শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি ৩০ লাখের বেশি পাঠ্যবই

■ নাগরিক প্রতিবেদক ■

নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি ৩০ লাখের বেশি পাঠ্যবই। ১৫ জানুয়ারির মধ্যে শতভাগ বই বিতরণের যে প্রতিশ্রুতি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) দিয়েছিল, ২৫ জানুয়ারি পেরিয়েও তা পূরণ হয়নি।

এনসিটিবি বলছে, এবার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে মোট ১০৫টি প্রেসের মাধ্যমে ৩০ কোটি ২৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬৫৩ কপি পাঠ্যবই ছাপার পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে মুদ্রণ সম্পন্ন হয়েছে ২৯ কোটি ৯১ লাখ ১৮ হাজার ৩৫৪ কপি, যা শতকরা হিসাবে ৯৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

নথির তথ্য বলছে, ২৪ জানুয়ারি রাত ৮টা পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছেছে ২৯ কোটি ৭১ লাখ ৮০ হাজার ৮৫৯ কপি বই। ফলে, এখনো বিতরণ বাকি রয়েছে ৩০ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯৪ কপি পাঠ্যবই, যা মোট নির্ধারিত বইয়ের ১ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ কাগজে-কলমে প্রায় শতভাগ বিতরণ দেখালেও বাস্তবে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী এখনো পাঠ্যবই হাতে পায়নি।

এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ৬৭টি প্রেসের মাধ্যমে মোট ৮ কোটি ৫৯ লাখ ২৫ হাজার ৩৭৯ কপি পাঠ্যবই নির্ধারিত ছিল। এই স্তরে মুদ্রণ, পিডিআই এবং ডেলিভারি— তিন ধাপেই শতভাগ কাজ শেষ হয়েছে। একইভাবে, প্রাথমিক (সাধারণ) স্তরে মোট ৩১ কোটি ১০ লাখ ৯ হাজার ৩৪৭ কপি বইয়ের মুদ্রণ ও বিতরণ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। এই দুই স্তরে কোনো বই অবশিষ্ট নেই।

এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তরে মোট বই নির্ধারিত ছিল ১৮ কোটি ৩২ লাখ ৪ হাজার ৯২৭ কপি। এর মধ্যে মুদ্রণ সম্পন্ন হয়েছে ১৮ কোটি ২৯ লাখ ৮৩ হাজার ৮৫৮ কপি, যা শতকরা হিসাবে ৯৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ। তবে, বিতরণ পর্যায়ে গিয়ে এই হার কমে দাঁড়িয়েছে ৯৮ দশমিক ৩৩ শতাংশে। ফলে মাধ্যমিক স্তরেই আটকে রয়েছে পুরো ৩০ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯৪ কপি বই, যা এই স্তরের মোট বইয়ের ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

শ্রেণিভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে মোট ৪ কোটি ৪৩ লাখ ১৭ হাজার ৫০৯ কপি বই নির্ধারিত ছিল। এর মধ্যে মুদ্রণ শতভাগ সম্পন্ন হলেও উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছেছে ৪ কোটি ৪২ লাখ ৪ হাজার ৮৬৬ কপি। ফলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে এখনো ১ লাখ ১২ হাজার ৬৪৩ কপি বই বিতরণ বাকি রয়েছে, যা শতকরা হিসাবে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ।

সপ্তম শ্রেণিতে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে খারাপ। এই শ্রেণিতে মোট নির্ধারিত বই ছিল ৬ কোটি ৭ লাখ ৫ হাজার ৯০০ কপি। মুদ্রণ সম্পন্ন হয়েছে ৯৮ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং ডেলিভারি সম্পন্ন হয়েছে ৯৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ফলে এখনো ১০ লাখ ৭৬ হাজার ৩২২ কপি বই বিতরণ বাকি রয়েছে, যা মোটের ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ। মাধ্যমিক স্তরের মোট বিতরণ না হওয়া বইয়ের বড় অংশই সপ্তম শ্রেণির।

অষ্টম শ্রেণিতে মোট নির্ধারিত বই ছিল ৩ কোটি ৯৭ লাখ ২৫ হাজার ৫৮৮ কপি। এর মধ্যে মুদ্রণ প্রায় সম্পন্ন হলেও বিতরণ হয়েছে ৩ কোটি ৯৫ লাখ ৯০ হাজার ৯২৩ কপি। ফলে এই শ্রেণিতে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬৫ কপি বই এখনো পৌঁছায়নি, যা শতকরা হিসাবে শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ।

নবম শ্রেণিতে মোট ৫ কোটি ৭ লাখ ৬৮ হাজার ৯২৪ কপি বইয়ের মুদ্রণ শতভাগ হলেও বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে ৯৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এতে অবিতরণকৃত থেকে গেছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৪৪৯ কপি বই, যা মোটের শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ।

চলতি মাসের মধ্যে সব বই বিতরণ সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বিতরণ নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মতিউর রহমান খান পাঠান।

তিনি বলেন, চলতি শিক্ষাবর্ষে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে শতভাগ বই বিতরণের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সম্পন্ন করা যায়নি। মুদ্রণ প্রক্রিয়ায় ‘শর্ট বই’ নামে একটি স্বাভাবিক সমস্যা থাকে। কাগজ কাটা, ছাপার সময় কাগজ নষ্ট হওয়া কিংবা মুদ্রণ ত্রুটির কারণে প্রতিটি প্রেসে কিছু সংখ্যক বই কম-বেশি হয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি বইয়ের ক্ষেত্রে ১০–১৫ হাজার কপি বা কোথাও ২০–২৫ হাজার কপি পর্যন্ত ঘাটতি তৈরি হয়, আবার কোথাও কয়েক হাজার কপি কম থাকে। সব মিলিয়ে এই ঘাটতির কারণেই সামান্য একটি শতাংশ বই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিতরণ করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, এনসিটিবির কাছে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বই বিতরণের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড রয়েছে এবং সেই তথ্য অনুযায়ী অধিকাংশ বই ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বর্তমানে অবশিষ্ট প্রায় এক শতাংশ বই রয়েছে৷ তবে সেটি সংখ্যার হিসাবে কম নয়। মোট বইয়ের পরিমাণ বেশি হওয়ায় এই এক শতাংশ মানেই কয়েক লাখ কপি। আমরা আশা করি আগামী ২৮ জানুয়ারির মধ্যে শতভাগ বই বিতরণ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

অন্যদিকে, সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছাতে টেন্ডারসহ ছাপা সংক্রান্ত কার্যক্রমগুলো আগে থেকেই শুরু করার তাগিদ দিয়েছেন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী। তিনি বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও শিক্ষার্থীদের হাতে পহেলা জানুয়ারিতে বই পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করা হয়। শুরুতে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে শতভাগ বই বিতরণের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে বাস্তবতায় দেখা গেছে, নির্ধারিত সময়সীমা পুরোপুরি ধরে রাখা সব ক্ষেত্রে সম্ভব হয়নি।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *