■ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ■
বিতর্কিত ফোনকল ফাঁস হওয়ার ঘটনায় থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতোংতার্ন সিনাওয়াত্রাকে পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে দেশটির সাংবিধানিক আদালত। মাত্র এক বছর ক্ষমতায় থেকেই বিদায় নিতে হল তাকে।
শুক্রবার (২৯ আগস্ট) আদালতের চূড়ান্ত রায়ে তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণ করা হয়। এর আগে গত ১ জুলাই তার পদ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল।
২০২৪ সালের আগস্টে থাইল্যান্ডের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন পেতোংতার্ন। তিনি প্রভাবশালী সিনাওয়াত্রা পরিবারের সদস্য এবং থাই রাজনীতিতে পরিচিত একটি মুখ।
বিতর্কিত ফোনকলটি ছিল কম্বোডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের সঙ্গে। সেই কল রেকর্ডে তাকে ‘আঙ্কেল’ সম্বোধন করে থাই সেনাবাহিনীর সমালোচনা করতে শোনা যায়। তিনি বলেন, থাই সেনাদের ভুলেই কম্বোডিয়ার এক সেনা প্রাণ হারায়।
ফোনকলে আরও শোনা যায়, তিনি হুন সেনকে বলেন, “যে কোনো কিছু চাইলে, আমাকে বলবেন। আমি বিষয়টি দেখব।”
এরপরই তাকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে তদন্তের মুখোমুখি হতে হয়। যদিও তিনি বলেছিলেন, উত্তেজনা প্রশমনের কৌশল হিসেবেই এমন কথা বলেছিলেন এবং পরে জনসাধারণের কাছে ক্ষমাও চান।
তবে বিরোধী দল ও জনমত তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং শেষপর্যন্ত আদালতের রায়ে তিনি পদচ্যুত হন।
পদচ্যুতির পরও তিনি সংস্কৃতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন কিনা বা থাকবেন কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা এখনও আসেনি।
ফোনকলটি ফাঁস হওয়ার সময় দুই দেশের সীমান্তে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল। ওই সময় থাইল্যান্ডের মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদও প্রচণ্ডরকমভাবে দেখা যাচ্ছিল। তখনই ফোনকলটি সামনে আসে। যা সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিরূপ প্রভাব ফেলে। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে পেতোংতার্ন গোপনে থাইল্যান্ডের স্বার্থকে বিসর্জন দিচ্ছেন।
এরপর তিনি সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমা চান। তিনি দাবি করেন, কম্বোডিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনের কৌশল হিসেবে তিনি এভাবে কথা বলেছিলেন।
এখন দেশটির আইনপ্রণেতারা যদি একমত হন তবে নতুন একটি সরকার গঠন করতে পারেন। তা সম্ভব না হলে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে সাংবিধানিক আদালতের হস্তক্ষেপ এটাই প্রথম নয়। এর আগেও আদালতের রায়ে কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। এ ছাড়া, আদালত এ পর্যন্ত ১১২টি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেছে। এর মধ্যে আছে সংস্কারপন্থী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া মুভ ফরোয়ার্ড পার্টি। দলটি ২০২৩ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছিল। কিন্তু সরকার গঠন করতে পারেনি। রাজতন্ত্রের ক্ষমতা খর্ব করার লক্ষ্য নেওয়ায় পরের বছর দলটি ভেঙে দেন সাংবিধানিক আদালত। নিষিদ্ধ করা হয় এর নেতাদের।
গত জুন মাসে কম্বোডিয়ার নেতা হুন সেনের সঙ্গে ফোনে আলাপ করেন পেতাংতার্ন। পরে যা হুন সেন নিজে ফাঁস করে দেন। শুক্রবার সাংবিধানিক আদালত রায়ে বলেছেন, ওই ফোনকলের মাধ্যমে পেতংতার্ন নৈতিকতার লঙ্ঘন করেছেন।
বিবিসি বলছে, আদালতের বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্তের কারণে মানুষের মধ্যে এক ধরনের বিশ্বাস জন্ম হয়েছে। সেটি হলো, রক্ষণশীল ও রাজতন্ত্রপন্থীরা যাদের হুমকি মনে করে আদালত সবসময় তাদের বিরুদ্ধে রায় দেন। বিশ্বে খুব কম দেশেই বিচার বিভাগের একটি শাখা রাজনীতিতে এমন কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।
এখন প্রশ্ন উঠছে হুন সেন কেন তাঁর বন্ধুর মেয়ের সঙ্গে হওয়া আলাপ ফাঁস করলেন। বিবিসি বলছে, বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। তবে পেতংতার্ন শিনাওয়াত্রা সীমান্ত বিরোধ নিয়ে একটি মন্তব্য করেছিলেন। বলেছিলেন, সীমান্ত বিরোধ নিয়ে নিজেদের যুক্তি তুলে ধরার জন্য কম্বোডিয়ার নেতৃত্বের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করাটা অপেশাদার। হুন সেন বেশ রেগে গিয়ে এর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন। তিনি পেতংতার্নের মন্তব্যকে অপমান হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। বলেছিলেন, এমন ঘটনাই তাঁকে সত্য প্রকাশে বাধ্য করেছে।
কিন্তু হুন সেনের সত্য প্রকাশের সিদ্ধান্ত থাইল্যান্ডে নতুন করে রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে। কম্বোডিয়ার সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে উত্তেজনা উসকে দেয়। গত মাসে এই দুই দেশের সীমান্তে সেনাদের মধ্যে পাঁচদিন ধরে সংঘাত চলে। এতে ৪০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান। থাইল্যান্ডে সাংবিধানিক আদালত গঠিত হয় ১৯৯৭ সালে। তখন বলা হয়েছিল, সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক দল অপসারণের মতো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন আদালত। কিন্তু তখন থেকেই সমালোচকরা অভিযোগ করে আসছেন আদালত সেনাবাহিনীর পক্ষপাতদুষ্ট।
২০০৬ সালে থাকসিন শিনাওয়াত্রার অভিশংসনের জন্য আদালতে আবেদন করেছিলেন সংসদ সদস্যরা। থাকসিনের বিরুদ্ধে পরিবারিক কোম্পানির শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে স্বার্থ সংঘাতের অভিযোগ আনা হয়। তবে আদালত আবেদনটি খারিজ করে দেন। বিচারকরা বলেন, অভিযোগ প্রমাণের যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
তবে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ আদালত ২০০৮ সালে পদচ্যুত করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সামাক সুনদারাভেজকে। সামাক একটি টেলিভিশন চ্যানেলের রান্নার অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নামমাত্র পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন।
২০১৪ সালে আদালত অপসারণ করেন প্রধানমন্ত্রী ইংলাক শিনাওয়াত্রাকে। জাতীয় নিরাপত্তা প্রধানকে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে।
গত বছর অপসারণ করা হয় স্রেথা থাভিসিনকে। তাঁর বিরুদ্ধেও নৈতিকতা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছিল। তখন বলা হয়েছিল, বিচারককে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টার দায়ে কারাভোগ করা এক ব্যক্তিকে মন্ত্রিসভায় জায়গা দিয়েছিলেন থাভিসিন।