কোরআনে ইউসুফ জুলেখার প্রেম কাহিনী

কোরআনে ইউসুফ জুলেখার প্রেম কাহিনী

:: তারেক চৌধুরী ::

আমি লক ডাউনে আছি। করোনা থেকে মুক্ত থাকতে এবং অন্যদের মুক্ত রাখতে। দিনে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ৬-৭ ঘন্টা ঘুমাই। বাকি ১৭-১৮ ঘন্টা কখনো পত্রিকা পড়ি, কখনো ফোনে কথা বলি, কখনো টিভি দেখি, কখনো বা মরণের কথা ভাবি। এই সেই করে চলে যায়। হঠাৎ করে মনে হলো ইন্টারেষ্টিং কিছু একটা লিখি। আমার ঘরে যেহেতু কোরআন শরীফ তর্জমা ও তফসির আছে, তাই সেখানেই ইউসুফ জুলেখার প্রেম কাহিনী খুঁজতে শুরু করলাম। অনেক লম্বা কাহিনী। একরাতে পড়ে শেষ করলেও লেখার সুযোগ পেলাম না। দ্বিতীয় রাতে তাই ঘটলো। লিখলেই হবে না। সহজ করে লিখতে হবে। অনেক পড়লাম অনেক জানলাম। কোরআন শরীফের ১২ নম্বর সূরার নামই হচ্ছে সূরা ইউসুফ যেখানে এই প্রেম কাহিনী লেখা আছে। এটা আসলে প্রেম কাহিনী নয়। এটা হচ্ছে জুলেখার এক তরফা প্রেম অথবা যৌবনজ্বালা। আর ইউসুফের আল্লাহ প্রেমের উদাহরণ। তবে এই প্রেমের মিলন হয়েছিল প্রেমিক প্রেমিকার। কোরআনে জুলেখার নাম হচ্ছে যুলাইখা। আর ইউসুফ কে ইউসুফ (আ:) পড়তে হবে। ইউসুফ খুবই সুন্দর ছিলেন। সহীহ মুসলিমের এক হাদিসে এসেছে নবী করিম (স: ) বলছেন ইউসুফ (আঃ) কে আল্লাহ সমস্ত পৃথিবীর রূপ সৌন্দর্য্যের অর্ধেক তাকে দান করেছেন এবং অবশিষ্ট অর্ধেক সমগ্র বিশ্ব বন্টন করেছেন। ইয়াকুব (আ:) ১২ সন্তানের মধ্যে ইউসুফ (আঃ) ছিলেন ১১তম। তার বাবা দুই বিবাহ করেছিলেন। ইয়াকুব (আ:) প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রীর ছোট বোনকে বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রীর গর্বে ১০ সন্তান এবং ছোট স্ত্রীর গর্বে ২ সন্তান জন্ম নেয়। ইয়াকুব (আ:) ইউসুফকে খুব পছন্দ করতেন। এটি তার সৎ ১০ ভাই পছন্দ করতো না। বড় ১০ জনকে বাড়ির কাজ কর্ম করতে হতো। ইউসুফ (আ:) স্বপ্ন দেখেছিলেন, চন্দ্র সুর্য তাকে সেজদা করছে ।ফলে তাদের মনে হিংসা মাথাছাড়া দিয়ে উঠলো। ফলে বড় ভাইদের কেউ থাকে হত্যা করতে চাইলো , কেউ থাকে কূপে ফেলে দিতে চাইলো। এব্যাপারে সূরা ইউসুফের ১১ নম্বর ও ১২ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে। তারা তাদের পিতা ইয়াকুব( আ:) কে বললো আমরা ইউসুফের হিতাকাঙ্খী তাকে আমাদের সঙ্গে প্রমোদ ভ্রমণে পাঠিয়ে দিন। পিতা বাকি ১০ সন্তানের কায কলাপ জানতেন। তারপরেও তিনি তাদের ইউসুফ কে প্রমোদ ভ্রমণে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। কথা অনুযায়ী ভাইয়েরা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে কূপে নিক্ষেপ করলো , কিন্তু ইউসুফ কূপের প্রাচীর জড়িয়ে ধরলেন। তারপর ভাইয়েরা তার জামা খুলে হাত বেঁধে দিলো যাতে সে আটকাতে না পারে। ইউসুফ ( আ:) তাদের কাছে দয়া ভিক্ষা চাইলেন। তখন তারা তাকে স্বপ্নের কথা বলে বিদ্রুপ করলো। তারপর তারা হাত পা বেঁধে একটি বালতিতে রেখে তাকে কূপে ছাড়তে লাগলো। অর্ধেক পথে রশি কেটে দিলো। তিনি পানিতে পড়ে গেলেও আল্লাহ তাকে রক্ষা করলেন। নিকটেই ভাসমান একখান পাথরের উপর তিনি বসে রইলেন। ইউসুফ ( আ:) তিনদিন পাথরের উপর কূপে অবস্থান করলেন। এক ভাই গোপনে বালতির সাহায্যে খাবার পৌঁছে দিতে লাগলো। সন্ধ্যা বেলা তারা কাঁদতে কাঁদতে পিতার নিকট পৌঁছলো এবং বললো পিতা আমরা দৌড়ে অংশ নিয়ে ছিলাম এবং ইউসুফ কে জিনিস পত্র দেখার দায়িত্বে দিয়েছিলাম। ফিরে দেখি বাঘ ইউসুফকে খেয়ে ফেলেছে।তারা প্রমাণস্বরূপ ইউসুফের কৃত্তিম রক্ত মাখা শার্ট এনেছিলো , যাতে পিতার মনে বিশ্বাস জাগাতে পারে যে বাঘই তাকে খেয়ে ফেলেছে। পিতা শার্ট দেখে বললেন এই বাঘ এতো বিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান ছিল যে , তাকে খেয়ে ফেলেছে কিন্তু শার্টটা একটুও ছিড়তে দেয় নি। ইয়াকুব ( আ: ) বললেন ইউসুফকে বাঘে খায়নি বরং তোমরাই এই গল্প বানিয়েছো। ঘটনাক্রমে একটি কাফেলা এই কূপের সামনে এসে দাঁড়ায়। কাফেলার মালিক ইবনে দুবর এই কূপ পৌঁছলেন এবং বালতি নিক্ষেপ করলেন। ইউসুফ (আ:) আল্লাহর সাহায্য দেখে বালতির রশি শক্ত করে ধরলেন। পানির পরিবর্তে বালতিতে একটু সুন্দর বালক উঠে আসলো। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে বালতিতে পানির পরিবর্তে অপরূপ বালককে দেখে তারা আনন্দে চিৎকার করে উঠলো।কাফেলার মালিক বিষয়টি গোপন করে ফেললো এই ভেবে যে তারা তাকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করতে পারবে। তফসীরে কুর্তবীতে আছে কাফেলার লোকেরা তাকে মিশরে নিয়ে বিক্রির ঘোষণা দিতেই ক্রেতারা প্রতিযোগিতা মূলক দাম বলতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত ইউসুফ ( আ: ) এর ওজনের সমান স্বর্ণ , সমপরিমাণ মৃগনাভি এবং সময় পরিমান রেশমি বস্ত্র দাম দাম সাব্যস্ত হলো। ইবনে কাসির থেকে জানা যায়, যে ব্যক্তি ইউসুফ ( আ: ) কে ক্রয় করে ছিলেন তিনি ছিলেন মিশরের অর্থমন্ত্রী। তার নাম ছিল কিফতির বা মিশরে আজিজ । তার স্ত্রীর নাম ছিলো জুলেখা। মিশরে আজিজ তার স্ত্রী কে নির্দেশ দিলেন ইউসুফকে বসবাসের উত্তম জায়গা দাও। কৃতদাসের মত রেখো না।

২.

জুলেখার ঘরে ইউসুফের ঠাঁই হলো আর জুলেখা তার প্রতি প্রেমাসক্ত হয়ে পড়লো । তার সাথে কুবাসনা চরিতার্থ করার জন্যে তাকে ফুসলাতে লাগলো । সে গৃহের সব দরজা বন্ধ করে দিলো এবং তাকে বললো শীঘ্রই আসো , তোমাকেই বলছি। ( নির্জনতায় জুলেখা ইউসুফকে আকৃষ্ট করার জন্য তার রূপ সৌন্দর্যের উচ্চকিত প্রশংসা করতে লাগলো। তোমার চুল কত সুন্দর) ইউসুফ নির্জন কক্ষ থেকে পলায়ন করতে উদ্যত হলেন এবং বাহিরে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে দৌড় দিলেন। জুলেখা তাকে ধরার জন্য পিছন দিকে দৌড় দিলো এবং তার জামা ধরে তাকে বাহিরে যেতে বাধা দিলো। টানা হ্যাচড়ার ফলে জামা পিছন দিক থেকে ছিড়ে গেলো। এই পরিস্থিতিতে ইউসুফ দরজার বাহিরে চলে এলেন এবং পিছন পিছন জুলেখাও উপস্থিত হলেন। উভয়ে দরজার বাহিরে আজিজে মিশর বা জুলকার স্বামীকে দেখতে পেলো। তার পত্নী চমকে উঠলো এবং কথা বানিয়ে ইউসুফ এর উপর দোষ অপবাদ চাপানোর জন্য বললো যে ব্যক্তি তোমার স্ত্রীর সাথে কেউ কর্মের ইচ্ছা করে তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হবে অথবা কঠোর দৈহিক শাস্তি দেয়া হবে.ইউসুফ তার প্রতি অপবাদের বিরোধিতা করে বলেন ‘সে ই আমার দ্বারা স্বীয় কুমতলব চরিতার্থ করার জন্য ফুসলাচ্ছিলো’। আজিজ মিশর জুলেখার স্বামী জুলেখার ভুল ব্যাখ্যা শুনে বললেন ‘ ইউসুফ এই ঘটনাকে উপেক্ষা কর এবং বলালবলি করো না যাতে বেইজ্জতি হয়। ‘ তার স্বামী অত:পর জুলেখাকে বললো ভুল তোমারই। তুমি নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। পরবর্তীতে জুলেখা যখন জানতে পারলো যে তার বিরুদ্ধে মহিলারা এই বিষয়ে বলাবলি করছে , তখন সে তাদেরকে একটি ভোজ সভায় ডেকে পাঠালো। যখন মহিলারা ভোজ সবাই উপস্থিত হলো তখন তাদের সামনে বিভিন্ন প্রকার খাদ্য ও ফল উপস্থিত করা হলো। কিছু খাদ্য চাকু দিয়ে কেটে খাবার ছিল। , তাই প্রত্যেক কে এক একটি চাকু দেয়া হলো। জুলেখার ইচ্ছা ছিল ইউসুফকে দেখে মহিলারা হতভম্ব হয়ে যাবে এবং চাকু দিয়ে নিজেদের হাত কেটে ফেলবে।এমন সময় ইউসুফকে জুলেখা বললো ‘একটু বের হয়ে আসো’। ইউসুফ ( আ: ) বাহিরে এসে উপস্থিত হলেন। সমাগত মহিলারা ইউসুফ ( আ) কে দেখলো তার রূপ ও সৌন্দর্য্য দেখে বিমোহিত হয়ে গেলো। মহিলারা ইউসুফ ( আ) রূপের মোহে পড়ে নিজ নিজ হাত কেটে পড়লো।

ফলকাটার এই বিস্ময়কর ঘটনা যখন ঘটলো, তখন তারা বললো ‘হায় আল্লাহ, এই ব্যক্তি কখনো মানব নয় , সে তো ফেরেশতা। ফেরেশতাই এই এরূপ নূরানী চেহারা যুক্ত হতে পারে’। জুলেখা বললো ‘দেখে নাও এ সেই ব্যক্তি যার সম্পর্কে তোমরা আমাকে ভৎসনা করতে। বাস্তবিকই আমি তার কাছে নিজেকে সমর্পন করতে চেয়েছিলাম কিন্তু সে নিষ্পাপ রয়েছে। ভবিষ্যতে আমার আদেশ পালন না করলে অবশ্য ই কারাগারে প্রেরিত হবে”. জুলেখা যখন দেখলো যে সমাগত মহিলাদের সামনে তার গোপন কথা ফাঁস হয়ে গেছে তখন তাদের সামনেই ইউসুফ ( আ: ) কে ভীতি প্রদর্শন করতে লাগলো। তখন আমন্ত্রিত মহিলারা ইউসুফ কে বলতে লাগলো ‘‘ তুমি জুলেখার কাছে ঋণী , কাজেই তার ইচ্ছার অবমাননা করা উচিত নয়”।ইউসুফ অবস্থা বেগতিক দেখে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলেন। তিনি বললেন ”হে পালন কর্তা এই মহিলারা আমাকে যে কাজের দিকে আহ্বান করছে, তার চাইতে জেল খানা আমার কাছে অধিক পছন্দনীয়”। আল্লাহ তার প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। ইউসুফ যখন জেলে প্রেরিত হলেন .তখন ওহী আসলো ”আপনি জেল চাইছেন তাই জেল দেয়া হলো , নিরাপত্তা চাইলে নিরাপত্তা দেয়া হতো”।

৩.

ইউসুফ ( আ) এর খোদা ভীতি দেখে আজিজে মিশর অর্থাৎ জুলেখার স্বামী বিশ্বাস করছিলেন যে ইউসুফ একজন সৎ মানুষ। কিন্তু তার স্ত্রীর কুকাম নিয়ে শহরময় কানাঘুষা চলছিল , তাই এই কানাঘুষা বন্ধ করতে, ইউসুফকে জেলে রাখা-ই সমীচীন হবে. নিজের ঘর ও রক্ষা হবে আর কানাঘুষা ও বন্ধ হবে. ইউসুফ ( আ: ) কারাগারে পৌঁছলে সাথে আরো দুজন অভিযুক্ত ও কারাগারে প্রবেশ করলো। তাদের একজন বাদশাকে মদ পান করাতো আর আরেকজন ছিল বাবুর্চি। এই দুই কয়েদির সহায়তায় ও অনেক ঘটনার পর ইউসুফ জেল থেকে ছাড়া পান. ইউসুফ স্বপ্নের বর্ণনা করতে পারতেন। তাই বাদশার স্বপ্নের ব্যখ্যা দেয়ার জন্য তার ডাক পড়ে। মিশরের বাদশার দুত যখন কারাগারে ইউসুফের মুক্তির বার্তা নিয়ে গেলেন। ইউসুফ বললেন ”আমি এমনিতেই বের হতে চাইনা। ফল কাটতে গিয়ে মহিলাদের আঙ্গুল কাটায় আমার দোষ ছিল কিনা তার তদন্ত করুন। তারপর বের হয়ে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেব” . বাদশা ইউসুফের দাবি অনুযায়ী মহিলার কাছে ঘটনার তদন্ত করলেন। জুলেখা ও অন্যান্য মহিলা দোষ স্বীকার করলো। তখন বাদশা নির্দেশ দিলেন ”ইউসুফ কে আমার কাছে নিয়ে আসো” , আমি তাকে উপদেষ্টা করে নেই. বাদশা তার গুনে মুগ্ধ হয়ে এক বছর তার উপদেষ্টা করে রাখলেন। এক বছর পর তাকে মিশরের অর্থ মন্ত্রণালয়সহ রাষ্ট্রের সকল দায়িত্ব দিয়ে দিলেন। এই সময়েই জুলেখার স্বামী মৃত্যু বরণ করেন।এবং বাদশার উদ্যোগে ইউসুফ ( আ: ) এর সাথে জুলেখার বিয়ে হয়ে যায় . তখন ইউসুফ ( আ: ) জুলেখাকে বলেন ”তুমি যা চেয়েছিলে এটা কি তার চাইতে উত্তম নয়”। জুলেখা দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।


আল্লাহ তাআলা সম্মানে তাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করলেন। খুব আমোদ আহ্লাদে তাদের জীবন অতিবাহিত হয়। বর্ণনা অনুযায়ী তাদের দু’জন পুত্র সন্তানও জন্ম গ্রহণ করেছিল। তাদের নাম ছিল ইফরাহিম ও মানসা। আর এখানেই ইতি টানলাম ইউসুফ জুলেখার প্রেম কাহিনী।

সেভেন কিংস, রেডব্রিজ , যুক্তরাজ্য থেকে

১ thought on “কোরআনে ইউসুফ জুলেখার প্রেম কাহিনী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *