■ নাগরিক প্রতিবেদক ■
রাজধানী ঢাকার আবাসিক এলাকাগুলোতে তীব্র গ্যাসসংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গ্যাসের স্বল্পচাপ ও সরবরাহ বন্ধ থাকায় দিনের পর দিন অনেক পরিবার রান্না করতে পারছে না।
রাজধানীর খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, সবুজবাগ, টিকাটুলী, গোপীবাগ, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, মাদারটেক, আদর্শপাড়া, শেওড়াপাড়া, বাড্ডা, উত্তরা, শনির আখড়া, রায়ের বাগ, জুরাইন, শ্যামপুর, বনানী, মগবাজার, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, ইন্দিরা রোড, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ও পুরান ঢাকার একাধিক এলাকায় গ্যাস সংকট লেগেই আছে।
রাজধানীর গ্যাসসংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশে গ্যাস পাইপলাইনে বড় ধরনের লিকেজ। আমিন বাজার থেকে আসাদ গেট পর্যন্ত বিস্তৃত গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস লাইনে এই সমস্যার কারণে মোহাম্মদপুর, আদাবরসহ আশপাশের এলাকায় গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে কয়েক লাখ গ্রাহক চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসিন্দা ও হোটেল ব্যবসায়ী রাশেদ মাহমুদ বলেন, চার দিন ধরে সকালে একেবারেই গ্যাস থাকে না। দুপুরের পর সামান্য চাপ আসে, কিন্তু সেটা দিয়ে ঠিকমতো রান্না করা যায় না। পরিবার নিয়ে হোটেলে খেতে হচ্ছে, খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
পশ্চিমা রাজাবাজারের বাসিন্দা রাফিজা খাতুন জানান, সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত গ্যাসের সমস্যার কারণে দুপুরের রান্না সন্ধ্যার পর করতে হয়। এছাড়া সকালের নাস্তা বানাতে আমাদের ফজরের নামাজের পরই কাজ শুরু করতে হয়। সারাদিন গ্যাসের চাপ না থাকার কারণে রান্না করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর রান্নার কাজ শেষ করতে পারি।
মিরপুরের শেওড়াপাড়া এলাকার গৃহিণী নাসরিন আক্তার বলেন, ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চুলা জ্বলে না। ছোট বাচ্চা নিয়ে খুব কষ্টে আছি। প্রতিদিন বাইরে থেকে খাবার আনতে হচ্ছে, কিন্তু এই দুর্ভোগ কতদিন চলবে– কেউ নিশ্চিত করে বলছে না।
আদাবরের রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী আবদুল কাদের বলেন, ‘এলাকায় আগেও গ্যাস সমস্যা ছিল, কিন্তু এখন পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। সকালে চা বানানোর মতো চাপও থাকে না। নিয়মিত বিল দিচ্ছি, অথচ সেবা পাচ্ছি না।’
মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন সিটির এক বাসিন্দা বলেন, “আজ (বুধবার) সকালে আমার বাসায় নাস্তা হয়েছে শুধু বিস্কুট দিয়ে। দোকানে ব্রেড পাওয়া যায়নি। রুটি-পরোটার হোটেলগুলোতে দীর্ঘ লাইন। আমি একটি স্কুলে শিক্ষকতা করি, আমাদের স্কুলে ডে-কেয়ারও আছে। শিশুদের জন্য স্কুলেই রান্না হয়, কিন্তু গ্যাস না থাকায় গত দুই দিন তা বন্ধ। ছোট বাচ্চাদের হোটেল থেকেই খাবার কিনে দিতে হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “গ্যাস না থাকায় বাড়ির সিনিয়র ও জুনিয়র সদস্যদের খাবার ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে। তাদের খাবারে নানা বিধিনিষেধ থাকে। এই সুযোগে ইনডাকশন চুলা ও রাইস কুকারের দামও বেড়ে গেছে। আমার এক সহকর্মীকে বাড়তি দাম দিয়ে ইনডাকশন চুলা কিনতে হয়েছে।”
পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার এক বাসিন্দা জানান, গত এক মাস ধরে তাদের বাসায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একেবারেই গ্যাস থাকে না। গত তিন দিন ধরে পুরোপুরি গ্যাস বন্ধ।
তিনি বলেন, “আজ সকালে গ্যাস না থাকায় নাস্তা না করেই অফিসে যেতে হয়েছে। হোটেলে গেলেও দীর্ঘ লাইনের কারণে খাবার পাওয়া যাচ্ছে না।”
তিতাস গ্যাসের একটি সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার আবাসিক খাতের তুলনায় শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ কারণে আবাসিক এলাকায় তুলনামূলকভাবে গ্যাস সরবরাহ কম রাখা হচ্ছে। সরকারের নীতিগত নির্দেশের আলোকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকার এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশও দিয়েছে।
এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, ‘আমিন বাজার থেকে আসা গ্যাস পাইপলাইনটি বুড়িগঙ্গা নদীর নিচে লিকেজ হয়ে গেছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে মোহাম্মদপুরসহ কয়েকটি এলাকায় গ্যাসের চাপ কমিয়ে রাখা হয়েছে।’ তিনি জানান, গত চার দিন ধরে কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরি দলের সমন্বয়ে ১৫ সদস্যের একটি টিম মেরামতের কাজ করছে। বুধবার একটি লিক ক্ল্যাম্প বসানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৯৯ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আশা করছি আগামী শনিবারের মধ্যেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা যাবে।
ঢাকার অন্যান্য এলাকার সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “তিতাসের বৈধ গ্রাহকদের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে অবৈধ সংযোগের কারণে কিছু এলাকায় বৈধ গ্রাহকরাও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না। আমরা অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু তিতাস একা এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।”
তিনি বলেন, “পরিস্থিতি অনেকটা চোর-পুলিশ খেলার মতো। আমরা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে গেলে আবারও অবৈধভাবে সংযোগ স্থাপন করা হয়। এতে বৈধ গ্রাহকরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। তিতাসের পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হতে হবে। তা না হলে গ্যাস সংকট কাটানো কঠিন হবে।”
রাজধানীতে বছরজুড়ে গ্যাসসংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ আমরা পাচ্ছি প্রায় ১ হাজার ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। পর্যাপ্ত গ্যাস না পেলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয় না। এ ছাড়াও সরকার থেকে কিছু নির্দেশনা রয়েছে। আমরা সেগুলো মেনে চলছি।’
এদিকে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এলপি গ্যাস বা সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন নির্ধারিত দামে কোথাও এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করছেন ভোক্তারা।
সংকটের প্রভাবে শহরের বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স দোকানে ইনডাকশন কুকার ও বৈদ্যুতিক চুলার বিক্রি বেড়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, কয়েক দিন ধরে চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে এবং দামও বেড়েছে।
