌকার মানুষেরা ভেবেছে এরা নিশ্চয়ই পাগল হয়ে গেছে ‘’ (আমানুল হক,’ক্যামেরায় স্বদেশের মুখ’ বই)
বড়ভাই আজমল হকের কাছে থেকেছেন অনেক সময়। একদিন তিনি অনাথ মাঝি আর আমানুল হককে পাশাপাশি দেখে বললেন ‘“তোমার চাইতে অনাথ মাঝিকেই তো সুন্দর দেখাচ্ছে “।
নৌকা ভাড়া দিতে গিয়ে অনেক সময় যন্ত্রপাতিও বিক্রি করেছেন। এই হল এক ও অদ্বিতীয় আমানুল হক, যিনি মনপ্রান উজার করে ছবি তুলতেন, দেশ ও দেশের মানুষদের ভালবাসতেন। দেশকে প্রানের চাইতেও বেশী ভালবাসতেন।।
বাংলাদেশের গ্রামের পর গ্রাম নৌকায় ঘুরে ছবি তুলেছেন অগনিত। দেশের বিভিন্য অঞ্চলের শহীদ মিনার নিয়েও কাজ করেছেন। ভাবা যায়, কতটা দেশপ্রেম আর ছবিপ্রেম থাকলে একজন মানুষ এইভাবে ছবির খোজে ৫ টা যুগ দিয়ে দিলেন। এমন প্যাশন ও ছবির প্রতি ভালবাসা খুব বিরল।
ক্লাস এইটে থাকতে (আনুমানিক ১৯৪০) ছবি তোলা শুরু করেন আমানুল হক। তাঁর অগ্রজ আজমল হক ছিলেন স্বনামধন্য আলোকচিত্রী। ঢাকা ইউনিভার্সিটির প্রথম আলোকচিত্রী ছিলেন তিনি। এছাড়া তাঁর ছোট বোন আয়েশা বেগম ঢাকা ভার্সিটির শিক্ষিকা ও একজন গবেষক। আমানুল হক নিজেও ঢাকা মেডিকেল কলেজের একজন শিল্পী হিসেবে চাকুরি করেছেন স্বল্প সময় (১৯৫২)।
শাহবাগের আজিজ মার্কেটে থাকাকালীন সময়ের কথা লিখতে গিয়ে গবেষক মফিদুল হক লেখেন “…. সাক্ষাতকার প্রদানে অনীহা ছিল প্রবল, একবার এক তরুনীকে অনুমতি দিয়েছিলেন তাঁর উপর ফটো ডকুমেন্টারি করার জন্য, কিন্তু তরুনী বিছানার ওপর দাঁড়িয়ে শয্যাগত আমানুলের ছবি তুলতে শুরু করল, মহাবিরক্ত হয়ে তাকে তাৎক্ষণিক বিদেয় জানাতে বাধ্য হয়েছিলেন । হাঁপানির কারনে কাবু হলেও নিজের শয্যাগত অবস্থান কাউকে দেখাতে রাজি হতেন না”। রাজধানীর শাহবাগে আজিজ কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির একটি ফ্ল্যাটে আমানুল হক একাকি থাকতেন শেষ বছরগুলোতে। নিজের এক একাকী জীবন গড়ে তোলেন সময়ের সাথে, সেই রাজ্যে তিনি ছিলেন এক রাজা।
আলোকচিত্র দ্বারা ভাষা আন্দোলনে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১১ সালে একুশে পদকপ্রাপ্ত কিংবদন্তী এই ফটোগ্রাফার ৫২ র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের ছবি ছাড়াও যে কাজের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন তা হল সত্যজিৎ রায়ের অনেক চলচ্চিত্রের আনঅফিসিয়াল আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করে।
এক অসাধারন ছোট খাটো কিন্তু বিশাল মাপের শিল্পী ছিলেন। তখনকার আলোকচিত্র শিল্পীদের মাঝে আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ, নাইব উদ্দিন আহমেদ, ড: নওয়াজেশ আহমেদ ও আনোয়ার হোসেনের সাথে সখ্যতা ছিল বেশী। নাইব উদ্দিন আহমেদ ১৯৫১ তে জয়নুল আবেদিনের মাধ্যমে পাবলিক হেলথে একজন আর্টিস্ট হিসেবে চাকুরী শুরু করেন, আমানুল হক তখন সেখানে চাকুরি করতেন। দুজনের ভাল বন্ধুত্ব হয় এবং একসাথে প্রচুর ছবি তোলেন ঢাকা, বুড়িগঙ্গা নদী ও এর আশেপাশে। একই বয়সী ছিলেন দুজন, নাইব উদ্দিন আহমেদ ১০ মাসের বড় ছিলেন আমানুল হক থেকে। নাইব উদ্দিন আহমেদের ছেলে নওফেল আহমেদ জানান “প্রকৃতিপ্রেমি ও দেশপ্রেমিক এই দুজন একসাথে এক বিছানায় এক বালিশেও ঘুমিয়েছেন বহুদিন। এক টেবিলে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিয়েছেন। ১৯৫২ সালের আগে ও পরে জয়নুল আবেদীনের সাথে ঘুরে বেড়িয়েছেন, বহু ছবি তুলেছেন একত্রে। (নওফেল আহমেদ, ফোনালাপ, জানুয়ারি ২০২৬)
বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ফটোগ্রাফারদের মধ্যে উনি একজন। মজার বা অবাক করা ব্যাপার এই যে, আমানুল হক কখনোই কোন দামি ক্যামেরা বা লেন্স ব্যাবহার করেননি।
বাংলাদেশের ২ জন ফটোগ্রাফার সত্যজিৎ রায়ের ছবি তুলেছেন কাছের মানুষ হিসেবে। এক আমানুল হক, অন্যজন সাঈদা খানম। দুজনেরই প্রকাশনা রয়েছে সত্যজিৎকে নিয়ে। সত্যজিতের ঘরের মানুষ হয়ে গেছিলেন তিনি। যতগুলো চিঠি চালাচালি হয় তাদের মাঝে, তা দেখলেই ধারনা করা যায়। ক্যামেরায় চোখ রাখা সত্যজিত, আমানুল হকের তোলা ছবিকে তিনি বলেছিলেন “আমার ২য় সেরা পোরট্রেট”, প্রথমটি ছিল ম্যাগনামের মার্ক রিবুর তোলা। আমানুল হকের মৃত্যুতে সত্যজিৎ পুত্র সন্দীপ রায় (খোকন) লেখেন ‘’পরিবারের একজন সদস্য হারালাম”। ৬০ দশকে কলকাতার বৌবাজার থেকে পুরানো জিনিস বিক্রি করা এক ভাংগারির দোকান থেকে কম দামে একটি ভাঙাচোরা ক্যামেরা কিনেছিলেন আমানুল হক, যা দিয়েই সত্যজিৎ এর সমস্ত ছবি তুলেছেন। সত্যজিৎ তাকে প্রায়ই বলতেন “এই ক্যামেরা দিয়ে আপনি কেমন করে ছবি তোলেন “!
১৯৫২ তে ভাষা আন্দোলনের গুলিবিদ্ধ শহীদ রফিকের সেই বিখ্যাত ছবি তুলে পুলিশের রোষানলে পড়েছিলেন আমানুল হক। এই ছবি ছাত্রদের লিফলেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সারা শহরে। ফটোগ্রাফারকে খুঁজতে থাকে পুলিশ। পালিয়ে বেড়াতে থাকেন আমানুল, তাঁর চাকরিটা চলে যায়। এভাবেই কেটে যায় দুটো বছর।
১৯৫৯ সালে কলকাতা চলে যান আমানুল ও প্রায় এক দশক ছিলেন সেখানে। যুদ্ধের সময়ে ছবি তুলেছেন দেশে ফিরে। কলকাতায় ভাল কাজের অফার পেয়েও দেশের টানে ফিরে আসেন। কিছু সময় যদিও এক ইংরেজ এজেন্সিতে কাজ করেছেন, আমানুল হক স্মরন করেন ‘“সুনীল জানা-র সমান মাইনে পেতাম “। ছবি আঁকা, টাইপিং, স্টেনোগ্রাফি ও বেহালা বাজানোয় পারদর্শী ছিলেন। কলকাতায় থাকতে টাইপ করে ও বেহালা বাজিয়েও আয়-উপার্জন করেছেন।
ভাবা যায় সত্যজিৎ চিঠিতে তাকে লিখেছেন “তোমার আর্থিক দূরাবস্থা জেনে ব্যাথিত হলাম “, আবার আরেক জায়গায় “ আর্থিক দূরাবস্থার কারনে পথের পাচালি-র কাজ বন্ধ “ এটাও জানা যায়।
ছবি তোলা ছিল তার একমাত্র শখ। অবশ্য বিভিন্য ম্যাগাজিনের কাভারে (বিশেষ করে বিচিত্রায় ও বেগম ম্যাগাজিনে) ছবি দিয়ে কিছুটা আয় হত। কখনো কোথাও ছবি দেননি পরিচিতি বা পুরস্কারের আশায়। টানা ২ দশক বিচিত্রার কাভারে তার ছবি ব্যাবহৃত হয়েছে অগনিতবার। তাঁর লেখার হাত ছিল চমৎকার। ছবি তোলা ছাড়া ছবি আঁকা ও বেহালা বাজাতে পছন্দ করতেন তিনি। বড় হয়ে জয়নুল আবেদিনের উৎসাহেই কিছুদিন আর্ট কলেজে লেখাপড়াও করেছেন।
১৯৫৪ সালে বাংলা একাডেমিতে নিজের ১০০ টি ছবির প্রদর্শন করেছিলেন। সেই প্রদর্শনী দেখে জয়নুল আবেদিন তার ছবির প্রশংসা করেছিলেন। ১৯৫৭ সালে ভাসানি’র সম্মেলনে ২য় প্রদর্শনী করেছিলেন। এছাড়া আর কোন একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয়নি। এটা একটি অবাক করার মত ব্যাপার। ২০২৬ এর জানুয়ারিতে ছবিমেলা ১১ তে আমরা দেখতে পাই স্বাধীন বাংলাদেশে আমানুল হকের প্রথম একক প্রদর্শনী। আমানুল হকের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর পুরো জীবনের কাজ প্রদর্শিত হয়। জন্মের ১০০ বছর পর এই সম্মান পাওয়াটা এটিই আমাদের মনে করিয়ে দেয় তিনি দেশের একজন সেরা আলোকচিত্রী এবং আগামী শতবর্ষে তাঁকে নিয়ে নতুন প্রজন্ম নতুন করে গবেষনা করবে।।
বেঁচে থাকতেই একুশে পদক, বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ, মাসিক ৫ হাজার ভাতা ইত্যাদি সম্মান পেয়েছেন। ২০১১ সালে পাওয়া একুশে পদক (সোনার মেডেল) ও সনদ আমানুল হক দান করে যান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। একটি বাড়িও দেয়া হয়েছিল, সেটিও ফিরিয়ে দেন বিনয়ের সাথে।
অনেকের কাছে খুব রাশভারি, যারা মিশেছেন তারা জানেন ভেতর থেকে কতটা শিশুসুলভ ছিলেন তিনি।
আমানুল হকের প্রকাশনা
(১) একুশের তসমুক (২০০৩) বাংলা ও ইংরেজী
(২) প্রসংগ সত্যজিৎ (২০১০)
(৩) ক্যামেরায় স্বদেশের মুখ (২০১৩)
(৪) স্মৃতিকথা (২০১৬)
(৫) ফ্রেমিং এন এরা – বিচিত্রা কাভারস (২০২৫)
‘ক্যামেরায় স্বদেশের মুখ’, সাহিত্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত বইটি (২০১৩) মফিদুল হক ও আমানুল হকের যৌথ প্রচেস্টায় আমানুল হকের জীবিতাবস্থাতেই আলোর মুখ দেখতে পায়। ৮৭/৮৮ বয়সেও আমানুল হক লম্বা সময় নিয়ে বইয়ের ছবি বাছাই ও লেখা দেয়ার কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন। বইটি উৎসর্গ করা হয় অনাথ মাঝিকে, যিনি তার ১ বছর আগেই দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেন।এইদিক দিয়ে তিনি ভাগ্যবান বলতে হবে, মৃত্যুর আগেই রেট্রোস্পেক্টিভ বই প্রকাশ ও পদকপ্রাপ্তির সুযোগ সবার ভাগ্যে জোটেনা। সত্যজিত বইটির কাজও আমানুল হক বেঁচে থাকতেই চমৎকার ভাবে তার লেখনী সহ প্রকাশ করে যেতে পেরেছেন।
লেখক, গবেষক মফিদুল হক তার লেখায় আমানুল হক নিয়ে বলেন “ আমানুল হক নিভৃতচারী মানুষ, তবে নিভৃতে যাঁদের বিচরণ, তাঁরা সাধারণত গণ্য হন জীবন থেকে সরে যাওয়া অথবা জীবনবিবাগী মানুষ হিসেবে। অথচ তেমন মানুষ তো আমানুল হক কখনোই ছিলেন না, ছিলেন প্রবলভাবে জীবনবাদী। জীবনের অর্থময়তা খুঁজেছেন বড়ভাবে এবং ক্যামেরার লেন্সে বিপুলা জীবনের রূপচ্ছবি মেলে ধরবার আকুতি বহন করেছেন সর্বদা। তারপরও তিনি যে নিভৃতচারী হিসেবে বিবেচিত হন, তার কারণ তিনি চারপাশের আর সব মানুষ থেকে ছিলেন একেবারে আলাদা, প্রচলিত অর্থে সফলতা অর্জনে যে-দৌড় বা সে-ধরনের তাগিদে যেসব ভিড় দেখা দেয়, সেখানে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়নি কখনো, কখনো তিনি হননি যশের কাঙাল। তিনি গুণী আলোকচিত্রশিল্পী, অথচ বাংলাদেশে কখনো তাঁর কোনো আলোকচিত্র-প্রদর্শনীর আয়োজন হয়নি। এসব প্রদর্শনীর জন্য যে-ধরনের উমেদারি করতে হয় বাণিজ্যের ও মিডিয়ার, সঠিক কলের কাঠি নাড়াতে হয় ঠিকঠাকভাবে, সেসব তাঁর রপ্ত ছিল না, তেমন বিদ্যা অর্জনে কোনো আগ্রহও বোধ করেননি। এমন নিভৃতচারিতা সত্ত্বেও দেশের মানুষ আমানুল হককে জেনেছে ‘আমার দেশ’ চিত্রমালার শিল্পী হিসেবে, এমন ব্যতিক্রমী ও অন্তহীন সিরিজ-কাজ আর কেউ এদেশে করেছেন কিনা জানা যায় না। সৃজনশীল আলোকচিত্রীরা নানা ধরনের সিরিজ-কাজ করেন, আমানুল হক জীবনভর একটি সিরিজের কাজই করেছেন, ‘আমার দেশ’। বাংলার পথে-প্রান্তরে, বিশেষভাবে নদী ও নদী-তীরবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা ও জীবনসংলগ্ন প্রকৃতি চিত্রায়িত করে বেরিয়েছেন তিনি। নৌকো নিয়ে ঘুরেছেন যমুনার শাখা-প্রশাখা বেয়ে, হেঁটেছেন চরের তপ্ত বালু পেরিয়ে মাইলের পর মাইল, আর দূরবর্তী ও দুঃখসহা মানুষের নিত্যকার জীবনধারায় খুঁজেছেন বাংলার চিরন্তনতা, স্বদেশের আত্মা, আমার দেশ।”
এই মহান শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা।
লেখক: আলোকচিত্রী
