■ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ■
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে মার্কিন হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, হরমুজ প্রণালির পুনরায় খোলার বিষয়ে আলোচনায় ‘উন্নতি’ হয়েছে। এটি সরাসরি কোনো আলোচনা ছিল না। তবে মিসর, তুরস্ক ও পাকিস্তান দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা চালাচালি করেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, গত শনিবার ট্রাম্প ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। এর মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালি না খুলে দিলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দেন তিনি। জবাবে ইরানও ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি ও পানি শোধনাগার অবকাঠামোর ওপর প্রতিশোধের হুমকি দিলে উত্তেজনা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়।
হরমুজ সংকট বর্তমানে এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ট্রাম্পকে যুদ্ধে সমাপ্তি ঘটাতে বাধা দিচ্ছে। হুমকি পাল্টা হুমকি সংকট আরও তীব্র করেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ফিউচার—যা সকালেই নিচে নামছিল—ট্রাম্পের পোস্টের পর হঠাৎ বৃদ্ধি পায় এবং তেলের দাম কমে যায়।
স্থানীয় সময় আজ সোমবার সকালে ট্রাম্প নিজ মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছে, ‘গত দুই দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে খুবই ভালো এবং ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এই গভীর, বিস্তারিত এবং গঠনমূলক আলোচনার ধারা ও স্বর অনুযায়ী, যা সপ্তাহজুড়ে চলবে, আমি যুদ্ধ বিভাগের প্রতি নির্দেশ দিয়েছি যে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর কোনো সামরিক হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখবে, চলমান বৈঠক ও আলোচনার সাফল্যের শর্তে।’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি, যদিও অঞ্চলের কিছু দেশ উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে। তেহরান দাবি করেছে, ট্রাম্প উচ্চতর জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা এড়াতে এবং তাঁর সামরিক পরিকল্পনার জন্য সময় কিনতে পিছু হটেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন সূত্র জানিয়েছে, তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তান দুই দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে। সূত্রটি জানিয়েছে, তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আলাদা আলাদা বৈঠক করেছেন হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে।
ওই সূত্র বলেন, ‘মধ্যস্থতা চলছে এবং অগ্রগতি ঘটছে। আলোচনার বিষয় হলো যুদ্ধ শেষ করা এবং সব মুলতবি ইস্যু সমাধান করা। আশা করছি শিগগিরই উত্তর আসবে।’
মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি রোববার ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং পাকিস্তান, তুরস্ক ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে। মিসরীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আবদেলাত্তি জোর দিয়ে বলেছেন ‘সংঘাতের বিস্তৃত প্রভাব সীমিত রাখা এবং এটি সম্প্রসারিত হওয়া রোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
যুদ্ধ বন্ধে উভয় পক্ষই চুক্তি করতে সম্মত হয়েছি
ইরান অস্বীকার করলেও আলোচনা হয়েছে বলে অব্যাহতভাবে দাবি করে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার তিনি বললেন, উভয় পক্ষ যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তি করতে রাজি হয়েছে।
আজ সোমবার (২৩ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেছেন, উভয় পক্ষই একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী।
ইরানের সঙ্গে আলোচনার কথা বললেও ট্রাম্প যোগ করেছেন যে, তিনি কোনো চুক্তির গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না।
তিনি বলেন, যদি কোনো চুক্তি হয়, তবে তা ইরান এবং এই অঞ্চলের জন্য একটি দুর্দান্ত সূচনা হবে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের আলোচনায় ‘প্রধান বিষয়গুলোতে ঐকমত্য’ হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইরানের যে আলোচনার কথা তিনি দাবি করছেন, সেখানে উভয় পক্ষ ‘প্রধান প্রধান পয়েন্টগুলোতে একমত’ হয়েছে।
ইরানিরাই আলোচনার জন্য তাকে ফোন করেছে বলে ট্রাম্পের দাবি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন যে, ইরানিরাই আলোচনার জন্য তাকে ফোন করেছে, তিনি নিজে থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।
ট্রাম্পের এই আলোচনার দাবির বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দেশটির আধা-সরকারি মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে যে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কোনো ধরনের আলোচনা চলছে না।
ট্রাম্প আরও বলেন, কিছুক্ষণ আগে ইসরাইলি নেতাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে যা আছে তাতে ইসরাইল খুবই খুশি হবে।
ট্রাম্পের আলোচনার দাবির বিষয়ে ইরান কী বলছে
যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলছে, তবে তেহরান থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইরানের আধা-সরকারি মেহর নিউজ এজেন্সি দুই পক্ষের মধ্যে কোনো ধরনের আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
এই আকস্মিক নমনীয়তার কারণ কী?
গত সপ্তাহান্তে যেখানে দুই পক্ষই একে অপরকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিল, সেখানে ট্রাম্পের এই সুর পরিবর্তন বিশ্ববাসীকে অবাক করেছে। কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, কী এমন প্রস্তাব ইরান দিয়েছে যার ফলে ট্রাম্প তাঁর অবস্থান থেকে সরে এলেন। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে:
১. হরমুজ প্রণালি: ইরান হয়তো বিশ্ববাজারের কথা চিন্তা করে এই কৌশলগত পথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রাথমিক ইঙ্গিত দিয়েছে।
২. নিউক্লিয়ার সমঝোতা: পর্দার আড়ালে নতুন কোনো পারমাণবিক চুক্তির প্রস্তাব থাকতে পারে।
৩. অভ্যন্তরীণ চাপ: যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও বড় ধরনের যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা ট্রাম্পকে ভাবিয়ে তুলতে পারে।
ইরানের নীরবতা ও বিশ্ববাসীর সংশয়
ট্রাম্প ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনার দাবি করলেও, ইরান এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। বরং কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করে ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন। ফলে ট্রাম্পের এই ঘোষণা কেবল একপক্ষীয় কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা বার্ন্ড ডেবসম্যান জুনিয়র বিবিসিকে বলেন, ‘ট্রাম্পের এই বার্তাটি “অপারেশন এপিক ফিউরি” শুরু হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে নমনীয় হলেও অনেক প্রশ্ন এখনো উত্তরহীন। বিশেষ করে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চয়তা না আসায় এই পাঁচ দিনের বিরতি আসলে কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।’
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তারা এটি সহজে হাতছাড়া করবে না। অন্যদিকে, ট্রাম্পের এই পাঁচ দিনের আলটিমেটাম শেষে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট ফলাফল না আসে, তবে যুদ্ধের তীব্রতা আরও বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আপাতত পুরো বিশ্বের নজর এখন মেম্ফিসে ট্রাম্পের আসন্ন ভাষণের দিকে, যেখানে তিনি এই গোপন আলোচনার বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
