𓂃✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন 𓂃✍︎
ছয় সপ্তাহ ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এক ঐতিহাসিক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। গত ৫০ বছরের মধ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনা।
শনিবার (১১ এপ্রিল) ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি টানা দুই ঘণ্টা স্থায়ী হয় বলে জানিয়েছে ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম দুই দেশের প্রতিনিধিরা সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসলেন। বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে ইরানের পক্ষে ছিলেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। এ সময় পাকিস্তানের সেনাপ্রধানও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
পুরো আলোচনাটি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে রুদ্ধদ্বার কক্ষে শুরু হয়। দুই ঘণ্টা আলোচনার পর প্রতিনিধিদলগুলো বিরতিতে যায়।
এদিকে আলোচনা চলাকালে দুই দেশের পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া গেছে, যা নতুন করে ধোঁয়াশা তৈরি করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আজ বেশ কয়েকটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
তবে মার্কিন দাবির বিপরীতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এবং পাকিস্তানের একটি সূত্র দাবি করেছে, কোনো মার্কিন জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করেনি।
শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনার পাশাপাশি ইসলামাবাদে দুই দেশের টেকনিক্যাল ও বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যরাও দীর্ঘ বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। তাসনিম নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উভয় পক্ষের বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের এই আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে। আলোচনার জটিলতা ও গুরুত্ব বিবেচনায় প্রয়োজনে এই সংলাপের সময়সীমা আরও এক দিন বাড়ানো হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত বিজয়ের আশা করলেও ৪০ দিন ধরে ইরান তাদের সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে ওই অঞ্চলে এবং ইসরায়েলের অধিকৃত এলাকায় মার্কিন ও ইসরায়েলি অবস্থানে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
পরিস্থিতি শান্ত করার লক্ষ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের জন্য একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় বর্তমানে ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিরা আলোচনায় বসেছেন।
এই আলোচনার জন্য ইরান ইতিমধ্যে একটি ১০ দফা পরিকল্পনা পেশ করেছে। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার, ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, কৌশলগত হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।
তবে ইরানের সরকার এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর আস্থার সংকট বজায় রেখেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, এই আলোচনার অর্থ এই নয় যে তারা সংঘাত মিটিয়ে ফেলছে; বরং তারা মনে করে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের ময়দান এখন কেবল কূটনৈতিক অঙ্গনে স্থানান্তরিত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দ্রুতই খুলে যাবে: ট্রাম্প
ইসলামাবাদের মাটিতে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধি দলের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছে, ঠিক সেই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে নতুন এক বার্তা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি খুব শিগগিরই উন্মুক্ত হয়ে যাবে।
ট্রাম্প নিজের বার্তায় আবারও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংস করে দিয়েছে এবং এর মধ্যে তাদের সম্পূর্ণ নৌ ও বিমান বাহিনীসহ অন্যান্য সামরিক সক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, জ্বালানি তেল সংগ্রহের জন্য খালি ট্যাংকারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে সম্পাদিত দুই সপ্তাহের শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতির বিষয়ে ট্রাম্প জানান, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার শর্তে রাজি হয়, তবেই তিনি দেশটিতে বোমাবর্ষণ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তে সম্মত হয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর ইরান কৌশলগতভাবে এই জলপথটি বন্ধ করে দিয়েছিল। বিশ্বের ব্যস্ততম এই তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন রুটের মাধ্যমেই সাধারণত বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ হয়ে থাকে।
