বিভুরঞ্জন সরকার, সাংবাদিকতা এবং আমি

মঈন আব্দুল্লাহ

সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের মরদেহ উদ্ধারের দিন কিছু কথা মনের ভিতর ঘোরপাক খাচ্ছে। সেসব কথাই আজকে বলতে এসেছি। ভেবেছিলাম এসব কথা মানুষকে জানিয়ে কী লাভ। কিন্তু বিভু দার পরিণতি দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না।

২০২৩ সালের অক্টোবর মাস : দৈনিক আমাদের সময়ের সিনিয়র সহকারী সম্পাদক থেকে আমাকে প্রমোশন দেয়া হবে। এমন একটা আওয়াজ পুরো অফিসে। সেই অনুযায়ী কাজ করার পরামর্শও দিয়েছেন তৎকালীন সম্পাদক আবুল মোমেন ভাই। কিন্তু বিষয়টি ভালোভাবে নেননি তৎকালীন উপদেষ্টা সম্পাদক খন্দকার শওকত হোসেন। সেই থেকে শুরু। আমার প্রমোশন লেটারও তৈরি ছিল। কিন্তু এইচ আরকে ফোন করে সেই লেটার সম্পাদকের কাছে না দেওয়ার হুকুম করেন শওকত হোসেন। যা আমি নিজেও জানতাম। তাতেও দুঃখবোধ ছিল না আমার।

২০২৩ সালের নভেম্বর মাস : আমাদের সময়ে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে আসলেন মাইনুল আলম। তখন থেকেই বুঝতে পেরেছি আমাকে নিয়ে অফিস নতুন করে ভাবছে। চাকরিটা হয়তো বেশিদিন থাকবে না। তাই চাকরি চাইতে গেলাম কালবেলার সম্পাদক সন্তোষ শর্মার কাছে। উনি আশ্বাস দিলেন, আমাদের সময় বের করে দিলে উনি চাকরি দিবেন। এতে সাহস পেলাম।

২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাস : এই মাসটি আমাকে খুবই প্যারা দিয়েছে। অফিসের সকল মিটিং থেকে আমাকে দূরে রাখা হয়। কোনো মিটিংয়েই ডাকা হয় না। অনেকটা ওএসডি হিসেবে গেছে মাসটা। তারপরও ১২ তারিখে হেড অফিসে মিটিং করে অনলাইন ও ডিজিটালের দায়িত্ব দেয়া হয়। যদিও ৩ বছর আগে থেকেই এ সেকশনটা আমি দেখভাল করতাম। পরে বুঝতে পেরেছি, আসলে এটা ছিল আমাকে পত্রিকা থেকে দূরে সরানোর চক্রান্ত।

২০২৪ সালের মার্চ মাস : ৯ তারিখে দৈনিক আমাদের সময়ের তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক মাইনুল আলম সকাল ১১টার দিকে আমাকে ফোন করে বললেন আপনি দেখা কইরেন। আমি তখন অফিসেই। ২টার দিকে অফিসে আসলেন মাইনুল আলম। আমাকে জানিয়ে দিলেন যত দ্রুত পারি রিজাইন দিতে। এর দুই দিন আগে আমাদের সময়ের মালিকপক্ষ ইউনিক গ্রুপের সিইও আমাকে এমন কিছু হতে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছিলেন। তাই আমি সহজেই বিষয়টি মেনে নিয়েছিলাম।

২০২৪ সালের এপ্রিল মাস : আমি চাকরির জন্য আবার দেখা করতে গেলাম সন্তোষ শর্মার সঙ্গে। এবার পুরো উল্টো চিত্র দেখতে হলো আমাকে। সন্তোষ দা যেন আমাকেই চিনেই না। আমাকে চাকরি দিতে হলে ডান-বাম অনেকের সঙ্গে কথা বলতে হবে বলে জানালেন। আমি বুঝতে পারলাম, কালবেলায় চাকরি হবে না। কিন্তু সবচেয়ে খারাপ বিষয়টি ছিল, ছয় মাস আগের কথা বলার স্টাইল আর পরের স্টাইল। যাক সেই মাসেই আমি জয়েন করলাম ডেইলি ম্যাসেঞ্জারে। ইংরেজি দৈনিকে প্রথম কাজের অভিজ্ঞতা নিতে খারাপ লাগেনি।

এই কয়েকটি মাস আমার জীবনের খুবই খারাপ সময় ছিল। সাংবাদিকতায় কখনই অন্যের ক্ষতি করেনি, পারলে উপকার করেছি। কিন্তু আমি যখন চাকরি খোঁজেছি তখন বুঝতে পারলাম আমাকে অনেকেই পছন্দ করেননা। যারা এমন ভাব দেখালেন তাদেরও উপকার করার চেষ্টা করেছি। সাংবাদিক জীবনে অভাব-অভিযোগ থাকবে এটা আমাদের মতো মানুষরা মেনেই নিয়েছি। ভেবেছিলাম আগস্টের পর বিশাল একটা পরিবর্তন আসবে। কিন্তু কী দেখলাম, একদল গেলো আরেক দল আসল। ভাগ-বাটোয়ারার মিছিল দেখছি আমরা। কোন হাউজে কোন মতবাদের সাংবাদিক যাবে সবই যেন আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। শুধু নামগুলো পরিবর্তন হতে লাগল। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সেই আগের মতোই। আমাদের ভাগ্য অনিশ্চিত। তাই তো আজকে বিভু দাকে চলে যেতে হলো। কাল হয়তো আমি ও আপনিও। অপেক্ষায় থাকুন।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *