নেপালে আরএসপি পারল, বাংলাদেশে এনসিপি কেন পারল না

মাসকাওয়াত আহসান 

সত্যজিৎ রায়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা চলচ্চিত্রে এক বেকার যুবক এক অভিজাত বিচারপতির অনুগ্রহ প্রত্যাখান করলে; অভিজাত পরিবারের তরুণী তাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি চাকরির সুযোগ প্রত্যাখান করলে কেন! যুবকটি উত্তর দেয়, এই পাহাড়, এই আকাশ, এই উচ্চতার পরিবেশে মনটা আর মেট্রোপলিটানের মতো ছোট নেই। পরিবেশের ঔদার্য্য আমার মনে সাহস জন্ম দিয়েছে।

নেপাল সেই হিমালয়ের কোলে এভারেস্টের উচ্চতার ঔদার্য্যের লীলাভূমি। ফলে কাঠমাণ্ডু বিশ্ববিদ্যালয় ছলে বলে কৌশলে দেশলুন্ঠন করে কথিত অভিজাত শ্রেণীতে পদার্পণের স্বপ্ন দেখায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নীল-সাদা রং-এর পালক পরে দলীয় ক্যাডার হিসেবে কাজ করেনা; ফলে তাদের হাতে দলীয় আর্মস ক্যাডার ও সিভিল সার্ভিসের দলীয় ক্যাডার তৈরি হয় না। ফলে নেপালের নির্বাচনে দলীয় ক্যাডারের পেশী প্রদর্শন নেই। প্রশাসক ও পুলিশের প্রিয় দলের জন্য ভোটের ফল পেড়ে এনে দেয়ার বাড়তি দায়িত্ব নেই।

কাঠমাণ্ডু বিশ্ববিদ্যালয় ১৫১ জন বুদ্ধিজীবী তৈরি করে না; যারা এজেন্ডাভিত্তিক বিবৃতি প্রদান ও নীরবতার অতীন্দ্রিয় পিং পং খেলা খেলবে। নেপালে দৈনিক হিরোশিমা, ডেইলি নাগাসাকি , হলোকাস্ট টিভি ও গাযা নিউজ পোর্টাল নেই খুব করে শিকারি সাংবাদিকতা করার জন্য।

বালেন্দ্র শাহ আমাদের এই সোনার বাংলায় জন্ম নিলে ছালের কন্ঠ রিপোর্ট করতো, বালেন্দ্র শাহ মেয়র হিসেবে ১১হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। ‘আলো আসবেই গ্রুপ’-এর নারীবাদীরা বালেন্দ্র শাহ’র বিরুদ্ধে স্ক্রিনশট ফাঁস করে আছড়ে পড়তো। আর এসপি থেকে পদত্যাগ করে খিলখিল ইজরায়েল টেলিফোন আলাপ ফাঁস করতো। তখন নাগরিক সমাজের ১৫১ জন সুশীল ছ্যা ছ্যা করে উঠে বিবৃতি ছেপে ফেলতেন দৈনিক হিরোশিমা ও ডেইলি নাগাসাকিতে। আর রবি লামিছানে হাঁসের মাংস কেন খেলেন কিংবা ওয়েস্টিনে কেন গেলেন তা নিয়ে বৃটিশ আমলের পিয়ন লেদু মিয়ার এফলুয়েন্ট নাতি হুংকার দিতো, রবি কেন ওয়েস্টিনে যাবে; ওয়েস্টিনে যাবে বৃটিশ আমলের লেদু মিয়া ও গেদু মিয়ার সম্ভ্রান্ত বংশের নাতিরা।

নেপাল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হবার পরেও দেশটির নাগরিকেরা ভারতের হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসনের রাজনীতি ও ছায়া উপনিবেশ তৈরির হেজিমনি প্রত্যাখান করে; ইন্ডিয়া আউট মুভমেন্ট করেছিলো। ফলে সেখানে সংস্কৃতি মামা ও খালার কস্টিউম পরে ‘অখণ্ড ভারত’-এর স্বপ্ন দেখার লোক নেই। সাংস্কৃতিক সংগঠনের নামে নেপালীদের বিশুদ্ধ ভারতীয় সংস্কৃতি শেখানোর আলো-ছায়ার খেলা নেই; নট-নটীর ভীমরতি নেই।

নেপালে ধর্মপ্রাণ হিন্দু রয়েছেন; কিন্তু ফাঁপা পোগোতিচিল না থাকায় ধর্মপ্রাণ মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে নিজেকে বড্ড আধুনিক ও মেইনস্ট্রিম প্রমাণ করার ফেসবুক রগড় নেই। পাহাড়ের ঝরণা থেকে পানি সংগ্রহ করার ঐতিহ্যের কারণে পাতকূয়াতলা বা কলতলা কালচার সেখানে মেইনস্ট্রিম খ্যাতি পায়নি। ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে নেপালীরা উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ হওয়ায়; ধর্মপ্রাণ মানুষদের রগড় করে গায়ের রঙ ফর্সা করার প্রতিযোগিতা সেখানে নেই।

নেপালের মানুষ অল্পে তুষ্ট। টেকাটুকাই জীবনের সব এই মরণ দর্শন সেখানে বিকশিত হয়নি। ফলে নেপালের পুলিশ-প্রশাসন-গোয়েন্দা সংস্থা ও সেনাবাহিনীতে টেকাটুকা নিয়ে দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করার অনুশীলন নেই।

নেপালের রাজতন্ত্র অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে দুর্বল হয়ে পড়ায়; সেখানে রাজার পা-পূজার রীতি আগেই বিদায় নিয়েছে। রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের পা পূজা করে তাদেরকে স্বৈরাচারী মূর্তি হিসেবে নির্মাণের ভাটিয়ালী চর্চা সেখানে নেই।

পৃথিবীর অন্যান্য সমাজের মতো স্বাভাবিকভাবেই নেপালীরা তাদের অনুজপ্রতিম ও সন্তানপ্রতিমদের স্নেহ করে। বুড়ো ভাম চুলে কলপ করে তরুণের ছিদ্রান্বেষণ করে ক্রমশ তারুণ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার হাস্যকর প্রচেষ্টা সে সমাজে নেই।

নেপালী সমাজে পরিবারে নিজের সন্তানকে অন্য বাড়ির সফল সন্তানের পা ধোয়া পানি খেতে বলার চল নাই। ফুটবলের সঙ্গে চিংড়ি কিংবা আপেলের সঙ্গে কমলার বিসদৃশ তুলনা টেনে সন্তানের আত্মবিশ্বাস ভেঙ্গে দেবার গাঁইয়া মনোভঙ্গি নেই। তুলনামূলক জীবন তারা যাপন করে না। বিত্ত বৈভব, প্রতিষ্ঠা, সম্পদের ইঁদুর দৌড় নেই।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্ব্যবহার করে শিক্ষার্থীর মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেবার প্রবণতা শিক্ষকদের নেই। নেপালের প্রবীণেরা, আমাদের সময় সোনালী সময় আর তোমাদের সময় উচ্ছন্নে গেছে ধরনের গাঁজাখুরি গল্প বলে না।

নেপালের জেনজি বিপ্লবে যারা অংশ নিয়েছিলো; তাদের একটি অংশ আবার গিয়ে নানারকম চেতনার আলাপ করে পতিত স্বৈরাচারের পাশে দাঁড়ায়নি। আরেকটি অংশ বিপ্লবের পরদিন থেকেই ইলেক্টেবল পুরোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও ডক্টোরাল ফেলো বুদ্ধিজীবী হয়ে ভবিষ্যতে পদপদবী বাগানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেনি।

নেপালে অভ্যুত্থানকারীদের কাছে আগে থেকে জনপ্রিয় ছিলেন বালেন্দ্র শাহ। র‍্যাপ সংগীতশিল্পী থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া ৩৬ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ রাজধানী শহর কাঠমান্ডুর মেয়র হয়েছিলেন ২০২২ সালে। এখন তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে।

অভ্যুত্থানের নেতা হওয়ার পর বালেন্দ্র শাহ যোগ দেন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিতে (আরএসপি)। এই দলটি ২০২২ সালে গড়ে তোলেন রবি লামিছানে। ৫০ বছর বয়সী লামিছানে প্রথাগত রাজনীতিকদের দুর্নীতি, স্বজনপোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে টিভি উপস্থাপক থেকে রাজনীতিক বনে যান।

বালেন্দ্র শাহ আমাদের এই সোনার বাংলায় জন্ম নিলে ছালের কন্ঠ রিপোর্ট করতো, বালেন্দ্র শাহ মেয়র হিসেবে ১১হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। ‘আলো আসবেই গ্রুপ’-এর নারীবাদীরা বালেন্দ্র শাহ’র বিরুদ্ধে স্ক্রিনশট ফাঁস করে আছড়ে পড়তো। আর এসপি থেকে পদত্যাগ করে খিলখিল ইজরায়েল টেলিফোন আলাপ ফাঁস করতো। তখন নাগরিক সমাজের ১৫১ জন সুশীল ছ্যা ছ্যা করে উঠে বিবৃতি ছেপে ফেলতেন দৈনিক হিরোশিমা ও ডেইলি নাগাসাকিতে। আর রবি লামিছানে হাঁসের মাংস কেন খেলেন কিংবা ওয়েস্টিনে কেন গেলেন তা নিয়ে বৃটিশ আমলের পিয়ন লেদু মিয়ার এফলুয়েন্ট নাতি হুংকার দিতো, রবি কেন ওয়েস্টিনে যাবে; ওয়েস্টিনে যাবে বৃটিশ আমলের লেদু মিয়া ও গেদু মিয়ার সম্ভ্রান্ত বংশের নাতিরা।

সংকীর্ণ মনের হুঁশ হারানো উদারপন্থী গজগজ আহমেদ উপসম্পাদকীয় লিখতো, নির্বাচনী প্রচারণায় জেনজিরা কেন ধর্মপন্থীদের সঙ্গী হলো। কেন পুরোহিতেরা ওদের জন্য ভোট চাইলো। জেনজিদের এই পদস্খলনে আজ পাহাড়ের কান্না দেখে তোমরা তাকে ঝর্ণা বলো। আসুন আমরা সবাই মিলে মৌলবাদিদের প্রতিহত করি।

টিভি ইন্টারভিউতে চোখে কাজল দিয়ে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে তপস্বী তরঙ্গিনী এসে বলতো, যেভাবেই হোক আমরা উগ্রপন্থীদের মেইনস্ট্রিম হতে দেবো না।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, ই-সাউথ এশিয়া

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *