অর্থনীতিকে তুলনামূলক স্থিতিশীল রেখে যাচ্ছেন ড. ইউনূস

■ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ■

বাংলাদেশে ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব ছাড়ার আগে অর্থনীতিকে তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থানে রেখে যাচ্ছেন—এমনটাই উঠে এসেছে সাম্প্রতিক মূল্যায়নে।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কাঠামোগত সংকট পুরোপুরি না কাটলেও অর্থনৈতিক পতনের আশঙ্কা অনেকটাই দূর হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়—শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর যখন ড. ইউনূস দায়িত্ব নেন, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি কার্যত ধসে পড়ার মুখে ছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা, স্থবির বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের সংকট, দুর্বল রাজস্ব আদায় এবং বিপুল বৈদেশিক ঋণ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে বিচার বিভাগ, পুলিশ ও প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ড. ইউনূস শীর্ষ পর্যায়ে নতুন নিয়োগ দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান সচল করার উদ্যোগ নেন এবং অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেন।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য কেন্দ্রবিন্দু তৈরি করেছিলেন, যা দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থা এড়াতে সহায়তা করেছে। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশের সংকটটি ছিল ধীর গতির—শ্রীলঙ্কা বা ইন্দোনেশিয়ার মতো হাইপারইনফ্লেশন বা ব্যাংক ধস দেখা দেয়নি—ফলে নীতিনির্ধারকদের হাতে কিছুটা সময় ছিল।

২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩.৬৯ শতাংশে, যা আগের বছরের তুলনায় কম হলেও অন্যান্য সূচকে উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৮.৪৯ শতাংশে। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২.৫৭ বিলিয়ন ডলারে, যা অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতে সক্ষম। বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪.৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

রপ্তানি খাতেও আংশিক ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত মিলেছে। ২০২৫ অর্থবছরে রপ্তানি বেড়েছে ৮.৬ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক আলোচনা ড. ইউনূসের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার কারণেই এটি তুলনামূলকভাবে সহজ হয়েছে বলে মনে করছেন নীতি বিশ্লেষকেরা। জাপানের সঙ্গেও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির আলোচনা এগিয়েছে, বিশেষ করে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে।

তবে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখনো বিপুল—যা আর্থিক খাতের জন্য বড় ঝুঁকি। পাশাপাশি ঋণের বোঝা ও দুর্বল রাজস্ব আদায় ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য বড় মাথাব্যথা হয়ে থাকবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, শিল্প উৎপাদনের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক চাপ অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

সব মিলিয়ে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও টেকসই উন্নয়নের জন্য পরবর্তী সরকারের দ্রুত ও আন্তরিক সংস্কার অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *