খালেদা জিয়ার চিরস্মরণীয় বিদায়

জান্নাতুন নাঈম প্রীতি

খালেদা জিয়া এবং তার অসুস্থতাকে প্রায় লাইম লাইট থেকে সরিয়ে দিয়েছিল হাদী হত্যাকাণ্ডের পরের ইচ্ছাকৃতভাবে করা নৈরাজ্য। অন্তত মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে খালেদা জিয়া আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলেন। এবার একটা জরুরী কথা বলি- খালেদা জিয়ার জীবনে যদি একটা অর্জন থাকে তাহলে সেটা হচ্ছে দলের ভবিষ্যত হিসেবে তারেক রহমান, জাইমা রহমান এবং তার পুত্রবধূকে রেখে যাওয়া। দুনিয়ায় কয়জন নেতা ফিউচার নেতা রেখে যায়?

এইজন্যই খালেদা জিয়ার প্রয়াণ এবং তারেক রহমান আসায় তিন ধরনের ব্যাবসা বন্ধ হওয়ার পথে- এক নম্বর শাহবাগে জামাতিদের হাদী ব্যবসা, দুই নম্বর ‘আমার দেশ’ পত্রিকার ও এনসিপির প্রার্থীদের মব ও জুলাই ব্যাবসা, তিন নম্বর আওয়ামিলীগের আপা ব্যাবসা।

মজার ব্যাপার হলো জামাতিদের অপছন্দের শরিফ ওসমান হাদী কেমন করে জামাতের ব্যাবসার বিষয়বস্তু হয়ে গেলো সেটা নিয়ে হাদীর ফ্যামিলির লোকজনের ক্ষোভ, ওই ফ্যামিলির শর্সিনা পীরপন্থী রাজনৈতিক অবস্থান, হাদীর ফ্যামিলির কথা না শুনে নজরুলের পাশে কবর দেয়া- এগুলো সবই একাত্তরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়ার আচরণ এবং এগুলো একটা স্টেজড ড্রামা।

যে হাদীর রাজনৈতিক অপরিপক্কতা তাকে কাদের মোল্লার ফাঁসীর পরে কান্নাকাটি জুড়ে দিতে বাধ্য করেছে, যে হাদীকে জামাতের লিডাররা প্রায় বিদাত বলে খারিজ করে দিচ্ছিল সেই হাদী কেমন করে এদের আইডল হয়ে গেলো মানুষজন সেটা দিনের আলোর মতো দেখছে। ফলে শাহবাগের নাম বদলে দেয়ার পরেও কিছুই যায় আসছেনা।

দ্বিতীয়ত ‘আমার দেশ’ এবং এনসিপির জুলাই ও মব ব্যাবসা- এনসিপির হাসনাতদের সাথে ‘আমার দেশ’ পত্রিকার মাহমুদুর রহমানরা মব উস্কে দিয়ে, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে ভাংচুর করায় যে ভূমিকা রেখেছে সেটার টাকার উৎস, ভারতের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়া, মাহমুদুর রহমানের চার ডলার দিয়ে কেনা তুরস্কের পাসপোর্ট, মবের উস্কানী দেয়া পিনাকীর তুরস্কে যাওয়া সবকিছু ফাঁস হওয়ার পরে এনসিপি দেখবেন যুক্ত হয়েছে জামাতে।

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রবীণ প্রতিদ্বন্দ্বীরা চলে যাচ্ছেন। একদিন আমরা শুনবো শেখ হাসিনাও মারা গেছেন। কিন্তু তিনি এরকম চিরস্মরণীয় বিদায় পাবেন কি? আমার ধারণা পাবেন না। এই প্রশ্নের উত্তর দিবে সময়। তবে যে অঘোষিত উত্তর আছে সেটা হলো: মৃত্যু সবসময় সবাইকে সবকিছু ফিরিয়ে দেয়না- অনেক কিছু কেড়েও নেয়। খালেদা জিয়ার প্রয়াণে শেখ হাসিনা ছাড়া একথা কে ভালো জানেন? খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার জন্য রাজনীতির মাঠ ছেড়ে দিয়ে গেলেন। কিন্তু সেই মাঠে হাসিনা কই?

অতীতে নাহিদ, হাসনাতদের সরাসরি স্টেটমেন্ট আছে জামাতের বিরুদ্ধে। কিন্তু এরা হঠাৎ ভোল পাল্টেছে কেন জামাতের সাথে?

কারণ জুলাই ব্যবসার লালবাতি। এরা জানে জুলাই আন্দোলন বেচে এরা একাত্তর নিয়ে ফাজলামো করতে পারবেনা, এরপর আবার সাধারণ শিক্ষার্থী সাজতে পারবেনা। সুতরাং এরা যুক্ত হয়েছে বেঈমান জামাতের সাথে। জামাতের মতো একটা ভুঁইফোর দলকে এরা শেল্টার ভাবছে কারণ এদের রাজনৈতিকভাবে পায়ের নিচে মাটি নাই। এরা গেছে এমন দলের সাথে যাদের পায়ের নিচের মাটি তৈরী হয়েছে পাকিস্তানপ্রেম আর মওদুদীবাদের মতো অথর্ব তত্ত্ব দিয়ে।

যতই জুলাই যোদ্ধা হিসেবে হম্বিতম্বি করুক এনসিপি- বাংলাদেশের পলেটিক্যাল কালচারে আওয়ামিলীগ বিএনপি ছাড়া স্টেবল রাজনৈতিক দল নাই।

তিন নম্বর আওয়ামিলীগের আপা ব্যবসা। আওয়ামিলীগ অসংখ্যবার বলার চেষ্টা করেছে হাসিনা ঠিক কাজ করেছে জুলাইয়ে ছাত্রদের ওপর গুলি করে, মানুষকে গুম করে, মানুষকে কার্টুন আঁকায়, ফেসবুকে লেখায় টর্চার করে, হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে, কাওমী জননী হয়ে। কিন্তু হাসিনার বিরুদ্ধে যখন জুলাই আন্দোলন দাঁড়িয়ে গেছে, তখন অসংখ্য মানুষকে হত্যার পরে ফাইনালি হাসিনার পালাতে হয়েছে হেলিকপ্টারে। তার পোষা সেনাবাহিনী কিংবা দল তাকে বাঁচাতে পারেনি। দল ও দেশের প্রধান হয়েও একজন পলিটিক্যাল ফিগারের জন্য দেশ থেকে পালানো একটা পলিটিক্যাল আত্মহত্যা এবং মেজর ব্যার্থতা। যেকারণে খালেদা জিয়া জেল নিশ্চিত জেনেও আওয়ামী হেফাজতে থেকেও বিদেশে যাননি, সেই একই কারণে বিদেশে গিয়ে শেখ হাসিনা নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নিজে শেষ করে দিয়েছেন।

ভবিষ্যতে আওয়ামিলীগ আবার ফিরবে, কিন্তু শেখ হাসিনাকে নিয়ে আর কখনোই না।

খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পরে তারেক রহমান এইজন্যই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই মুহূর্তে মানুষের দরকার অশান্তি এবং অরাজকতা থেকে মুক্তি। দীর্ঘ আঠারো বছর পর সেকেন্ড সুযোগ পাওয়া যেকোনো রাজনীতিবিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তারেক রহমান এই সুযোগ মিস করবেন বলে আমার মনে হয়না।

এক সময় আমার ধারণা ছিলো রাজনীতিতে ফ্যামিলির জড়িত থাকার দরকার নাই, কিন্তু ফ্যামিলির শিক্ষা ছাড়া রাজনীতিবিদরা কেমন হয় সেটা দেখতে ডক্টর ইউনূসের কেবিনেট, এনসিপির অনভিজ্ঞ মবস্টাররাই যথেষ্ট। ডক্টর ইউনূসের মতো একাডেমিক স্টার রাজনৈতিকভাবে সুপার ফ্লপ হতে পারে, সেটার চাক্ষুষ প্রমাণ গত দেড় বছরে তাদের অদক্ষতা।

এইজন্যই তারেক রহমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে যারা কথা তুলছেন তাদের উচিত ইউনূসের সিভি পড়া বাদ দিয়ে গত দেড় বছর ইউনূস কি করেছেন ড্রোন শো করা আর বড়ো বড়ো কথা বলা ছাড়া সেটা রিভিশন করা। খালেদা জিয়াকে নিয়ে শেখ হাসিনা সংসদে দাঁড়িয়ে মজা করতেন- এইট পাশ ডেকে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পাশ হাসিনা বাংলাদেশের কি হাল করেছেন?

খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানের ফ্যানগার্ল আমি না। কিন্তু আমি মনে করিনা তারেক রহমানের চাইতে ভালো কেউ এইমুহূর্তে বাংলাদেশে আছে যে রাজনৈতিক জ্ঞান রাখে, যে দেশ চালাতে পারবে, যার একটা বিশাল দল চালাবার অভিজ্ঞতা আছে, যার ফ্যামিলি সরাসরি রাজনৈতিক ভিক্টিম হওয়ার কারণে তাকে নানান শিক্ষা পেতে হয়েছে- দলের বিপদে কারা পাশে থাকে সেটা দেখতে হয়েছে। বিদেশে বসে একটা দল চালানো কতটা কঠিন- No one knows better than him.

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন একজন রাজনীতিবিদের জন্য সবচেয়ে জরুরী যেটা সেটা হচ্ছে স্যরি বলতে শেখা। তারেক রহমান সেটা নানাভাবে বলা শুরু করেছেন। এটা তার মায়ের কাছ থেকেই পাওয়া সম্ভবত।

আপনি তার কর্মকাণ্ডের দিকে তাকান। তারেক রহমান তার নিজের কটুক্তিকারী যেন মুক্তি পায় সেটার উদ্যোগ নেয়া থেকে শুরু করে তাকে দেশের ফেরার অভিনন্দন জানানোর পরে নোংরা করা তিনশো ফিট রাস্তা সব ক্লিন করিয়েছেন দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে।

এইজন্যই অঘোষিত সত্য এই যে- খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পরে এই মুহূর্তে যদি কারোর প্রাণনাশের হুমকি থাকে তাহলে সেটা আছে মূলত তারেক রহমানের। এইজন্যই উনার সেফটি নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরী।

খালেদা জিয়া আমাদের আবারো শিখিয়ে দিয়ে গেছেন- Slow and steady wins the race! এইজন্যই সম্ভবত যাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি বাংলাদেশেই থেকে গেছেন।

Goodbye Khaleda Zia- our iron lady!

I wish good luck for Tarek Rahman and BNP. There is nothing better than a stable country with a stable leader.

স্টেবল দেশের কতটা প্রয়োজন সেটা জুলাই আন্দোলন আর তার পর থেকে ঘটা সব ঘটনা বিবেচনা করলে কে ভালো জানে বাংলাদেশের মানুষের চাইতে?

। ২।

খালেদা জিয়ার জন্য বিজয় সরণি থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মানুষ দাঁড়িয়ে গেছে শোক প্রকাশ করতে, কোনো বিরিয়ানির প্যাকেট লাগেনি, কোনো টাকা দেয়া লাগেনি, বাস ভরে লোক আনা লাগেনি। যেকোনো রাজনীতিবিদের জন্য এইটা একটা লেসন। খালেদা জিয়া শুদ্ধ ছিলেন না, ভুলের উর্ধ্বে ছিলেন না- কিন্তু শেখ হাসিনা মিথ্যা মামলায় উনাকে আটকে রেখে যে ক্ষতি করতে চেয়ে উপকার করে দিয়েছে, সেটা হচ্ছে- খালেদা জিয়াকে গণমানুষের নেত্রী বানিয়ে দিয়েছে! আমরা যারা অত্যাচারিত হয়েছি অপমানিত হয়েছি হাসিনার বানানো ভুয়া আদালতে দাঁড়িয়ে কেবল লেখার জন্য- তারা আজ সবাই সমব্যাথী হয়েছে খালেদা জিয়ার জন্য।

বাংলাদেশের ইতিহাসে খালেদা জিয়ার বিদায় অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে একারণেই।

খালেদা জিয়ার বাসার গৃহকর্মী হিসেবে ছিলেন যে ফাতেমা বেগম- তিনিও হয়ে গেছেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কি কারণে স্বেচ্ছায় কারাবরণ বেছে নিয়েছিলেন এই ফাতেমা বেগম কেবল খালেদা জিয়ার সাথে থাকতে চেয়ে?

খালেদা জিয়ার দলের এক সময়ের মিত্র জামাতকে কেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফ্লোর দেয়া যাবেনা- সেটার জীবন্ত লেসনও খালেদা জিয়া মারা গিয়ে দিয়ে গেছেন।

জামাতের এলাই, শিবিরের ইশরাকরা খালেদা জিয়াকে পাপী, উনি আগেই মারা গেছেন টাইপ মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, হাদীর ছবির সাথে উনার ছবি জুড়ে দিয়েছে কেবলমাত্র আলোচনা খালেদা জিয়ার জন্য শোক থেকে সরাতে।

খালেদা জিয়ার প্রয়াণ বাংলাদেশের জীবিত রাজনীতিবিদদের জন্য একটা লেসন। তারেক রহমান খালেদা জিয়ার প্রয়াণকে রাজনীতির মাঠ বানাননি, এইটা একটা গুরুত্বপূর্ণ লেসন। আমরা বাংলাদেশের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত শোক প্রকাশ দেখেছি তার কল্যাণে।

খালেদা জিয়া ছিলেন এক সাধারণ গৃহবধূ, সেখান থেকে হয়ে উঠেছিলেন একজন রাজনীতিবিদ, জীবিত থাকাকালে এমন কোনো নোংরা অপবাদ নেই যা তাকে সহ্য করতে হয়নি। শেখ হাসিনা সরাসরি বলেছিলেন সংসদে দাঁড়িয়ে- এতো বয়স হয়েছে তবু মরেনা কেন?

খালেদা জিয়া মারা গেছেন। তার মৃত্য কামনা চাওয়া সেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা এখন বিদেশে, দেশের মানুষের আন্দোলনে বিতাড়িত হয়েও তাকে শোক প্রকাশ করতে হয়েছে। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন- আমরা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও, শত্রু না। বাংলাদেশের শত্রু মূলত জামাত।

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রবীণ প্রতিদ্বন্দ্বীরা চলে যাচ্ছেন। একদিন আমরা শুনবো শেখ হাসিনাও মারা গেছেন। কিন্তু তিনি এরকম চিরস্মরণীয় বিদায় পাবেন কি? আমার ধারণা পাবেন না।

এই প্রশ্নের উত্তর দিবে সময়। তবে যে অঘোষিত উত্তর আছে সেটা হলো: মৃত্যু সবসময় সবাইকে সবকিছু ফিরিয়ে দেয়না- অনেক কিছু কেড়েও নেয়। খালেদা জিয়ার প্রয়াণে শেখ হাসিনা ছাড়া একথা কে ভালো জানেন?

খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার জন্য রাজনীতির মাঠ ছেড়ে দিয়ে গেলেন। কিন্তু সেই মাঠে হাসিনা কই?

জার্মানি থেকে

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *