প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগে নারীর ৬০ শতাংশ কোটা বাদ

■ নাগরিক প্রতিবেদক ■

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে নারীর ৬০ শতাংশ কোটা, পোষ্য ও পুরুষ কোটা বাদ দেওয়া হয়েছে। শুধু মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থীদের জন্য মোট ৭ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে। বাকি ৯৩ শতাংশ নিয়োগ হবে মেধার ভিত্তিতে।

বৃহস্পতিবার রাতে জারি হওয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫-এর প্রজ্ঞাপন থেকে এসব তথ্য জানা যায়। এতে রাষ্ট্রপতির আদেশে স্বাক্ষর করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা।

বিধিমালার তথ্য বলছে, সহকারী শিক্ষকের ৯৩ শতাংশ নিয়োগ হবে মেধার ভিত্তিতে। এর মধ্যে ২০ শতাংশ পদ বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের দ্বারা এবং ৮০ শতাংশ পদ অন্যান্য বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের দ্বারা পূরণ করা হবে। আর বাকি ৭ শতাংশ কোটার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য ১ শতাংশ এবং ১ শতাংশ থাকবে শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থীদের জন্য। তবে কোটায় প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধাক্রম অনুযায়ী এসব পদ পূরণ করা হবে। প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা হতে হবে ন্যূনতম স্নাতক। শিক্ষাজীবনের কোনো পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণি থাকা যাবে না।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে এত দিন নারীরা ৬০ শতাংশ কোটা সুবিধা ভোগ করে আসছিলেন। এটি শিক্ষকতা পেশায় নারীর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। সর্বশেষ ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৯’ এ সরাসরি নিয়োগযোগ্য পদের ৬০ শতাংশ মহিলা প্রার্থী, ২০ শতাংশ পোষ্য প্রার্থী এবং অবশিষ্ট ২০ শতাংশ পুরুষ প্রার্থীদের দিয়ে পূরণের কথা উল্লেখ ছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গঠিত পরামর্শক কমিটিও শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনায় নারী শিক্ষককে অগ্রাধিকার সুপারিশ করেছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তাদের প্রতিবেদন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। প্রতিবেদনে প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষার শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনায় নারী শিক্ষককে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়। কিন্তু নতুন প্রজ্ঞাপনে সেই সুপারিশের প্রতিফলন নেই।

এ বিষয়ে ড. মনজুর আহমদ বলেন, ‘অবশ্যই শিক্ষক নিয়োগে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বিষয়টি পরামর্শক কমিটির প্রতিবেদনেও রয়েছে। আমি মনে করি, বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত না নিয়ে সামগ্রিক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।’

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৫ হাজার ৫৬৫টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে ১ কোটি ৭১ লাখ ৬২ হাজার ৩৬৫ জন। শিক্ষক আছেন ৩ লাখ ৬২ হাজার ৭০৯ জন। তাঁদের মধ্যে পুরুষ শিক্ষক ১ লাখ ২৭ হাজার ৩৯ জন এবং মহিলা শিক্ষক ২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭০ জন।

নতুন বিধিমালায় প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতিতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক পদে ৮০ শতাংশ পদ পূরণ করা হবে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে। আর বাকি ২০ শতাংশ পদ পূরণ করা হবে সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে। তবে প্রার্থী পাওয়া না গেলে তা পূরণ করা হবে সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে। পদোন্নতির জন্য সহকারী শিক্ষকদের মৌলিক প্রশিক্ষণ এবং চাকরি স্থায়ীকরণের পর চাকরিকাল ১২ বছর হতে হবে।

এর আগে প্রধান শিক্ষক পদে ৬৫ শতাংশের পদোন্নতি এবং ৩৫ শতাংশ পদ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হতো। এ জন্য সহকারী শিক্ষকদের চাকরিকাল অন্তত ৭ বছর থাকতে হতো।

বিধিমালায় শিক্ষকদের জন্য ‘মৌলিক প্রশিক্ষণ’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘কোনো শিক্ষানবিশকে কোনো নির্দিষ্ট পদে স্থায়ী করা হবে না; যতক্ষণ পর্যন্ত সরকারি আদেশবলে, সময়-সময়, যে পরীক্ষা ও মৌলিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়, সেই পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হন ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।’

এতে আরও বলা হয়, সহকারী শিক্ষকেরা চাকরিতে যোগদানের চার বছরের মধ্যে এবং প্রধান শিক্ষকেরা দশম গ্রেডে উন্নীত হওয়ার তারিখ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে মৌলিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। আর এ সময়ের মধ্যে প্রশিক্ষণ সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন না করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে বেতন গ্রেডের নিম্ন ধাপে অবনমন করা হবে।

মৌলিক প্রশিক্ষণ বলতে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন বা ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন অথবা বেসিক ট্রেনিং ফর প্রাইমারি টিচার্স অথবা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত সমমানের কোনো প্রশিক্ষণ বলে বিধিমালায় বলা হয়েছে।

নতুন বিধিমালায় সহকারী শিক্ষক (সংগীত) ও সহকারী শিক্ষক (শারীরিক শিক্ষা) পদও সৃষ্টি করা হয়েছে। আর সরাসরি নিয়োগে প্রার্থীর সর্বোচ্চ বয়স ৩২ বছর করা হয়েছে, আগে যা ছিল ৩০ বছর। সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের মোট ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় থাকবে ৯০ নম্বর এবং মৌখিক পরীক্ষায় ১০ নম্বর। লিখিত পরীক্ষায় বাংলায় থাকবে ২৫, ইংরেজিতে ২৫, গণিত ও দৈনন্দিন বিজ্ঞানে ২০ এবং সাধারণ জ্ঞানে (বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি) ২০ নম্বর। উভয় পরীক্ষায় সর্বনিম্ন পাস নম্বর ৫০ শতাংশ।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের নিয়োগযোগ্য শূন্য পদের সংখ্যা ৮ হাজার ৪৩টি। তবে বর্তমানে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত কত পদ শূন্য রয়েছে, সেই তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া সংগীত, শারীরিক শিক্ষার শিক্ষকের জন্য ৫ হাজার ১৬৬টি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব পদে নিয়োগের জন্য আগামী মাসে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হতে পারে।

বিধিমালার তথ্যমতে, সহকারী শিক্ষক (সংগীত) ও সহকারী শিক্ষক (শারীরিক শিক্ষা)-এই দুটি পদে সরাসরি নিয়োগ করা হবে। সর্বোচ্চ ৩২ বছর বয়সী প্রার্থীরা আবেদন করতে পারবেন।

সংগীতের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা

কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কমপক্ষে দ্বিতীয় শ্রেণি বা সমমানের সিজিপিএসহ সংগীত বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি থাকতে হবে।

অথবা কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি বা সমমানের সিজিপিএসহ স্নাতক বা স্নাতক (সম্মান) বা সমমানের ডিগ্রিসহ কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগীতে কমপক্ষে এক বছরের ডিগ্রি থাকতে হবে।

শিক্ষাজীবনের কোনো স্তরে তৃতীয় বিভাগ অথবা সমমানের জিপিএ অথবা তৃতীয় শ্রেণি অথবা সমমানের সিজিপিএ গ্রহণযোগ্য হবে না। তাছাড়া শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালার তফসিল-২ এ বর্ণিত নিয়মে তাকে অবশ্যই লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

শারীরিক শিক্ষা সহকারী শিক্ষক নিয়োগ যোগ্যতা

কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কমপক্ষে দ্বিতীয় শ্রেণি বা সমমানের সিজিপিএসহ স্নাতক বা স্নাতক (সম্মান) বা সমমানের ডিগ্রিসহ কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কমপক্ষে দ্বিতীয় শ্রেণির ব্যাচেলর অব ফিজিক্যাল এডুকেশন (বিপিএড) ডিগ্রি থাকতে হবে।

অথবা কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞানে কমপক্ষে দ্বিতীয় শ্রেণি বা সমমানের সিজিপিএসহ স্নাতক বা স্নাতক (সম্মান) বা সমমানের ডিগ্রি প্রয়োজন হবে।

শিক্ষাজীবনের কোনো স্তরে তৃতীয় বিভাগ অথবা সমমানের জিপিএ অথবা তৃতীয় শ্রেণি অথবা সমমানের সিজিপিএ গ্রহণযোগ্য হবে না। তাছাড়া শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালার তফসিল-২ এ বর্ণিত নিয়মে তাকে অবশ্যই লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *